সিনেমার মতোই ট্র্যাজিক জীবন গুরু দত্তের

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২১, ০৫:০৯ পিএম

বসন্ত কুমার শিব শংকর পাড়ুকোন! নামটা শুনে বা কোথাও দেখে চলচ্চিত্রপ্রেমীরা চিনবেন না বললেই চলে। সেই হিসেবে বলা যায়, শুধু বার্থ সার্টিফিকেটেই বসন্ত কুমার শিব শংকর পাড়ুকোন নামটা থেকে গেল, কিন্তু সেলুলয়েডের পর্দার ‘গুরু দত্ত’ হয়ে স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে গেছে তার কীর্তি।

চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক, পরিচালক ও অভিনেতা গুরু দত্ত ভারতের প্রথম পরিচালক যিনি সিনেমাস্কোপে শুট করেছিলেন, সেই ষাটের দশকের শুরুতে। বাকি পরিচয়ের পাশাপাশি অভিনয়ের জগতেও গুরু দত্ত এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ২০১০ সালে সিএনএনের ‘সর্বকালের সেরা ২৫ এশীয় অভিনেতা’র তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়।

বয়স যখন মাত্র দেড় বছর, তখন একদিন খেলতে খেলতে চলে গিয়েছিলেন কুয়োর ধারে। সেই সময় দাদি এসে না বাঁচালে সেটাই হতো তার জীবনের শেষ মুহূর্ত। অল্প বয়সে ফাঁড়া কাটিয়ে উঠতে পারলেও ১৯৬৪ সালের ১০ অক্টোবর মাত্র উনচল্লিশ বছরে মৃত্যুর ফাঁড়া কাটাতে পারেননি গুরু দত্ত। বলা যায়, তার ব্যক্তিগত জীবন ফিল্মি দুনিয়ার কোনো মাশালা সিনেমার গল্পের থেকে কম ছিল না। গুরুর ফিল্মি ক্যারিয়ার, প্রেম, বিয়ে ও মৃত্যু নিয়ে একটা সময় তোলপাড় হয়েছিল বলিউড।

১৯২৫ সালের ৯ জুলাই দক্ষিণ ভারতের একটি অভিজাত ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাবা-মা দুজনেই শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ফলে সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠেন গুরু দত্ত। তার ছোট বোন ললিতা লাজমী প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী। বেঙ্গালুরুতে জন্ম হলেও কলকাতার ভবানীপুরে শৈশব কাটে তার। সেখানেই শৈশব-কৈশোর কাটানোর ফলে বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি আলাদা একটা টান অনুভব করতেন তিনি। বাঙালিদের মতোই বাংলা বলতে পারতেন। বাংলা ও বাঙালির প্রতি টান থেকেই আসল নাম সরিয়ে বাংলা নাম গ্রহণ করে হয়ে বসন্ত কুমার থেকে হয়ে গেলেন গুরু দত্ত।

পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে মেট্রিক পাশের পর আর কলেজে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি তার। ওইসময় বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয় শংকর একটি শো’র জন্য কলকাতায় এলে ঘটনাচক্রে তার দলে নৃত্যশিল্পী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়ে যান গুরু। এখান থেকেই মূলত সিনেমার প্রতি ভালোবাসা শুরু হয়। এমনকি চলচ্চিত্র জগতে তিনি নৃত্য পরিচালক হিসেবেই যাত্রা শুরু করেন পুনের প্রভাত ফিল্ম স্টুডিও’র মাধ্যমে। আর এখানে কাজ করার সময়ই ভারতীয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা দেব আনন্দের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়। বন্ধুত্ব এতটাই গভীর হয় যে, দেব আনন্দ তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ‘আমার প্রযোজিত সিনেমার পরিচালক হিসেবে কাজ করবে তুমি।’

পরবর্তীতে সেই প্রতিশ্রুতি রেখে ছিলেন দেব আনন্দ। তার প্রযোজিত ‘বাজি’ সিনেমায় পরিচালক হিসেবে যাত্রা শুরু করেন গুরু দত্ত। অন্যদিকে নিজের পরিচালিত সিনেমায় নায়ক হবেন দেব আনন্দ এই ওয়াদাও রেখেছিলেন গুরু দত্ত। তবে বন্ধুকে নায়ক হিসেবে চুক্তিবদ্ধ করেও নিজের প্রযোজিত ‘সিআইডি’ নানা কারণে পরিচালনা করতে পারেননি গুরু দত্ত। পরবর্তীতে পরিচালনা করেন রাজ খোসলা।

সেই পঞ্চাশের দশকে চিত্রনাট্য, পরিচালনা ও প্রযোজনার মাধ্যমে গুরু দত্ত ভারতীয় চলচ্চিত্রে আলাদা একটা জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার ও অভিনেতা সব ভূমিকাতেই তিনি ছিলেন সফল। এগিয়ে ছিলেন নিজের সময়ের চেয়েও। গুরু দত্ত পরিচালিত ‘পিয়াসা’, ‘কাগজ কে ফুল’ সিনেমা দুটিকে বলা হয় বলিউডের শতবর্ষের ইতিহাসে অন্যতম সেরা সৃষ্টি। টাইম ম্যাগাজিনের   ‘সর্বকালের ১০০ সেরা চলচ্চিত্র’ তালিকায় ‘পিয়াসা’ অন্তর্ভুক্ত। ২০০২ সালে সাইট অ্যান্ড সাউন্ডের সমালোচক ও পরিচালকদের ভোটেও ‘সেরা ১০০ চলচ্চিত্রের’ তালিকায় স্থান পায়, যেখানে দত্তকে সর্বকালের সেরা পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

গুরু দত্ত পরিচালিত ছবির মধ্যে রয়েছে  বাজি, বাজ, পিয়াসা, আর পার, জাল, কাগজ কে ফুল, মিস্টার অ্যান্ড মিসেস ফিফটি ফাইভ এবং সয়লাব। প্রযোজনা করেন আর পার, সিআইডি, পিয়াসা, গৌরী, কাগজ কে ফুল, চৌধভি কা চান্দ, সাহেব বিবি অউর গোলাম এবং বাহারে ফির ভি আয়েগি। পিয়াসা, সাহেব বিবি অউর গোলাম, কাগজ কে ফুল, চৌধভী কি চান্দ’সহ বিভিন্ন সিনেমাতে অনবদ্য অভিনয় উপহার দিয়েছেন তিনি। সিনেমার গানেও আলাদা ছাপ রেখে গেছেন। তার নির্মিত বা অভিনীত সিনেমার গান এখনো ভীষণ জনপ্রিয়।

সিনেমার সুবাদে গুরু দত্তর সঙ্গে পরিচয় হয় সেই সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় গায়িকা গীতা রায়ের। এরপর প্রেম, ১৯৫৩ সালে বিয়ে করেন তারা। বিয়ের পর রায় থেকে গীতা দত্ত হিসেবে আবির্ভূত এই গায়িকা। প্রেম করে বিয়ে এবং তাদের কোলজুড়ে তিন সন্তানের আগমন হলেও বিবাহিত জীবন সুখের হয়নি গুরু-গীতার। চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে অসাধারণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত হলেও ব্যক্তিগত জীবনে গুরু দত্ত ছিলেন ভীষণ খামখেয়ালি ও আবেগপ্রবণ। ধূমপান ও মদ্যপানে আসক্ত ছিলেন তিনি। খ্যাতি, নাম, প্রতিপত্তির সঙ্গে সঙ্গে আসক্তি বেড়েই যাচ্ছিল দিন দিন।

এ সবের মাঝেই ১৯৫৬ সালে গুরু দত্তর সঙ্গে পরিচয় হয় ওয়াহিদা রেহমানের। ভারতীয় চলচ্চিত্রে দিলীপ কুমার-মধুবালা, দেব আনন্দ-সুরাইয়ার মতোই আরেক এক ট্র‍্যাজিক প্রেম কাহিনি গুরু দত্ত-ওয়াহিদার।

মুসলিম মেয়ে হয়েও ভরতনাট্যম জানা ওয়াহিদা রেহমান তখন একটি তেলেগু সিনেমার একটি গানে অভিনয় এবং পারফরম্যান্স করে আলোচিত-প্রশংসিত। ওয়াহিদা রেহমানকে এক নজর দেখেই নিজের প্রযোজিত ‘সিআইডি’ সিনেমায় দেব আনন্দের সঙ্গে একটি নেগেটিভ রোলে কাস্ট করেন গুরু দত্ত। অসাধারণ সৌন্দর্য, অভিনয় ও নাচ দিয়ে ওয়াহিদা দর্শকদের নজর কাড়েন। পরের সিনেমায় নিজের বিপরীতে ওয়াহিদাকে গুরু দত্ত। জুটি হিসেবে তাদের প্রথম সিনেমা ‘পিয়াসা’ বক্স অফিসে সফল এবং সমালোচকদের কাছে ব্যাপক প্রশংসা লাভ করে। এখন একে অলটাইম ক্ল্যাসিক বিবেচনা করা হয়। এরপর মুক্তি পায় গুরু দত্তের অভিনয় জীবনের আরেক মাইলফলক ‘সাহেব বিবি অউর গোলাম’। ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম সেরা একটি সিনেমায় অভিনয় করে মীনা কুমারী ‘ট্র‍্যাজেডি কুইন’ খেতাব লাভ করেন। সিনেমার প্রতিটা গান, অভিনয়, সংলাপ প্রশংসিত হয়। পিয়া অ্যাউসো জিয়া মে, না যায়ো সাইয়া ছুড়াকে বাইয়া বা ভাবরা বড়া নাদান হ্যায় সব কটি গান আজও জনপ্রিয়। প্রথমে ভূতনাথ চরিত্রে শশী কাপুরকে ভাবা হলেও পরবর্তীতে গুরু দত্ত নিজেই অভিনয় করেন।

ওয়াহিদা রেহমানের সঙ্গে গুরু দত্তের পর্দায় রসায়ন যেমন অনবদ্য ছিল, তেমনই ব্যক্তি জীবনেও তারা পরস্পরের কাছাকাছি এসেছিলেন বলে গুঞ্জন শোনা যায়। সুন্দরী ও ধীরস্থির স্বভাবের ওয়াহিদার প্রেমে হাবুডুবু অবস্থা গুরুর। তবে ওয়াহিদার তরফ থেকে কখনোই সে রকম কিছু ছিল না বলে জানা যায়। কিন্তু একতরফা প্রেম বা আসক্তি গুরু দত্তর দাম্পত্যজীবনকে তছনছ করে দেয়। এমনিতেই মদ্যপান নিয়ে ঝামেলা ছিল, এখন ওয়াহিদার সঙ্গে প্রেম— সব মিলিয়ে গীতা দত্ত স্বামীকে ছেড়ে সন্তানদের নিয়ে আলাদা থাকতে শুরু করেন। সবকিছুর পরও তাদের বিচ্ছেদ হয়নি। কিন্তু সংসার থেকে আলাদা থাকার বিষয়টি গুরু দত্তের মানসিক টানাপোড়েন আরও বাড়িয়ে দেয়। জানা যায়, তিনি যেমন ওয়াহিদাকে ভালোবাসতেন তেমনই ভালোবাসতেন স্ত্রী গীতাকেও। দুজনের কাউকেই ত্যাগ করতে চাননি।

ব্যক্তিগত জীবনের এই টানাপোড়েনের নেতিবাচক ছাপ পড়ে গুরু দত্তের ক্যারিয়ারে। চলচ্চিত্র জগতের কাহিনি নিয়ে নির্মিত ‘কাগজ  কে ফুল’ ব্যবসায়িকভাবে অসফল হয়। এই সিনেমাতেও অভিনয় করেছিলেন ওয়াহিদা-গুরু জুটি। যদিও কাহিনি, পরিচালনা, অভিনয় ও গান সব দিক থেকে সিনেমাটি ছিল এক অসামান্য সৃষ্টি। সিনেমাস্কোপে শুট করেছিলেন ‘কাগজ কে ফুল’ সিনেমার। মেহবুব স্টুডিওর একটি দেয়াল ভেঙে স্টুডিওর ভেতরের লাইট এবং বাইরের ন্যাচারাল লাইটের সংমিশ্রণে চিত্রায়িত করেছিলেন ক্ল্যাসিক ‘ওয়াক্ত নে কিয়া ক্যায়া হাসিন সিতাম’ গানটি। গীতা দত্তের মায়াভরা কণ্ঠে কোন নাচ বা লিপসিং ছাড়াই ওয়াহিদা রেহমান আর তার চোখের এক্সপ্রেশন এবং নির্মাণের মুনশিয়ানা গানটিকে কালজয়ী মর্যাদা এনে দিয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিজীবনের মতোই সিনেমার গল্পে বিবাহিত পরিচালকের সঙ্গে নায়িকার প্রেমের কাহিনি সে সময়ের দর্শক গ্রহণ করতে পারেনি। খ্যাতিমান পরিচালক, প্রযোজক ও অভিনেতা রাজ কাপুর সেই সময়েই বলেছিলেন যে, ‘কাগজ কে ফুল’ সময়ের আগেই বানানো হয়েছে। এবং তার কথার সত্যতা পাওয়া যায় যখন পরবর্তীতে অবশ্য ক্ল্যাসিকের মর্যাদা লাভ করে এই সিনেমাটি।

‘কাগজ কে ফুল’ সিনেমার ব্যর্থতা আবেগপ্রবণ গুরু দত্তকে আরও বেসামাল করে দিয়েছিল। তবে এরপর ‘চৌধভি কা চান্দ’ সিনেমাতে ওয়াহিদার বিপরীতে আবারও অভিনয় করেন তিনি। মুসলিম পরিবারের গল্প নিয়ে এই সিনেমায় তাদের জুটি ও দক্ষ অভিনয় আলোচনা, প্রশংসা এবং ব্যবসায়িক সাফল্য পায়। তবে গুরু দত্তের সঙ্গে ওয়াহিদার দূরত্ব তৈরি হয়ে যায় তত দিনে। শুধু ক্যারিয়ারের ব্যস্ততা ও সাফল্যই এই দূরত্বের একমাত্র কারণ ছিল না। ওয়াহিদা তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী নায়িকা নন্দার কাছে আক্ষেপ করেছিলেন যে, তিনি সরে গিয়েছিলেন এই কারণে যেন গুরু দত্তের বিবাহিত জীবনে শান্তি ফিরে আসে। কিন্তু পরবর্তীতে বোঝা যায় সেটি ছিল তার ভুল ধারণা। তিনি বুঝতে পারেননি অভিমানী গুরু দত্ত আত্মহননের পথ বেছে নিতে পারেন।

একাকিত্বের হতাশা সম্ভবত গুরু দত্তের জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছিল। ১৯৬৪ সালের ১০ অক্টোবর মদের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে খেয়েছিলেন গুরু দত্ত। মাত্রাতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ ও অতিরিক্ত মদের বিষক্রিয়ায় মাত্র ৩৯ বছর বয়সেই এই দক্ষ অভিনেতা ও পরিচালকের মৃত্যু ঘটায়। অবশ্য এর আগেও দুবার আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। মৃত্যুর আগে তিনি ফোন করেছিলেন গায়িকা আশা ভোঁসলের বাড়িতে, জানতে চেয়েছিলেন তার স্ত্রী গীতা সেখানে আছেন কিনা। আশা ভোঁসলেই শেষ ব্যক্তি যিনি গুরু দত্তের সঙ্গে কথা বলেন।

গুরু দত্তের ছেলে অবশ্য এই মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে মেনে নেননি। তার মতে, এটি ছিল দুর্ঘটনা। ছোট ভাই দেবী দত্ত বিশ্বাস করেন, গুরু দত্ত আত্মহত্যা করেননি। একটা সময় অভিনেতা মানসিক অবসাদে ভুগতেন। সেই কারণেই ঘুমের ওষুধ খেতেন তিনি। দেবী দত্তের দাবি, তার ভাই নিজের প্রাণ নেননি। অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খাওয়ার কারণেই মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়েছিলেন অভিনেতা।

দেবী ভাইয়ের সঙ্গে এগারো বছর কাজ করেছিলেন। তাই এতটা বিশ্বাস নিয়ে তিনি এ কথা বলতে পেরেছেন। আরও জানিয়েছিলেন, মৃত্যুর ঠিক আগের দিনও স্বাভাবিক ও সুস্থ অবস্থায় ছিলেন গুরু দত্ত। ‘বাহারে ফির ভি আয়েঙ্গি’  সিনেমার সেটে দেবীর সঙ্গেই ছিলেন তিনি। শুট শুরু হতে আর কয়েক মুহূর্ত বাকি। হঠাৎ একজন মুখ্য অভিনেতা শুট বাতিল করায় বেশ রেগে গিয়েছিলেন গুরু দত্ত। পরের দিন শুট বাতিল হওয়ার কারণে দুই ভাই কেনাকাটা করতে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। কোলাবার এক মার্কেট থেকে গুরুর দুই ছেলে অরুণ ও তরুণের জন্য জামাকাপড় কেনেন তারা। কেনাকাটার পর একসঙ্গেই গুরু দত্তের অ্যাপার্টমেন্টে সন্ধে সাড়ে ছটা নাগাদ ফিরে আসেন তারা। তখন পেডার রোডের সেই ফ্ল্যাটে একাই থাকতেন গুরু দত্ত। পুরোপুরি স্বাভাবিক ছিলেন তিনি। তাই পরদিন মৃত্যুর খবর বিশ্বাস করতে পারেননি দেবী দত্ত।

মৃত্যুর আগে গুরু দত্ত নতুন সিনেমা নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন।  ‘পিকনিক’ এবং ‘লাভ অ্যান্ড গড’ সিনেমার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন তিনি। ‘লাভ অ্যান্ড গড’ সিনেমার পরিচালক ছিলেন ‘মুঘল-ই-আজম’-খ্যাত কে. আসিফ। সিনেমাটি প্রায় দুই দশক পর মুক্তি পায়। গুরু দত্তের পরিবর্তে সেটিতে অভিনয় করেন জনপ্রিয় অভিনেতা সঞ্জীব কুমার। গুরু দত্তের মৃত্যুর পরে গীতা দত্ত নিজেও যন্ত্রণা ভুলে থাকতে মদের নেশায় আসক্ত হয়ে যান। গান গাওয়া ছেড়ে দেন তিনি। ১৯৭২ সালে শারীরিক অবনতির কারণে এই অসম্ভব গুণী ও জনপ্রিয় গায়িকা মৃত্যুবরণ করেন। অন্যদিকে গুরু দত্তের অকালপ্রয়াণে শোক ভোলার জন্য কাজের মধ্যেই ডুবে যান ওয়াহিদা। প্রতিদিন দুই শিফটে কাজ করতে থাকেন তিনি। সেই সময়ের হিসাবে বিয়ের বয়স পার করে ১৯৭৪ সালে ঘর বাঁধেন তিনি, তত দিনে গুরু দত্তের মৃত্যুর এক দশক চলে গেছে।

অনেকে বলেন, ‘কাগজ কে ফুল’ সিনেমার গল্পই সত্যি হয়ে উঠেছিল এর পরিচালক, প্রযোজক ও অভিনেতা গুরু দত্তের জীবনে। একে একে নিজের জীবনের সব প্রিয়জনকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে হয়তো আবেগপ্রবণ মানুষটি বেছে নিয়েছিলেন সেই রাস্তা যার থেকে আর ফেরা যায় না। তবে তার প্রতিটা কাজই অমর হয়ে থাকবে সেটি হয়েতো বোঝা হয়ে গিয়েছিল গুরু দত্তের।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত