বিমানবন্দরে সক্রিয় একাধিক অপরাধী চক্র

চোরাকারবার-মানব পাচারে জড়িত ৯০ কর্মকর্তা-কর্মচারী

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২১, ০৩:০০ এএম

দীর্ঘদিন ধরেই বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও কয়েকটি এয়ারলাইনসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছেন। তারা সোনা ও মানব পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধে সম্পৃক্ত। ইতিমধ্যে তাদের কাউকে কাউকে আইনের আওতায় আনা হলেও কৌশলে তারা অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে হযরত শাহজালাল ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসব অপরাধী চক্র বেশি সক্রিয়। দীর্ঘদিন ধরে তারা অপরাধ চালিয়ে এলেও বেশিরভাগই আছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অভিযোগ জমা পড়া ৯০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা জানতে মাস তিনেক আগে বেবিচককে চিঠি দিয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।

যাদের বিরুদ্ধে অপরাধে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে তারা বেবিচক ও কয়েকটি এয়ারলাইনসে কর্মরত। কয়েক দিন আগেও চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৮০ পিস সোনার বারসহ সিভিল এভিয়েশনের নিরাপত্তাকর্মী মোহাম্মদ বেলালকে গ্রেপ্তার করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম বলে দিয়েছেন।

অপরাধে সম্পৃক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে জমা পড়া অভিযোগে বলা হয়েছে, তারা সোনা পাচারের পাশাপাশি পাসপোর্টে জাল ভিসা লাগিয়ে সংশ্লিষ্ট বিমানের বোর্ডিং ও ইমিগ্রেশন পুলিশের একশ্রেণির সদস্যের সঙ্গে যোগসাজশে মানব পাচার করছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও অভিযোগ থাকা অধিকাংশ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এখনো নেওয়া হয়নি কোনো ধরনের ব্যবস্থা। তবে মুখরক্ষায় কিছু অভিযুক্তকে এক শাখা থেকে আরেক শাখায় বদলি করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ সবকটি বিমানবন্দরের অপরাধমূলক কর্মকা- নিয়ন্ত্রণ করতে নানা উদ্যোগ নিয়েও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। অপরাধ কর্মকা- বেড়ে যাওয়ায় সিভিল এভিয়েশন ও বাংলাদেশ বিমানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইল সংগ্রহ করেছিল গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। সিভিল এভিয়েশন ও বাংলাদেশ বিমানের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নানা অপরাধে সম্পৃক্ত। এমনকি তারা সোনা ও মানব পাচারেও জড়িত। তাদের মধ্যে আবার অনেকে ঠিকভাবে অফিস করছেন না। কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সোনা পাচার করছে। আবার কেউ কেউ পাচার করছে মানুষ। জাল পাসপোর্ট ও ভিসা তৈরি করে এসব অপরাধমূলক কাজ করা হচ্ছে। আর এসব কাজে সহায়তা করছে কিছু ট্রাভেল এজেন্সি ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। কয়েক দিন আগে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৮০ পিস সোনার বারসহ গ্রেপ্তার হওয়া সিভিল এভিয়েশনের নিরাপত্তাকর্মী বেলাল গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, বিমানবন্দর থেকে সোনার বারগুলো বাইরে বের করতে তিনি মোটা অঙ্কের টাকা নেন। বারগুলো বাইরে অপেক্ষমাণ সোনা পাচার চক্রের সদস্যের হাতে দেওয়ার কথা ছিল। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি সোনা পাচারে জড়িত।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের সবকটি বিমানবন্দর দুর্নীতিমুক্ত করতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কোনো বিমানবন্দরে অপরাধমূলক কর্মকা- করতে দেওয়া হবে না। বেবিচক বা বিমানের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর করার চেষ্টা চলছে। যারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জানা গেছে, বিমানসহ বিভিন্ন সংস্থার অপরাধ ঠেকাতে নতুন করে পরিকল্পনা সাজাচ্ছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। তারা বেবিচকের অপরাধী সিন্ডিকেটকে ভেঙে দিতে চাচ্ছে। এজন্য বিমানবন্দরে যারা নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের একটি তালিকা তৈরি করেছে। ওই তালিকায় যাদের নাম এসেছে তাদের কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তাদের বিমানবন্দরে প্রবেশ করতেও বারণ করা হয়েছে। অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বেবিচককে সম্প্রতি একটি চিঠি পাঠিয়েছে মন্ত্রণালয়। পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেবিচক, বাংলাদেশ বিমানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রোফাইল সংগ্রহ করা হচ্ছে। বাসাবাড়িতে গিয়ে তাদের তথ্য নেওয়া হচ্ছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোনো রাজনৈতিক দলের আদর্শের অনুসারী বা সমর্থক কি না, তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা আছে কি না, তারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত আছেন কি না, নিয়মিত অফিস করেন কি না সেসব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনের বাইরে আরও অনেকের নাম আসবে। বায়োডাটা সংগ্রহ করে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হবে।’

জানা গেছে, বিমানবন্দরকেন্দ্রিক অপরাধ চক্রগুলোর বিরুদ্ধে ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুটি প্রতিবেদন দাখিল করে বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়। ওই তালিকায় ৯০ জনের নাম ও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে আসে। কিন্তু অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় পাঁচটি চিঠি দেওয়া হয়। বেবিচক জবাব দিলেও তাতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। পরে গত ২৫ জুলাই আরেকটি চিঠি দেওয়া হয়। বিমান মন্ত্রণালয়ের উপসচিব রোকসিন্দা ফারহানা স্বাক্ষরিত সর্বশেষ চিঠিতে বলা হয়, ‘শাহজালাল বিমানবন্দরে সক্রিয় মানব ও সোনা পাচারকারী চক্র ও তাদের এজেন্টদের বিরুদ্ধে গৃহীত অগ্রগতির বিষয়ে বেবিচক সর্বশেষ যে চিঠি দিয়েছে তাতে প্রদত্ত তথ্যাদি স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। বেবিচকের জবাব পর্যালোচনায় দেখা যায়, মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো চিঠি অনুযায়ী বিদেশি এয়ারলাইনসে কর্মরত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে মন্ত্রণালয় থেকে প্রদত্ত নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনস কী ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে এ সংক্রান্ত তথ্য দেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় বর্ণিত বিষয়ে বিদেশি এয়ারলাইনসে কর্মরত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয় থেকে প্রদত্ত নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনস কর্র্তৃক কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এ সংক্রান্ত তথ্য পাঠানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হলো।’

বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো চিঠিতে বিমানবন্দরে কর্মরত অপরাধ চক্র ও কয়েকটি ট্রাভেল এজেন্সির নাম সংবলিত প্রতিবেদন নিয়ে কাজ চলছে। আমরা চাচ্ছি নিরপরাধ কেউ যেন ফেঁসে না যায়। দ্রুত অভিযুক্তদের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য মন্ত্রণালয়কে জানানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত