মানিকগঞ্জের সিংগাইরে গ্রাহকের আমানতের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের পর আত্মগোপন করার অভিযোগ উঠেছে নামসর্বস্ব একটি সমবায় সমিতির প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে। স্থানীয় চান্দহর বাজারের বেস্টওয়ে মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি (বিএমসি এন্টারপ্রাইজ) নামে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মাওলানা মো. আফজাল হোসেন (৪১) প্রায় দুই হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে অন্তত ১০ কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করে গা-ঢাকা দিয়েছেন। আফজাল একই এলাকার মাধবপুর পশ্চিমপাড়া গ্রামের ইয়াকুব মেম্বারের ছেলে। গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত হিসেবে সংগ্রহ করা টাকা দিয়ে তিনি রাজধানী ঢাকা, সাভার ও মানিকগঞ্জে নিজের নামে ১০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন বলে তথ্য মিলেছে।
জানা গেছে, গ্রাহকরা তাদের আমানতের টাকা ফেরত চাইলে দেই-দিচ্ছি বলে ঘোরাতে থাকেন আফজাল হোসেন। এক পর্যায়ে গ্রাহকদের চাপের মুখে অবস্থা বেগতিক দেখে গত ৯ অক্টোবর তিনি এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। তবে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন খোলা রেখেছেন। আত্মগোপনে যাওয়ার পর থেকে আফজালের বিএমসি এন্টারপ্রাইজ নামের প্রতিষ্ঠানটি রয়েছে তালাবদ্ধ।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চান্দহর বাজারে মজিবর রহমান নামে এক ব্যক্তির ভবন ভাড়া নিয়ে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে মাইক্রো ক্রেডিট অথরিটির নিবন্ধন ছাড়াই আফজাল হোসেন ২০১২ সালে বিএমসি এন্টারপ্রাইজ নামের প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন। এরপর এলাকার মানুষের কাছ থেকে প্রতি লাখে মাসিক এক থেকে দেড় হাজার টাকা মুনাফার লোভ দেখিয়ে প্রায় ১০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেন। আর তা দিয়েই তিনি নিজের মালিকানায় গড়ে তোলেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এরমধ্যে রয়েছে রাজধানী ঢাকায় বালাদ মেটাল, সাভারে শেফা হোমিও হল, বালাদ বেকারি, মানিকনগরে বালাদ ইন্টারন্যাশনাল ক্যাডেট মাদ্রাসা, মাধবপুরে ইকরা আধুনিক উচ্চ বিদ্যালয় এবং চান্দহরে শেফা ফার্মেসি, বালাদ মুদি স্টোর ও গার্মেন্টস পণ্যের দোকান। সম্প্রতি চান্দহর বাজারে গিয়ে আফজালের প্রতিষ্ঠানের ভুক্তভোগী গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিএমসি এন্টারপ্রাইজের গ্রাহক চান্দহর বাজার এলাকার মো. নজরুল ইসলাম জানান, তিনি দেড় বছর আগে লাখ প্রতি মাসিক ১ হাজার টাকা মুনাফায় বিএমসিতে ৫ লাখ টাকা জমা রেখেছিলেন। প্রথমে দুই-তিন কিস্তিতে লাভের টাকা পেয়েছেন। কিন্তু গত ছয় মাস ধরে তিনি লাভ তো দূরের কথা মূল টাকাও ফেরত চেয়ে পাচ্ছেন না।
নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা স্থানীয়ভাবেও কয়েকজন মিলে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা জমিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানে রেখেছিলাম। ওই টাকা নিয়েও দুশ্চিন্তায় আছি। আমাদের মতো অনেকেই লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত জমা রেখে দিশেহারা হয়ে পড়েছে।’
বিএমসি এন্টারপ্রাইজের আরেক গ্রাহক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার পরিবারের কষ্টার্জিত প্রায় দেড় লাখ টাকা ওই প্রতিষ্ঠানে জমা রেখেছি। মালিকের গা-ঢাকা দেওয়ার খবর শুনে আমাদের হতাশায় দিন কাটছে। বর্তমানে তার (আফজাল) ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে এলাকায় ফিরে টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও এলাকায় ফিরছেন না তিনি।’
আফজালের অফিসসংলগ্ন বাড়ির হবি মিয়া নামে এক ব্যক্তির মেয়েও নাম প্রকাশ না করে বিএমসি এন্টারপ্রাইজে টাকা জমা রাখার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের কষ্টার্জিত আমানতের টাকা ফেরত পেতে প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
গ্রাহকের টাকা মেরে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে অভিযুক্ত মাওলানা মো. আফজাল হোসেন মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১০ কোটি টাকা নয়, গ্রাহকদের আমানতের ৭ কোটি টাকা জমা আছে। করোনাকালে ব্যবসায়িক ধসের কারণে এ রকম অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসায় বিনিয়োগসহ সব মিলিয়ে এখনো ৪ কোটি টাকার উপরে সম্পদ আছে। আমি আস্তে আস্তে গ্রাহকদের আমানতের পুরো টাকা পরিশোধ করে দেব।’
সমবায় সমিতির নামে শত শত গ্রাহকের কাছ থেকে বিএমসি এন্টারপ্রাইজের আমানত সংগ্রহের বিষয়ে জানতে চাইলে সিংগাইর উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা আখিনুর ইয়াসমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার জানামতে বিএমসি নামের কোনো প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন নেই এবং আমাদের কাছ থেকে কোনো অনুমতিও নেওয়া হয়নি।’
