ঢাকাসহ সারা দেশে পুলিশের মাদকাসক্ত সদস্যদের নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। যাকে সন্দেহ করা হচ্ছে তাকেই করানো হচ্ছে ডোপ টেস্ট। ইতিমধ্যে তিনশ’ পুলিশ সদস্যকে শনাক্ত করা হয়েছে। ৯০ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে (ডিএমপি) মাদকাসক্ত সদস্য সংখ্যা বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিএমপিতে চাকরি হারানোর তালিকায় রয়েছেন অন্তত শতাধিক সদস্য।
এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ সদস্যদের নিয়মিত রোলকলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ৭ অক্টোবর ডিএমপির প্রফেশনাল স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড ইন্টারনাল ইনভেস্টিগেশনের উপ-পুলিশ কমিশনার মোছা. ফরিদা ইয়াসমিন স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পুলিশের সবকটি থানাসহ সংশ্লিষ্ট ৫৭ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রথম পর্যায়ে কনস্টেবল থেকে সাব-ইন্সপেক্টর পর্যন্ত সন্দেহ হলেই তাকে ডোপ টেস্টের আওতায় আনা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আওতায় আনা হবে। কতিপয় পুলিশের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছেমাদক কারবারিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি তারা মাদকসেবনও করছেন। তাছাড়া কেউ কেউ মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েছেন। মাদকবিরোধী অভিযান জোরালো করার পাশাপাশি যেসব পুলিশ সদস্য মাদকাসক্ত বা মাদক কারবারে জড়িত তাদের চিহ্নিত করতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। নির্দেশনা পেয়ে অনেকে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। ডোপ টেস্টে যাদের পজিটিভ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে সম্প্রতি পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দেশ থেকে মাদক মুক্ত করতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি। বিশেষ করে পুলিশের মাদকের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। কোনো পুলিশ সদস্যকে মাদকসেবন ও ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক সাসপেন্ড করে অভ্যন্তরীণ তদন্ত করা হবে। কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।
ডিএমপির একাধিক সূত্র জানায়, ২০২০ সালের মাঝামাঝিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে ডোপ টেস্ট শুরু হয়। প্রথম অবস্থায় ৩০ সদস্য শনাক্ত হওয়ার পর তদন্ত শেষে ১০ জনকে সাসপেন্ড করা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে আরও একাধিক সদস্য শনাক্ত হলে পুলিশের ভেতর এক ধরনের ডোপ টেস্ট আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ডোপ টেস্টের আওতায় আনায় পুলিশের বেশিরভাগ সদস্যই সাধুবাদ জানান। তবে অনেকেই বলেছেনপুলিশের প্রতিটি সদস্যকে ডোপ টেস্টের আওতায় আনতে পারলে ভালো। পরে পুলিশের উদ্যোগটিকে আরও গতিশীল করতে পুলিশ সদর দপ্তর ও ডিএমপির পক্ষ থেকে আলাদা টিম গঠন করা হয়। তারা বিভিন্ন এলাকা ঘুরে পুলিশ সদস্যদের ওপর নজরদারি শুরু করে। কাউকে সন্দেহ হলেই দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শেষে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
জানা গেছে, গত ৭ অক্টোবর ডিএমপি কমিশনারের নির্দেশে প্রফেশনাল স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড ইন্টারনাল ইনভেস্টিগেশনের উপ-পুলিশ কমিশনার মোছা. ফরিদা ইয়াসামিন ৫৭টি বিভাগে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে বলা হয়, ‘ঢাকায় কর্মরত পুলিশ বা সিভিল সদস্যদের মাদকদ্রব্য সেবন এবং শৃঙ্খলাজনিত কারণে প্যাথলজিক্যাল রিপোর্টের প্রেক্ষিতে এ পর্যন্ত ৯০ পুলিশ সদস্যকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এবং এ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। এ কারণে আপনার অধীনে কর্মরত সকল পুলিশ/সিভিল সদস্যকে মাদকসেবন থেকে বিরত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিয়মিতভাবে রোলকলের মাধ্যমে জানানো এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হলো।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএমপির একাধিক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডিএমপি কমিশনারের পক্ষ থেকে ওই চিঠি পাওয়ার পর প্রতিদিন তিন দফায় (সকাল, দুপুর ও রাত) পুলিশ সদস্যদের মনিটরিং করা হচ্ছে এবং নিয়মিত রোলকল করা হচ্ছে। কোনো সদস্য অনুপস্থিত থাকলে তা তদন্ত করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট কারণ দেখাতে না পারলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি অ্যালকোহল এনালাইজার দিয়েও টেস্ট করানো হচ্ছে। সেখানে পজিটিভ পাওয়া গেলে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে রক্ত পরীক্ষা করানো হচ্ছে। সেখানেও পজিটিভ এলে সাসপেন্ড করে বিভাগীয় মামলা দায়েরের পর চাকরিচ্যুতির সুপারিশ করা হয়। এরপর কমিশনার চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেন। এখানে কারও বিরুদ্ধে পক্ষপাতের কোনো সুযোগ নেই।
পুলিশ সূত্র জানায়, পুলিশ সদস্যদের মধ্যে যারা মাদকাসক্ত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে শুরু হয়েছে চূড়ান্ত অ্যাকশন। পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে ডোপ টেস্টের ফলাফলের ভিত্তিতে তাদের শনাক্ত করে চাকরিবিধি মেনে বাহিনী থেকে বরখাস্ত করে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে পুলিশের সকল ইউনিটে ও সকল রেঞ্জে ডোপ টেস্ট ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে মাদকাসক্ত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ডোপ টেস্ট আতঙ্ক। চাকরি রক্ষা করতে দীর্ঘদিন মাদক গ্রহণে অভ্যস্ত পুলিশ সদস্যরা গোপনে চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন। গত এক বছরে মাদক সংশ্লিষ্টতার জন্য ডোপ টেস্টের মাধ্যমে ঢাকা মহানগর পুলিশে কর্মরত বিভিন্ন পদমর্যাদার ৩ শতাধিক পুলিশ সদস্যকে শনাক্ত করা হয়েছে। শনাক্ত হওয়া সদস্যরা প্রায় নিয়মিত মাদকসেবন করতেন। কেউ কেউ কারবারেও জড়িত ছিলেন। এদের মধ্যে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হওয়ায় ঢাকায় কর্মরত ৯০ পুলিশ সদস্যকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তাদের বেশিরভাগই এসআই, সার্জেন্ট, এএসআই, নায়েক ও কনস্টেবল। তবে কনস্টেবলের সংখ্যা বেশি। সামাজিক মর্যাদার বিষয়টি মাথায় রেখে তাদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না পুলিশের পক্ষ থেকে। তবে এর সংখ্যা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে নাম প্রকাশ করারও পরিকল্পনা রয়েছে পুলিশের।
সূত্র আরও জানায়, সন্দেহজনক পুলিশ সদস্যদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে চলছে গোয়েন্দা কার্যক্রম। তবে ডোপ টেস্টের পর যথাযথ ব্যবস্থায় যেতে যেন প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা হয় ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যসহ অন্যদের মনোবল যেন না ভাঙে সেই বিষয়েও পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রথমে বিভিন্ন দফায় যারা পুলিশ সদস্য হয়েও ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল বা অন্যান্য মাদক সেবনে যুক্ত ছিল তাদের সেই পথ পরিহার করতে বলা হয়। বেশ কয়েক দফায় এমন বার্তা দেওয়ার পর মাদকাসক্ত সদস্যরা সুপথে না এলে তাদের চিহ্নিত করতে ডোপ টেস্টের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এজন্য ডিএমপির পক্ষ থেকে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি থানা, বিভিন্ন ইউনিট ও পুলিশ লাইনসে এই ইউনিটের সদস্যরা কাজ করছে। কাউকে মাদকাসক্ত সন্দেহ হলে তার ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়। এরপর তাকে ডোপ টেস্টের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়। কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করেই এই কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এই নিয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কাজ করছে।
জেলার কয়েক পুলিশ সুপার দেশ রূপান্তরকে বলেন, জেলা বা থানা পর্যায়ে যেসব পুলিশ সদস্যকে মাদকাসক্ত হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে তাদের তালিকা করা হচ্ছে। এই সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এসেছে। প্রতিদিনের রোলকলের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর হার্ডলাইনে আছে পুলিশ। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখানো হচ্ছে।
