মহামারীকালে ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে স্মরণ

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২১, ১০:৪০ পিএম

সারা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়ে প্রায় দুই বছর ধরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কভিড-১৯ নামের এক অভূতপূর্ব মহামারী। এই মহামারী নিয়ন্ত্রণ ও নিরাময়ে দেশে দেশে যে চিকিৎসা পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার যে অনুশীলন দেখা গেছে তাতে বিভিন্ন দেশের সক্ষমতা ও দুর্বলতার নানা দিক সামনে এসেছে। বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার সক্ষমতা, দক্ষতা ও দুর্বলতার দিকগুলোও প্রকটভাব বেরিয়ে এসেছে এই মহামারীতে।

কিন্তু এটা খেয়াল করা দরকার যে, আমাদের বাংলাদেশেও চিকিৎসেবায় সারা বিশ্বের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পেরেছিলেন এই দেশেরই ক্ষণজন্মা এক মহৎপ্রাণ চিকিৎসক। প্রকৃত প্রস্তাবে যে দেশ ও সমাজে সীমাহীন সার্বিক দারিদ্র্যের (অর্থনৈতিক, চিন্তা-চেতনার, সহনশীলতার, সাধনার) কারণে বড় কিছু করা যায় না, মহৎ কিছু গড়ে ওঠে না এবং যেখানে চিন্তার দৈন্য (Lack of Imagination), উদ্যম উদ্যোগের অভাব (Lack of Initiative) এবং ত্যাগ শিকারের অনীহা (Lack of Sacrifice) অন্যতম প্রতিবন্ধকতা, সেদেশে জাতীয় অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম প্রমাণ করে গেছেন উদ্দেশ্য যদি মহৎ হয়, লক্ষ্য যদি স্থির থাকে, প্রচেষ্টা যদি আন্তরিক হয়, তবে স্বল্পোন্নত দেশেও ‘বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি’ তথা ‘বারডেম’-এর মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায়।

১৯৫৬ সালে ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমের প্রতিষ্ঠিত ডায়াবেটিস চিকিৎসাকেন্দ্রের প্রথম বছরে মাত্র ৩৯ জন রোগীর চিকিৎসা করা সম্ভব হয়েছিল। সেখানে এখন শুধু ‘বারডেম’-এ চিকিৎসাধীন নিবন্ধিত রোগীর সংখ্যা পাঁচ লাখের কাছাকাছি। শুধু ঢাকা শহর এবং এর উপকণ্ঠে নয়, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির ডায়াবেটিস চিকিৎসাকেন্দ্র আজ দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের সততা থাকলে অঙ্কুর কী করে মহা মহীরুহের রূপ লাভ করতে পারে, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির অন্যতম প্রতিষ্ঠান শাহবাগের বারডেম এটির প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বারডেম এখন শুধু দেশে নয়, বিদেশেও বিস্ময়করভাবে সমাদৃত, এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক তাদের একটি সহযোগী কেন্দ্র (Collaborating Centre) হিসেবে স্বীকৃত। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন বাংলাদেশের ডায়াবেটিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাকে বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিক চিকিৎসার মডেল বা অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবে গণ্য করে। আর ডায়াবেটিস রোগের চিকিৎসার সঙ্গে আমেরিকার জসলিন, ইংল্যান্ডের লরেন্স ও বাংলাদেশের ইব্রাহিমের নাম জড়িয়ে রয়েছে।

রোগীর পরীক্ষা ও রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ডা. ইব্রাহিম ছিলেন নৈপুণ্য ও সূক্ষ্মতার প্রতি অচঞ্চল; এর মধ্যেই তিনি তার শিক্ষার্থী সহকর্মীদের শিখিয়ে ও বুঝিয়ে দিতেন রোগীর রোগ পরীক্ষণ ও নির্ণয় বিষয়টি কত নিখুঁত ও সূক্ষ্ম হওয়া উচিত এবং তিনি কীভাবে তা চান। তিনি ছিলেন প্রকৃতই একজন হাতে-কলমে শিক্ষাদাতা এবং একাধারে তার চিকিৎসা দর্শনের মর্মসাধক। তাই তিনি বলতে পেরেছিলেন, ‘আমি নিজে একটা কথা আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি এবং আমার সহকর্মীদের এ কথাটা আমি সবসময় বলি যে, আমরা জনগণের খাদেম, এ মনোভাব নিয়ে সেবা করব; তাদের প্রভু এ মানসিকতা নিয়ে নয়। কারণ নিজেকে খাদেম মনে করলেই সেবাটা আন্তরিক হয়, মনের মধ্যে বিনয় আসে আর মানুষের প্রতি একটা মানবিক সহমর্মিতা জেগে ওঠে। আর একটা কথা আমাদের ভুললে চলবে না, তা হলো আমাদের এই জনগণ হলো স্বাধীন সার্বভৌম দেশের জনগণ। এরা ১৯৪৭ সালের আগের ব্রিটিশদের গোলাম জনগণ নয়। এরা ১৯৭১ সালের আগের জনগণ নয়। যখন এদেশকে বলা হতো কলোনি। এরা স্বাধীন সার্বভৈৗম একটি দেশের জনগণ।’

ডা. ইব্রাহিম চিকিৎসার ক্ষেত্রে ‘ইম্পেথি’ শব্দটির ওপর অত্যধিক গুরুত্বারোপ করতেন। ইংরেজি ‘ইম্পেথি’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো স্বীয় সত্তা অন্যের সত্তায় বিলীন করে দিয়ে, অন্যের শোক, দুঃখ ও ব্যথার অভিজ্ঞতা কল্পনায় নিজে অনুভব করার শক্তি। আর ‘সিম্পেথি’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো অন্যের শোক-দুঃখের সঙ্গে সমবেদনা বা সমব্যথিত হওয়া। অন্যের শোক, দুঃখ এবং অন্যান্য অভিজ্ঞতা মনে না করলে যেমন দুঃখী বা আর্তপীড়িতের গভীরে যাওয়া যাবে না, ঠিক তেমনি তিনি তার প্রতিষ্ঠানের সহকর্র্মী সব ডাক্তার, সেবাকর্মী, কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের সব সময় বলতেন ‘ইম্পেথি’ শব্দটির অন্তর্নিহিত ভাবকে নিজের মনে প্রতিফলিত করে সেবাদানে মনোনিবেশ করতে। এরূপ মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে যখন কোনো সেবাদানকারী কোনো আর্তপীড়িতের সেবায় নিজেকে প্রয়োগ করবে সে সেবাদানকারীই আর্তপীড়িতের সত্তার সঙ্গে বিলীন হতে পারবে আর সেবাদান তখনই পূর্ণাঙ্গ হবে। এভাবেই কোনো সেবাদানকারী সেবা গ্রহণকারীর মনের গভীরে প্রবেশ করতে পারবে, আর যখন সেবাদানকারী মনে করবে আমি যদি এই আর্তপীড়িত লোকটির মতো হতাম, যে আমার কাছে তার আর্তপীড়ার উপশম চাইতে আসছে এবং আর্তপীড়িতটি যদি আমার জায়গায় হতো, যার কাছ থেকে আমি পীড়িত হয়ে সেবা গ্রহণ করতে এসেছি। এই মানবীয় গুণ আয়ত্ত করার জন্য তিনি সবাইকে সব সময় অনুপ্রাণিত করার জন্য বলতেন, ‘আপনাদের সেবা করতে আমাদের সুযোগ দেওয়ার জন্য আমরা আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ।’ রোগীদের সেবা প্রদানকারীর এরূপ ধারণাই থাকা উচিত যে, তারা বিনা পয়সায় সেবা গ্রহণ করতে এসেছে, এবং এর জন্য তাদের সেবা প্রদানকারীর কাছে কৃতজ্ঞ থাকার চেতনাবোধ থাকতে হবে। পক্ষান্তরে ডা. ইব্রাহিম তার সেবাদানকারী সহকর্মীদের বলতেন, তারা যেন রোগীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এজন্য যে, তারা (রোগীরা) এখানে আমাদের সেবা গ্রহণ করতে এসেছে এবং তারা না এলে আমাদের কাজ থাকত না।

ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম ডায়াবেটিক রোগীর পুনর্বাসনের বিষয়ে তার চিন্তাভাবনাকে জাগ্রত রেখেছিলেন। তিনি জুরাইনে নিজের পারিবারিক সম্পত্তি সমিতিকে দান করে তথায় ডায়াবেটিক রোগীদের পুনর্বাসন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেন। ডায়াবেটিক রোগীরা যাতে সংসারে ও সমাজে বোঝা হয়ে না দাঁড়ায় কর্মজীবনে অকেজো না হয়ে পড়ে সে জন্য তাদের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। শিশুকিশোরদের মধ্যে যারা টাইপ-১ ডায়াবেটিক রোগী তারা যাতে তাদের সংসারের এবং সমাজের বোঝা হয়ে না দাঁড়ায় সে জন্য সমিতির ‘সিডিআইসি’ প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে ২০/২১ বছর বয়স অবধি তাদের বিনামূল্যে ইনসুলিন সরবরাহসহ তাদের মানসিক, শারীরিক বিকাশের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে। নীতি ও নৈতিকতার প্রশ্নে আপসহীন প্রফেসর ইব্রাহিম মনে করতেন ডাক্তারের প্রতি রোগীর আস্থা একটি বড় অনুষঙ্গ। ডাক্তার ইব্রাহিম John Ruskin (8 February 1819-20 January 1900) এর অর্থনৈতিক দর্শন বিষয়ক প্রবন্ধাবলি Unto This Last (1860) বইটির ছাঁচে তার সেবাদর্শন স্থির করেছিলেন এবং সেভাবেই সমগ্র কর্মজীবন গড়ে নিয়েছিলেন, যে বইয়ে রাস্কিন দেখিয়েছেন, ‘অর্থ ও বিত্ত মানুষের সত্যিকারের মূল্যায়ন করে না, মানুষের মূল্যায়ন হয় অন্য মানুষের তার ওপর আস্থার ভিত্তিতে।’

১৯৫৬ সালে মাত্র ২৩ জন রোগী নিয়ে সেগুনবাগিচার একটি টিনশেড ভবনে অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম যখন ডায়াবেটিক চিকিৎসা শুরু করেন তখন থেকেই রোগীর ওপর পরিচালিত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় লব্ধ প্রাইমারি ডাটা সোর্সকে গবেষণার উৎকৃষ্ট উপাদান বিবেচনার গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। সে সময় পরীক্ষার জন্য রোগীর সন্ধানে নামতে হতো তাকে। রাস্তায় চলার পথে কোনো রোগাক্রান্ত অসহায় অসুস্থ মানুষ ভিখারী বেশে বসে থাকলে তাকে নিজের গাড়িতে তুলে নিয়ে যেতেন, তাকে খাইয়ে দাইয়ে ভালো পোশাক-আশাক পরিয়ে উৎফুল্ল করে তারপর তার থেকে রক্ত নিয়ে পরীক্ষা করতেন। সেই পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে তার গবেষণা এগিয়ে চলত। বিলেতের বিখ্যাত বিদ্যায়তনে অধ্যয়ন ও বড় বড় হাসপাতালে চাকরি সূত্রে অর্জিত অভিজ্ঞানের আলোকে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন বিশ্লেষণ এবং উপসংহারে পর্যবেক্ষণ প্রক্ষেপণের মেথডোলজি তিনি অনুসরণ করতেন। তার প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধগুলোতে বাস্তব অনুসন্ধান উৎসারিত পরিসংখ্যান তথ্য-উপাত্তের বিশ্লেষণের উপান্তে এসে একটি পরিশীলন পর্যায়ে পেঁৗঁছাত। আধুনিক গবেষণা রীতিতে ডাটা বিশ্লেষণ এবং একটা রেশনাল কনক্লুশনে উপনীত হতেন এবং তারই ভিত্তিতে টেকসই ও লাগসই চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার পথে যেতেন। এসব দেখেই বোঝা যেত তিনি একাধারে সফল ক্লিনিশিয়ান যেমন ছিলেন, তেমনি ছিলেন খ্যাতনামা চিকিৎসক, শিক্ষক, হাসপাতাল প্রশাসক এবং সর্বোপরি সমাজ সংগঠক। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় গবেষক শুধু গবেষণায়, ক্লিনিশিয়ান কেবল ক্লিনিক্যাল চিকিৎসায়, আবার সমাজ সংগঠক শুধু তার এলাকাতেই সীমাবদ্ধ ও নিবেদিত।

বাংলাদেশে ডায়াবেটিস চিকিৎসা কার্যক্রমকে তিনি সেবার আদর্শে উদ্ভাসিত করেছিলেন। সেই স্মরণে মহৎপ্রাণ এই মানুষটির প্রয়াণের দিনটিতে (৬ সেপ্টেম্বর) ‘ডায়াবেটিস সেবা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে মহৎ। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমের জীবন ও কর্ম থেকে আমরা কতটা শিখতে পেরেছি। আজকের এই মহামারীকালে এই প্রশ্ন খুবই জরুরি।

লেখক সরকারের সাবেক সচিব ও এনবিআর-এর সাবেক চেয়ারম্যান

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত