দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ সদর ও রায়গঞ্জ উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী নিশ্চিত করেছে আওয়ামী লীগ। তবে এর মধ্যে ৯টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে বিতর্কিত ব্যক্তিকে নৌকার প্রার্থী করার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। গত কয়েক দিন ধরে বিক্ষোভ-সমাবেশের পাশাপাশি এসব প্রার্থী বদলের দাবিতে তারা ইতিমধ্যে কেন্দ্রে লিখিত অভিযোগও পাঠিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার রতনকান্দি, বাগবাটি, বহুলী, শিয়ালকোল, খোকশাবাড়ি, ছোনগাছা, কালিয়া হরিপুর ও সয়দাবাদ ইউনিয়ন। রায়গঞ্জ উপজেলার ধামাইনগর, সোনাখাড়া, চান্দাইকোনা, ধানগড়া, ব্রহ্মগাছা, ঘুড়কা, ধুবিল, নলকায় ও পাঙ্গাসী ইউনিয়ন। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাগবাটি, বহুলী, শিয়ালকোল, কালিয়া হরিপুর, সয়দাবাদ; রায়গঞ্জ উপজেলার পাঙ্গাসী, ধুবিল ও সোনাখাড়া ইউনিয়নে জনবিচ্ছিন্ন নেতা, জামায়াত পরিবারের সন্তান ও বিএনপি নেতাদের নৌকার মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
গত ৭ অক্টোবর আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সভা শেষে প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করা হয়। পরে ৮ অক্টোবর থেকে বিক্ষোভ-সমাবেশ শুরু করেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। এদিকে ওইসব ইউনিয়নে মনোনয়নপ্রত্যাশী অনেকে নিজেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী ঘোষণা দিয়ে মাঠে নেমে প্রচার শুরু করেছেন।
বাগবাটি ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমকে প্রার্থী ঘোষণার পরদিন সকালে তাকে জনবিচ্ছিন্ন দাবি করে ও এর প্রতিবাদে নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ-সমাবেশ করেন। সেই সঙ্গে দলের এ সিদ্ধান্ত পরিবর্তনেরও তারা দাবি করেছেন। অন্যথায় স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
বহুলী ইউনিয়নে মনোনয়ন পাওয়া মঞ্জুরুল আলমের বিরুদ্ধে গরু চুরির অভিযোগে স্থানীয় নেতাকর্মী ও এলাকাবাসী বহুলী বাজারে বিক্ষোভ-সমাবেশ করেছেন। মঞ্জুরুল আলম তার অপকর্মের কারণে মাঝেমধ্যেই সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন। তার প্রার্থিতা বাতিল না করলে সাবেক চেয়ারম্যান এনামুল হক শেখ ও সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা আবদুল বারী তালুকদার প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
এ বিষয়ে আবদুল বারী তালুকদার বলেন, ইউপি চেয়ারম্যানের পাশাপাশি জেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছি। জীবনের শেষ সময়ে দলীয় মনোনয়ন আশা করেছিলাম। দল মনোনয়ন দেয়নি। তাতে কী। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি।
শিয়ালকোল ইউনিয়নে দলের সিনিয়র নেতাদের উপেক্ষা করে ছাত্রলীগ নেতা সেলিম রেজাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এতে এখানে নৌকার বিজয় নিয়ে শঙ্কা দেখা দেওয়ায় গত মঙ্গলবার ওই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ বর্ধিত সভা করে রেজ্যুলেশন কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে পাঠিয়েছে। ওই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম আজম তালুকদার বাবলু বলেন, বিতর্কিত প্রার্থীকে বাদ দেওয়ার জন্য দলের বিশেষ বর্ধিত সভা করে রেজ্যুলেশন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কাছে পাঠিয়েছি। আশা করছি দল বিষয়টির মূল্যায়ন করবে। ইতিমধ্যে ৭ প্রার্থী মনোনয়নপত্র তুলেছেন। যদি মনোনয়ন পরিবর্তন না করা হয় তবে সবাই মিলে একক প্রার্থী নির্ধারণ করে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচন করা হবে।
কালিয়া হরিপুর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুস সবুর মনোনয়ন পাওয়ায় ইউনিয়ন ও ১০টি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের কাছে গত সোমবার লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, বিগত পাঁচ বছর তিনি দলের কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেননি। নেতাকর্মী এবং জনগণের সঙ্গেও তার ছিল না কোনো সম্পর্ক। দায়িত্ব পালনকালে আবদুস সবুর হতদরিদ্রদের ভিজিডির বরাদ্দ ও বিভিন্ন ভাতার কার্ড দেওয়ার নামে অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়ম করেছেন। তার বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ রয়েছে। তারপরও দল তাকেই মনোনয়ন দিয়েছে।
সয়দাবাদ ইউনিয়নে শূন্য থেকে কোটিপতি হওয়া বর্তমান চেয়ারম্যান নবীদুল ইসলামকে নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। বিগত বছরগুলোতে মাঝেমধ্যেই সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ৮-১০টি মামলা তদন্তাধীন।
রায়গঞ্জ উপজেলার পাঙ্গাসী ইউনিয়নে বিএনপি নেতাকে নৌকার প্রার্থী করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন নেতাকর্মীরা। এ মনোনয়ন পুনর্বিবেচনার জন্য কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কাছে লিখিত আবেদন পাঠিয়েছি।
এ বিষয়ে পাঙ্গাসী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মোজাম্মেল হক বলেন, রফিকুল ইসলাম খান নান্নু নৌকা প্রতীক বরাদ্দ পাওয়ায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ। আওয়ামী লীগে তার কোনো সদস্য পদও নেই। তিনি এখনো ১নং ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক পদে রয়েছেন। মনোনয়ন পুনর্বিবেচনার জন্য ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে লিখিত আবেদন পাঠানো হয়েছে।
ধুবিল ইউনিয়নে জামায়াত নেতার ছেলে মিজানুর রহমান রাসেলকে নৌকা প্রতীক বরাদ্দ দেওয়ায় দলের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। এ বিষয়ে সলঙ্গা থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রিপন হাসান বলেন, মিজানুর রহমান রাসেলের বাবা প্রয়াত প্রফেসর আবুবকর তালুকদার ১৯৮৬ সালে জামায়াতে ইসলামী থেকে সিরাজগঞ্জ-৩ (তাড়াশ-রায়গঞ্জ) আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য পদে মনোনয়ন তুলেছিলেন। তার চাচা ও শ্বশুরের পরিবার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তার ভাই হিজবুত তাওহীদের সক্রিয় সদস্য।
এ বিষয়ে ধুবিল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম সরকার বলেন, নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন পূনর্বিবেচনার জন্য ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে লিখিত পত্র দেওয়া হয়েছে। আশা করছি দলের স্বার্থে কেন্দ্রীয় কমিটি বিষয়টি বিবেচনা করবে।
এ বিষয়ে ধুবিল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মিজানুর রহমান রাসেল নিজেকে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন দাবি করলেও তার সময়ের কমিটির কারও নাম বলতে পারেননি।
সোনাখাড়া ইউনিয়নের মনোনয়নপ্রাপ্ত বর্তমান চেয়ারম্যান আবু হেনা মোস্তফা কামাল রিপনের বিরুদ্ধে হতদরিদ্রদের ঘর দেওয়ার নামে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগের তদন্ত চলছে।
এ প্রসঙ্গে সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কে এম হোসেন আলী হাসান বলেন, দলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক নেত্রী। তিনি সব প্রার্থীর মনোনয়ন চূড়ান্ত করেছেন। আমরা চূড়ান্ত মনোনয়নপ্রাপ্তদের পক্ষেই কাজ করব, এর কোনো বিকল্প নেই। তিনি আরও বলেন, প্রার্থী পুনর্বিবেচনার জন্য অনেকে দরখাস্ত দিয়েছেন। সেগুলো আমরা কেন্দ্রে পাঠিয়েছি। আবার অনেকে সরাসরি কেন্দ্রীয় কমিটিতে দরখাস্ত পাঠিয়েছেন। এসব বিষয়ে কেন্দ্রীয় কমিটিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
