মুসা বিন শমসেরকে ডিবি কার্যালয়ে তলব

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২১, ০২:২২ এএম

অতিরিক্ত সচিবের ভুয়া পরিচয়ে প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার আবদুল কাদেরকে আজ ধনকুবেরখ্যাত মুসা বিন শমসেরের মুখোমুখি করা হবে। রাজধানীর মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) কার্যালয়ে তাদের মুখোমুখি করা হবে বলে দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন এক কর্মকর্তা।

মুসা বিন শমসেরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অ্যাডভাইজার হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতেন কাদের। এছাড়া প্রতারক কাদেরের সঙ্গে কিছু লেনদেন ও কথোপকথনের সূত্র ধরে তাদের মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করবে ডিবি। এর আগে গত রবিবার দুপুরে ডিবি কার্যালয়ে মুখোমুখি করা হয় মুসা বিন শমসেরের ছেলে জুবি মুসা ও কাদেরকে। তখন জুবি মুসা দাবি করেন, তার বাবার বয়স হয়েছে। সে মনখোলা মানুষ। কাদের এ সুযোগ নিয়েছেন। যখন বিষয়টি তাদের পরিবার জানতে পারে তখন থেকে কাদেরের সঙ্গে তার বাবার সম্পর্ক ছিন্ন হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাদেরের অপকর্মের সহায়তাকারী বেশ কিছু দালালের তথ্য পেয়েছে ডিবি। এসব দালালই ব্যাংক লোন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজ পেতে স্বল্প সময়ের মধ্যে ব্যাংক গ্যারান্টি, সাব-কন্ট্রাক দেওয়া, চাকরি পাইয়ে দেওয়াসহ বিভিন্ন কাজের জন্য ক্লায়েন্ট জোগাড় করত। ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে কাদের বিভিন্নভাবে যে টাকা বাগিয়ে নিতেন তার পারসেন্টেজ পেত দালালরা। এছাড়া ক্লায়েন্ট জোগাড়ে মার্কেটিং অফিসারও নিয়োগ করেছিলেন কাদের। প্রতারণার মাধ্যমে কামানো টাকা দিয়ে গড়া অবৈধ অঢেল সম্পদ, বাগানবাড়ী, ফ্ল্যাটের পাশাপাশি বেশ কিছু জমি ও ফ্ল্যাটের বায়নার তথ্য পেয়েছে ডিবি। গত ৭ অক্টোবর রাজধানীর কারওয়ানবাজার, মিরপুর এবং গুলশান এলাকায় অভিযান চালিয়ে অস্ত্র ও প্রতারণার বিপুল আলামতসহ গ্রেপ্তার করা হয় কাদেরকে। এ সময় তার তিন সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেন কাদেরের দ্বিতীয় স্ত্রী শারমিন চৌধুরী ছোঁয়া, অফিস ম্যানেজার শহিদুল আলম ও আনিসুর রহমান। কাদেরের আদি বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচরে। তার বাবা জীবিকার সন্ধানে সন্দ্বীপে পাড়ি জমিয়েছিলেন। মাছ ধরে ও মাঝির কাজ করে জীবিকা উপার্জন করতেন। এমন ভূমিহীন ভাসমান আবদুল কাদেরের ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে রয়েছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। এর মধ্যে গুলশান-১ নম্বরের জব্বার টাওয়ারের প্রায় ৬ হাজার স্কয়ার ফুট আয়তনের অফিস রয়েছে। কারওয়ানবাজারেও রয়েছে আরও একটি অফিস। মিরপুর-৬ নম্বরে বসবাস করলেও একাধিক ফ্ল্যাট, গাজীপুরে বাগানবাড়ী, বহুতল ভবন রয়েছে কাদেরের। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি ব্যাংকে রয়েছে তার একাধিক অ্যাকাউন্ট।

ডিবি জানায়, গ্রেপ্তার কাদেরের অস্ত্র মামলার চার দিনের রিমান্ড আজ মঙ্গলবার শেষ হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে নতুন করে আরও পাঁচটি প্রতারণার মামলা হয়েছে। প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে কাদেরের বিরুদ্ধে এর আগে হওয়া ছয়টি মামলা চলমান। সব মিলে ১২টি মামলা রয়েছে কাদেরের বিরুদ্ধে। গ্রেপ্তারের পর ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত তিন দিনের রিমান্ডে কাদের ছিলেন স্বাভাবিক। তার অপকর্মের কথা অকপটে স্বীকার করছেন। কীভাবে এ প্রতারণার জগতে তার প্রবেশ তা জানতে চাইলে কাদের ডিবি কর্মকর্তাদের জানান, ২০০৪ থেকে ’০৬ সাল পর্যন্ত মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে মানুষ পাঠানোর নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এরপরই শুরু হয় তার বহুমাত্রিক প্রতারণা।

ডিবি সূত্রে জানা যায়, আজ মধ্যাহ্নভোজের পর মুসা বিন শমসেরকে ডিবি কার্যালয়ে আসতে বলা হয়েছে। এ সময় কাদেরের সঙ্গে মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে তাকে। কাদের নিজেকে মুসা বিন শমসেরের আইন উপদেষ্টা দাবি করেছেন। এছাড়া তার সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে ডিবি; যার পরিমাণ প্রায় ২৫ কোটি টাকা। মুসা বিন শমসেরের বিভিন্ন অ্যাপার্টমেন্ট ও প্লট বিক্রির জন্য কাদেরের সহায়তা চাওয়া হয়েছিল এমন তথ্যও পেয়েছে ডিবি।

গতকাল ডিবি গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) কামরুজ্জামান সরকার নিজ কার্যালয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, কাদেরের প্রতারণার শিকার অসংখ্য ভুক্তভোগী আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। এখন পর্যন্ত ছয়টি মামলা হয়েছে। এর আগে তার বিরুদ্ধে প্রতারণা ও জালিয়াতির ছয়টি মামলা রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, প্রতারণার মাধ্যমে যে টাকা আয় করেছেন তা দিয়ে জমি-ফ্ল্যাট কিনেছেন। তিনি বেশ কিছু জমির বায়না করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, মানব পাচারের মাধ্যমে অনেকের টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

তিনি বলেন, গত রবিবার মুসা বিন শমসেরের ছেলেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তিনি কিছু তথ্য দিয়েছেন। আজ মুসা বিন শমসেরকে ডাকা হয়েছে।

এর আগে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, কাদেরের প্রতিষ্ঠানে মুসা বিন শমসেরের একাধিক ছবি টানানো রয়েছে। তিনি নিজেকে পরিচয় দিতেন তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অ্যাডভাইজার হিসেবে। প্রতারক আবদুল কাদেরের কাছ থেকে মুসা বিন শমসের ও তার স্ত্রীর সঙ্গে করা কিছু চুক্তিপত্র উদ্ধার করা হয়। মুসা বিন শমসেরকে বাবা বলে ডাকতেন কাদের। তাদের কিছু কথোপকথন কাদেরের ফোনে রেকর্ড রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত