প্রফেসর রাজ্জাকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-২

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২১, ১১:১৩ পিএম

(মঙ্গলবার প্রথম কিস্তির পর)

জেঙ্কিনস পর্ব

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদেশি শিক্ষকদের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত ছিলেন ইতিহাসের অধ্যাপক নিউম্যান। তার বৈশিষ্ট্য যত-না অধ্যয়ন ও অধ্যাপনার একাগ্রতার প্রতি তার চেয়ে বেশি ছিল নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন এবং এক ধরনের হীন দলাদলি। ভাইস চ্যান্সেলর সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন তাকে এনেছিলেন।

ইন্ডিয়ান এডুকেশন সার্ভিসের ওয়াল্টার অ্যালেন জেঙ্কিনস (১৮৯১-১৯৫৮) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সপ্তম ভাইস চ্যান্সেলর (১৯৫৩-১৯৫৬) হয়ে এলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুতেও তিনি ছিলেন। কেমব্রিজ ও শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র পদার্থবিজ্ঞানে ডিএসসি জেঙ্কিনস ১৯২১ সালে ঢাকা কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুতেই ১৯২১ থেকে ১৯২৬ পর্যন্ত তিনি পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। বয়স্ক মানুষ হলেও অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন এবং প্রফেসর রাজ্জাকের মতো ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে তার মধ্যে একটি শাহি ভাব ও কর্তৃত্ব বিদ্যমান ছিল। সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেনের পর ১৯৫৩-এর শেষ দিকে তিনি ভিসি পদে যোগ দেন। ১৯৫৪-এর ২১ ফেব্রুয়ারি পালনের বৈঠকে তিনি সভাপতিত্ব করেছেন। ভিসি হিসেবে যোগ দিয়ে একে একে শিক্ষকদের সঙ্গে এককভাবে পরিচিত হচ্ছিলেন। প্রফেসর রাজ্জাকের সঙ্গে তার পরিচিতিপর্বটি কৌতূহলোদ্দীপক : আমার সঙ্গে সাক্ষাতে জেঙ্কিনস সাহেব প্রথমে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন : তোমার নাম কী, ধর্ম কী ইত্যাদি। তার কিছু পরে জিজ্ঞেস করলেন : তুমি কখনো বিদেশ গিয়েছ নাকি? আমি সংক্ষেপে বললাম : হ্যাঁ গেছি। তারপরে প্রশ্ন হলো : কী করে আসছো, কত বছর ছিলে? আমি বললাম, পাঁচ বছর।

: কী কইরা আসছো?

: ডিগ্রি করবার গেছিলাম, ডিগ্রি হয় নাই।

: কেন হয় নাই?

আমি বললাম, ‘এটা তো খুব সাধারণ কথা। এই ডিগ্রি করতে পুরো দু’বছর লাগে না। আমার দু’বছর পরেও ডিগ্রিটা হয় নাই।’ এরপর ইংরেজিতে যা বললেন তার মানে : এতে কেবল এটাই বোঝা যায় আমি এটার উপযুক্ত ছিলাম না। নতুন ভিসি আবদুর রাজ্জাকের সিভি সামনে রেখেই প্রশ্ন করছিলেন দেখে তিনি বললেন, ‘সবই তো কাগজে লেখা আছে। তারপরেও আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করছেন কেন? আর ইউ ট্রাইং টু ফাইন্ড আউট যে আমার জবাবগুলো ঠিক না বেঠিক হয়।’ জেঙ্কিনস সাহেব হতচকিত হলেন। তারপরও জানতে চাইলেন, ডিগ্রিটা সম্পন্ন করার কথা তিনি ভাবছেন কি না? তার সাফ জবাব, না।

এতে বিশ্ববিদ্যালয় ও তার নিজের প্রতি অবিচার করা হচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বললেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি হচ্ছে না, তার নিজের ব্যাপারটা তিনি নিজেই বুঝবেন। ১৯৩৬ সালে তাকে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের নেওয়া হয় তার প্রয়োজনীয় ডিগ্রি ছিল। তিনি বলছেন : ‘সিন্স দেন আমার এমন কিছু অবনতির লক্ষণ দেখা যায় নাই। কোনো উন্নতিও আমার হয় নাই। আমার পদের কোনো উন্নতি ঘটে নাই। এখন আমি যদি মনে করি ১৯৩৬ সালে যে চাকরি করতাম দিস ইজ নট এনাফ ফর মি, আমার প্রমোশন দরকার, তাহলে আই শুড কাম ব্যাক ইউথ অ্যাডিশনাল কোয়ালিফিকেশন। এ পর্যন্ত আমি যেখানে ছিলাম সেখানেই সন্তুষ্ট, তখন আমার কোয়ালিফিকেশন নিয়া আর উচ্চবাচ্য কইরা লাভ কী? ইট ডাজ নট ইন্টারেস্ট মি মাচ।’

ভাইস চ্যান্সেলর জেঙ্কিনসের কাছ থেকে পরবর্তী ডাক যখন পেলেন তখন তার বিরুদ্ধে ‘সাংঘাতিক’ এক অভিযোগ দায়ের করেছেন তারই বিভাগের প্রধান অধ্যাপক নিউম্যান। দুটি গুরুতর অভিযোগের একটি উচ্চারণ করতে ভিসি সাহেব বিব্রতবোধ করছিলেন। দ্বিতীয়টি ছিল রাজ্জাক নিউম্যানকে মিথ্যাবাদী বলেছেন। দ্বিতীয়টির জবাবে তিনি বললেন, ‘যেহেতু অনেকের সামনে প্রকাশ্যে তাকে মিথ্যাবাদী বলেছি, এখন অস্বীকার করাটা বোকামি হবে।’ তাছাড়া তিনি মিথ্যাবাদী বলেই তাকে মিথ্যাবাদী বলেছেন। যে অভিযোগটির কথা বলতে তিনি বিব্রতবোধ করছিলেন সেটি হচ্ছে আবদুর রাজ্জাক তাকে চাবকাতে চেয়েছেন। এই বিরোধ জানাজানি হয়ে যায়, জেঙ্কিনস সাহেব যখন তাকে চাকরিচ্যুত করার হুমকি দেন তিনি বললেন, তাহলে তাই করুন। এ বিষয়গুলো অনেক দূর গড়ায়। তাকে কারণ দর্শাতে বলা হলে বিশিষ্ট আইনজীবী প্রণীত জবাব যখন ভাইস চ্যান্সেলরের কাছে পৌঁছে ভিসির আইনগত অক্ষমতা আরও স্পষ্ট হয়। রাজ্জাক আদালতে যাবেন বলে তিনি আশঙ্কিত হন।

অনেক বাগ্বিতন্ডা এবং আবদুর রাজ্জাকের মহাকাব্যিক অনমনীয়তার সমাপ্তি ঘটিয়ে সংকটের সমাধান হয় তাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পাঠিয়ে। অবশ্য এরও কোনো আইনগত কর্তৃত্ব ভিসির ছিল না। প্রফেসর রাজ্জাক মেনে নিয়েছেন। পিএইচডির জন্য পাঁচ বছর বিলেতে হ্যারল্ড লাস্কির অধীনে কাটিয়ে ডিগ্রি গ্রহণে ‘ব্যর্থ’ হয়ে তিনি যত আলোচিত হয়েছেন সাফল্যের সঙ্গে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে এসে এর আংশিক আলোচনাতেও আসেননি অন্য কোনো অধ্যাপক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যাশা এবং অ্যাকাডেমিক ডিসিপ্লিন তার ‘ঔদ্ধত্য’ কেমন করে ধারণ করবে সে প্রশ্ন তো বরাবরই থেকে যাবে। নিউম্যানের সঙ্গে সন্ধি স্থাপন না করলেও একদা প্রধানমন্ত্রী আবুল কাশেম ফজলুল হকের বিশিষ্ট ভক্ত ওয়াল্টার জেঙ্কিনসের সঙ্গে শেষ সময়ে তার সৌহার্দ্যরে সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

জেঙ্কিনসের ‘ওল্ড চিফ’ ফজলুল হক তাকে বলছেন, আরও এক টার্ম তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর থাকতে হবে। অথচ খবরের কাগজে ছাপা হয়েছে জেঙ্কিনসের বিদায়ী, জুবেরী নতুন ভাইস চ্যান্সেলর হয়ে আসছেন। কিন্তু ইতরাত হোসেন জুবেরীর হাতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তুলে দিয়ে যেতে রাজি নন। তিনি বারবার বললেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি অনেক সময় কাটিয়েছেন এবং এ প্রতিষ্ঠানটিকে তিনি ভালোবাসেন, জুবেরীকেও তিনি ভালো করে জানেন এই প্রিয় প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব তাকে দেওয়া যায় না।

রাজ্জাক তাকে আশ্বস্ত করলেন, যিনিই ভাইস চ্যান্সেলর হোন না কেন, আমার কাছ থেকে জেনে রাখুন জুবেরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হচ্ছেন না। বুড়ো জেঙ্কিনস তার হাত চেপে ধরে বললেন, এটা যদি সত্যি হয় তাহলে তুমি যে আমাকে কত সুখী করলে তা তুমিও জানো না। ওয়াল্টার জেঙ্কিনসের পর জাস্টিস ইব্রাহিমকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর করা হয়।

জায়গির ও ঢাকাবাসীর সহযোগিতা

প্রফেসর রাজ্জাক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরবর্তী মুসলমান ছাত্রদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পুরান ঢাকার সর্দার এবং শহরের অশিক্ষিত গরিব মানুষের যে অবদান তার ওপর আলোকপাত করেন। ঢাকার স্থানীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা সামান্য, প্রায় সবাই গ্রাম থেকে উঠে এসেছেন। তার অধিকাংশই জায়গির থেকেছেন ঢাকার স্থানীয় দরিদ্র শহরবাসীর বাড়িতে। অবস্থাপন্ন কাদের সর্দার ছাত্রদের জায়গির রাখতেন। ‘হাফিজুর রহমান, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন এরাও জায়গির থেকে পড়েছেন। ঢাকার গরিবরাই জায়গির রাখত। কিন্তু তারা ছাত্র-মাস্টারছাবদের খুব ইজ্জত করত, খুব খাতির দেখাত। নিজেরা খেতে পাক আর না পাক, জায়গির ছাত্রের খাবার সময় অনুযায়ী ঠিক রেডি থাকত।’ যেসব ছাত্রের হলে থাকার আর্থিক সামর্থ্য নেই, শহরে কোনো স্বজন নেই, দুবেলা খাবার পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই, এমন মুসলমান ছাত্রদের সহযোগিতা করা ঢাকাবাসীর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছিল। শহরের মুসলমানদের কাছে ঢাকা হলের ছাত্রদের বিশেষ মর্যাদা ছিল।

প্রফেসর রাজ্জাককে নিয়ে সরদার ফজলুল করিমের গ্রন্থটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং তখনকার বাংলাদেশ সম্পর্কে জানার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। প্রফেসর রাজ্জাকের কয়েকটি অভিমত সনাতন ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। যেমন : ১. রাজা রামমোহন রায় বেসিক্যালি পারমিট হান্টার মানুষ। ৪০ টাকা মাইনেতে ৬-৭ বছর চাকরিতে ১০,০০০ টাকার জমিদারি কেনার মতো অর্থ সঞ্চিত হওয়ার কথা নয়। ‘উনি সারাটা জীবন বাবার সঙ্গে মোকদ্দমা করেছেন। আবার বড় বড় কথাও কইতেন। উনি মারা গেলেন বিলেত গিয়ে। বিলেত গিয়েছিলেন বাদশাহ শাহ আলমের উকিল হিসেবে।’ তবে প্রফেসর রাজ্জাকের মতে তার মহত্ত্ব রয়েছে আর সেটি হচ্ছে বাংলা চর্চা। ২. স্যার সৈয়দ আহমদ সম্পর্কেও তার অভিমত : মৃত্যুর পর তার ওপর মহত্ত্ব চাপানোর অবিরাম চেষ্টা চলেছে। ৩. বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে কোনো কমন অ্যাক্টিভিটিস ছিল বলে আমি মনে করি না। টেররিস্ট মুভমেন্ট অবশ্যই একটা রিমার্কেবল ফেজ ছিল। কিন্তু তাতে মুসলমানদের ওপর কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়নি। ৪. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার পেছনে এ কে ফজলুল হকের যত অবদানই থাকুক, ইউনিভার্সিটির এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের মুসলমান সদস্য হিসেবে তিন বছরের মধ্যে সম্ভবত একটি বৈঠকেও উপস্থিত হননি অংশগ্রহণ করা তো দূরের কথা। ‘ইউনিভার্সিটিতে প্রথম ১২/১৪ বছর কোনো মুসলমান কোনো ইস্যু টেকআপ করেননি।... ফজলুর রহমানের পূর্বে এর কোনো দৃষ্টান্ত নেই। অবশ্য ফজলুর রহমান পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে পরবর্তীকালে খ্যাতি পেয়েছেন বাংলা ভাষার বিরোধিতাতে।’ ৫. তিনি এ কে ফজলুল হককে মৌলবি ফজলুল হক বলতেন। তার সম্পর্কে বলছেন : মৌলবি ফজলুল হকের আর যে দোষ থাক অজ্ঞতার দোষ ছিল না। তিনি জ্ঞানপাপী ছিলেন... তিনি মনে করতেন পৃথিবীর কেন্দ্র মৌলবি আবুল কাশেম ফজলুল হক, মৌলবি আবুল কাশেমের ভালো হলেই সবার ভালো হবে।

৬. মুসলমান মেধাবী ছাত্ররা শিক্ষকতায় নিবেদিত ছিল না, হিন্দুরা ব্যতিক্রম। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি পেয়ে প্রায় সব মুসলমান শিক্ষকতা ছেড়ে চলে গেছেন। হিন্দুদের মধ্যে এই প্রবণতা ছিল খুব কম! ৭. ফজলুর রহমানকে বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটে জিতিয়ে আনতে তার পক্ষে ভোট সংগ্রহ করতে পাজামা-আচকান পরে তিনি চাঁদপুর চলে গিয়েছেন।  ৮. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কারও ভাষা আন্দোলনে কোনো ভূমিকা ছিল না কেউ নয়, মুনীরও নয়, মুজাফফরও নয়। এসব মন্তব্য করার নৈতিক শক্তি তার অবশ্যই ছিল।

(সমাপ্ত)

লেখক : সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত