শিক্ষক নিয়োগে বিলম্ব কাম্য নয়

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২১, ১০:৪০ পিএম

করোনা মহামারীতে দেশে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর অন্যতম শিক্ষা খাত। করোনার সংক্রমণ থেকে বাঁচার লড়াইয়ে গত বছরের মার্চ থেকে দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান বন্ধ ছিল। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলার সঙ্গে সঙ্গেই শিক্ষার্থীদের সিলেবাস সম্পন্ন করা এবং ক্লাস ও পরীক্ষা নেওয়া নিয়ে ব্যাপক চাপ সামলাতে হচ্ছে শিক্ষকদের। এই পরিস্থিতি কারোরই অজানা ছিল না। কিন্তু এই সময়ে দেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট নিরসনের কোনো বিশেষ উদ্যোগ দেখা যায়নি। অথচ আশা করা হয়েছিল মহামারীর চাপ সামাল দিতে শিক্ষা খাতের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেবে সরকার। সেটা হয়নি। উপরন্তু শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বরাবরের মতোই দীর্ঘসূত্রতার খপ্পরে আটকে আছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে হাজার হাজার শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া। অন্যদিকে, দিন দিন বেড়েই চলেছে শিক্ষকের শূন্য পদের তালিকা। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

রবিবার দেশ রূপান্তরে ‘পুলিশ ভেরিফিকেশনে ঝুলে আছে ৩৮ হাজার শিক্ষক’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়ার শম্বুক গতির খবর তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, দীর্ঘ অপেক্ষার পর গত জুলাই মাসে বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তির ফল প্রকাশ করে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ ‘এনটিআরসিএ’। এতে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৩৮ হাজার ২৮৬ জনকে শিক্ষক নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়। এসব প্রার্থীর পুলিশ ভেরিফিকেশন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার কাজ চলছে। কিন্তু এই কাজ শুরু করতে দেরি করায় ইতিমধ্যে ৮ মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এ অবস্থায় ৩৮ হাজার প্রার্থীর একই ধরনের কাজ করতে দুই বছরও পেরিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া এমন দীর্ঘায়িত হলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক সংকট আরও গভীর হবে। জানা গেছে, এত দিন বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশনের ব্যবস্থা ছিল না। এখন পুলিশ ভেরিফিকেশনের কারণ হিসেবে সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, দেশে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের ঘটনা বেড়েছে। ফলে কোনো দুষ্কৃতকারী যাতে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে না পারে, সে জন্য এই ব্যবস্থা। কিন্তু পুলিশ ভেরিফিকেশনের এই ফরম প্রকাশ করতেই এনটিআরসিএ সময় নেয় আরও ৪০ দিন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, গত বছরের আগস্ট মাসেই এনটিআরসিএ থেকে পাঠানো সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের তালিকা পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে এটি শেষ করতে কত দিন লাগবে, এ বিষয়ে নিশ্চিত করে জানাতে পারেননি সরকারের শিক্ষা কর্মকর্তারা।

শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক সংকট থেকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। দিন দিন বেকারত্ব বাড়তে থাকার এই দেশে শিক্ষকতার চাকরি অনেক তরুণ-তরুণীর কাছেই এখন সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে। এনটিআরসিএ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ৫৪ হাজার ৩০৪ জন শূন্য পদে নিয়োগের বিপরীতে আবেদন জমা পড়েছিল ৯০ লাখ। সে হিসাবে একটি পদের বিপরীতে ১৬০ জনের বেশি আবেদন করেন। প্রতিটি আবেদনে এনটিআরসিএ নিয়েছে ১০০ টাকা করে। এতে প্রতিষ্ঠানটি এসব বেকারের কাছ থেকে নিয়েছে ৯০ কোটি টাকা। অন্যদিকে, অনেক প্রার্থীই একইসঙ্গে একশ থেকে পাঁচশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও চাকরির জন্য আবেদন করেছেন। ফলে এই চাকরিপ্রার্থীদের বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করতে হয়েছে। এমতাবস্থায় এই প্রশ্নও উঠছে যে, শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ প্রত্যাশীদের কেন একাধিক বিদ্যালয়ে আলাদাভাবে আবেদন করার নিয়মের ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে। কেন একটা কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একটি আবেদনের মাধ্যমে তারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বেসরকারি শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ পাবেন না। তাহলে একজন প্রার্থীকে শত শত বিদ্যালয়ে আলাদাভাবে আবেদন করে হাজার হাজার টাকা খরচ করতে হতো না।

শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আশায় থাকা বেকারদের আর্থিক সামর্থ্য ও সামাজিক সংকটের বিষয়টিও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বিবেচনায় নেওয়া উচিত। করোনা মহামারীর কালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার পাশাপাশি টিউশনি করে জীবিকা নির্বাহ করা বেকাররাও মারাত্মক সংকটে পড়েন। আর বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সুপারিশপ্রাপ্তদের একটা বড় অংশই টিউশনি অথবা অস্থায়ী কিণ্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতায় যুক্ত। নিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় তারা যে আশায় বুক বেঁধেছিলেন সেই স্বপ্ন এভাবে বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে তারা হতাশ হয়ে যাবেন। এমতাবস্থায় সুপারিশপ্রাপ্তদের পুলিশ ভেরিফিকেশন যতটা দ্রুত সম্ভব শেষ করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করা দরকার। পাশাপাশি পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে যাতে চাকরি প্রত্যাশী শিক্ষকরা হয়রানিতে না পড়েন কিংবা এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেন কেউ রাজনৈতিক বিবেচনায় বাদ না পড়েন সে বিষয়েও সচেতন থাকা প্রয়োজন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত