টাকা ফেরতে লাগবে আদালতের নির্দেশনা

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২১, ১২:২৭ এএম

এসক্রো পদ্ধতির আওতায় অর্ডার করা পণ্য ডেলিভারি না হওয়ায় পেমেন্ট গেটওয়েতে আটকে আছে বড় অঙ্কের টাকা। এই টাকাগুলো মূলত ক্রেতাদের ফেরত পাওয়ার কথা। কিন্তু অনেক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা গ্রেপ্তার রয়েছেন, কোনো কোনো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন এর উদ্যোক্তারা। এ কারণে পেমেন্ট গেটওয়েতে আটকে থাকা টাকা ক্রেতাকে ফেরত দেওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে জটিলতা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এই টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য তাদের আদালতের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। কেননা, আটক থাকা ই-কমার্সের উদ্যোক্তাদের পক্ষে পণ্য ডেলিভারি হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের পুলিশ খুঁজে বেড়াচ্ছে। এই মুহূর্তে কোন কোন অর্ডারকৃত পণ্য ডেলিভারি হয়েছে আর কোন কোন পণ্য ডেলিভারি হয়নি তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে পেমেন্ট গেটওয়েগুলোকে কী নির্দেশনা দেবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে তা জানতে চাইবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগের কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে এ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। তবে টাকা ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু করতে তারা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের জন্য দ্রুত চিঠি পাঠাবে।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. মেজবাউল হক বলেন, ‘আশার কথা হলো টাকাগুলো নিরাপদে আছে। এই টাকা ক্রেতারা অবশ্যই ফেরত পাবেন। এ জন্য কিছুটা সময় লাগতে পারে। কেননা, যেসব ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের মালিক আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন তাদের বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা না এলে আমরা ক্রেতাদের টাকা ফেরত দিতে পেমেন্ট গেটওয়েগুলোকে বলতে পারব না।’

তিনি আরও বলেন, ই-কমার্সের মালিকপক্ষকেও নিশ্চিত করতে হবে যে তারা পণ্য সরবরাহ করতে না পারার কারণে অর্ডার ক্যানসেল করেছে। অনেক অর্ডার ডেলিভারির পরও টাকাগুলো পেমেন্ট গেটওয়ের কাছ থেকে ছাড় করানোর আগেই ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা গ্রেপ্তার হয়েছেন। এ ক্ষেত্রে ঢালাওভাবে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া কঠিন।

ক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্যের টাকা আগাম নিয়ে দেরিতে পণ্য সরবরাহ করায় সম্প্রতি কিছু ই-কমার্স বা ডিজিটাল কমার্স প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার মডেল নিয়ে দেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এই পরিস্থিতিতে ক্রেতাদের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য গত ৩০ জুন ‘আগে পণ্য পরে টাকা ছাড়’-এর একটি নির্দেশনা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা এসক্রো পদ্ধতি হিসেবে পরিচিত। এই পদ্ধতিতে কোনো ক্রেতা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পণ্যের মূল্য আগাম পরিশোধ করলেও তা সরাসরি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের হাতে যায় না। এই টাকা তৃতীয় পক্ষ হিসেবে পেমেন্ট গেটওয়েগুলোর কাছে থাকে। পণ্য সরবরাহ সম্পন্ন হলে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো তথ্য-প্রমাণাদি সাপেক্ষে পেমেন্ট গেটওয়েগুলোর কাছ থেকে টাকা তুলে নিতে পারে।

মূলত এই এসক্রো পদ্ধতি চালুর পর থেকেই বড় অঙ্কের ছাড় দিয়ে পণ্য সরবরাহকারী ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। কেননা, এসব প্রতিষ্ঠান ছাড়ের অর্থ নিজেদের পকেট থেকে না দিয়ে ক্রেতার টাকা দিয়ে পরিশোধ করত। এভাবে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান শত শত কোটি টাকা দায় সৃষ্টি করছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দায় তৈরি করা প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি ডটকম লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ না করায় প্রতারণার মামলায় আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এরপর ই-অরেঞ্জ, ধামাকা শপিং, কিউকম, নিরাপদ বিডিডটকমসহ বেশ কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। সম্প্রতি আনন্দের বাজার নামের একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এই প্রতিষ্ঠানটিসহ দালাল প্লাস, অল শপার ও থলে নামের চারটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সম্পদের খোঁজ নেওয়া শুরু করেছে।

এরও আগে আলেশা মার্ট, সিরাজগঞ্জ শপ, আলাদিনের চেরাগ, বুমবুমসহ গোটা দশেক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য নেওয়া শুরু করে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্ট ইউনিট (বিএফআইইউ)।

ফলে সামগ্রিকভাবে ই-কমার্স খাতে কিছুটা অস্থিরতা দেখা দেয়। এই সময়ে পণ্য ডেলিভারি করতে না পারায় অনেক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানে অর্ডারকৃত টাকা এসএসএল কমার্জ, বিকাশ, নগদসহ দেশের পেমেন্ট গেটওয়েগুলোতে আটকে পড়তে শুরু করে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. মেজবাউল হক জানান, তারা নিয়মিতভাবে এই টাকার তথ্য পেমেন্ট গেটওয়েগুলোর কাছ থেকে সংগ্রহ করতে শুরু করেছেন। এই টাকা দ্রুত ক্রেতাকে ফেরত দেওয়ার চেষ্টা তারা করছেন।

তবে ই-কমার্স খাত-সংশ্লিষ্টরা বলতে চেষ্টা করছেন ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা শপিংসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কয়েকশ’ কোটি টাকা পেমেন্ট গেটওয়েগুলোর কাছে আটকে রয়েছে। তবে কিউকমের প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ফস্টার পেমেন্ট নামে যে পেমেন্ট গেটওয়ের কাছে আটকে থাকার অভিযোগ রয়েছে সেই ফস্টার পেমেন্টের কোনো নিবন্ধন কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেয়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত