সপ্তম শ্রেণি : বাংলা দ্বিতীয় পত্র

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২১, ১০:৫৫ পিএম

সেলিনা সিমি, শিক্ষক, মোহাম্মদপুর কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউট সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ভাব-সম্প্রসারণ

নানান দেশের নানান ভাষা, বিনা দেশি ভাষা মিটে কি আশা?

সম্প্রসারিত ভাব : পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের কাছে তার মাতৃভাষা শ্রেষ্ঠ। অন্য ভাষা যতই সহজ হোক না কেন, মাতৃভাষা ছাড়া মনের ভাব উত্তমরূপে আর কোনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। মাতৃভাষা যেকোনো মানুষের অস্তিত্ব ও আত্মপ্রকাশের অবিকল্প একটি বাহন। বিদেশি ভাষায় যতই দক্ষতা অর্জন করুক, মাতৃভাষার মতো এমন সাবলীলভাবে মনের ভাব প্রকাশ করা বিদেশি ভাষায় সদ্য নয়। মাতৃভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করতে মানুষ যতটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে এবং আনন্দ পায়, অন্য ভাষায় তা অসম্ভব। কারণ মাতৃভাষার সঙ্গে রয়েছে তার আত্মিক সম্পর্ক। এ সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। তার আনন্দ-বেদনা, আবেগ-আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন-কল্পনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মাতৃভাষা। মাতৃভাষা মানুষের অস্তিত্বের মহৎ অবলম্বন। তা দেশ ও জাতির সঙ্গে গড়ে তোলে অবিচ্ছেদ্য সাংস্কৃতিক বন্ধন। মাতৃভাষায় কথা বলে যে আনন্দ, আত্মতৃপ্তি আর প্রশান্তি অনুভব করা যায়, বিদেশি ভাষায় কথা বলে হৃদয়ের সেই তৃষ্ণা কিছুতেই মেটে না। মাতৃভাষাই মানুষের মত প্রকাশের সর্বোত্তম বাহন। মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা, বিমূর্ত চেতনা মাতৃভাষার মাধ্যমেই সঠিক প্রতিমূর্তি লাভ করে। বিদেশি ভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা করে মানুষ খ্যাতি অর্জন করতে পারে কিন্তু মাতৃভাষাই তার অস্তিত্বের আসল পরিচয়।

যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই, যাহা পাই তাহা চাই না

সম্প্রসারিত ভাব : মানুষের চাওয়া-পাওয়ার কোনো শেষ নেই। প্রাপ্তিতে তার কখনো তৃপ্তি হয় না। কাক্ষিত বস্তু তার ভাগ্যে জোটে না, অথচ যা পায়, তা সে চায় না। পৃথিবীতে চাওয়া-পাওয়া নিয়ে মানুষের রয়েছে নিরন্তর দ্বন্দ্ব। কাক্সিক্ষত বস্তু বা একান্ত মনোবাঞ্ছা তার কোনোদিন পূরণ হয় না। কঠিন-কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে যা সে পায়, তা হয়তো তার মোটেও কাক্সিক্ষত ছিল না। না পাওয়ার বেদনা তার আকাক্সক্ষাকে আরও তীব্র করে তোলে। অর্থ-সম্পদ, বিলাসের মধ্যে কিছুদিন কাটাবার পর বৈরাগ্যের জন্য কারও কারও মন আকুলি-বিকুলি করে ওঠে। আবার বৈরাগ্যের বিশুষ্ক জীবন কিছুদিন কাটানোর পর তার মন ছুটে যায় ভোগের আনন্দময় জীবনের দিকে। মানুষের মনের এ অস্থিরতা, এ চিত্তচাঞ্চল্য তাকে কখনোই স্থির হতে দেয় না। সে যে সত্যিকার অর্থে কী চায়, তা সে নিজেও জানে না। তাই মানুষ তার কাম্যবস্তু পেয়ে কখনো পরিতৃপ্তি অর্জন করে না। এটা মানবমনের চিরন্তন বৈশিষ্ট্য। চাওয়া-পাওয়ার এ দ্বন্দ্ব তাকে সারা জীবন যন্ত্রণা দেয়, ব্যথিত করে, তাকে সুখ দেয় না। মানব হৃদয়ে চাওয়া-পাওয়ার দ্বন্দ্ব চিরন্তন। সাধ এবং সাধ্য, চাওয়া এবং পাওয়ার যোগফল কখনো মেলে না। প্রাপ্তিতেও তার পরিতৃপ্তি নেই। ভুল চাওয়ার পেছনে সারা জীবন হেঁটে মনে হয়, যা পাওয়ার কথা ছিল তা সে পায়নি, যা পেয়েছে, তা সে চায়নি।

সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে

সম্প্রসারিত ভাব : অপরের উপকার করেই মানবজীবন ধন্য ও সার্থক হয়। অন্যের উপকার সাধনই তাই সবার লক্ষ্য হওয়া উচিত। কেবল নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকলে চলবে না। চারপাশের মানুষের কথাও ভাবতে হবে, ভাবা উচিত। সমাজে বাস করতে হলে একে অপরের সুবিধা-অসুবিধার কথা চিন্তা করে চলতে হবে। কারণ পারস্পরিক সহযোগিতাই মানবজীবনের উন্নতির মূল। এই সহযোগিতা ছাড়া সুস্থ, সুন্দররূপে বাঁচা সম্ভব নয়। অন্যকে বঞ্চিত রেখে কেউ কখনো বেশিদূর অগ্রসর হতে পারে না। তাই সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থ পরিহার করে বৃহত্তর মানুষের কথা ভাবতে হবে। সেখানেই রয়েছে মানবজীবনের সার্থকতা। অন্যের সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে এগিয়ে যাওয়াই প্রত্যেকের কর্তব্য। প্রয়োজনে নিজের স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে অন্যের জন্য জীবন উৎসর্গ করার মহৎ মানসিকতাই দিতে পারে বৃহত্তর মুক্তি। পুষ্পের মতো পরার্থে জীবন উৎসর্গ করার মধ্যেই নিহিত রয়েছে জীবনের সার্থকতা। স্বার্থপর হয়ে কেউ পৃথিবীতে বাঁচতে পারে না। তাই পরের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করার মাধ্যমেই জীবনকে সার্থক ও ধন্য করা সম্ভব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত