দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় কঠোর অবস্থানে সরকার। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর অবস্থানে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকারের শীর্ষপর্যায় থেকে স্বারষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার তাগিদ দেওয়ার পর থেকেই মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তা কৌশলে পরিবর্তন আনা হয়েছে। গুজব বা উসকানির মাধ্যমে কেউ যাতে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে, সে জন্য গোয়েন্দা কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে। গতকাল শুক্রবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, কুমিল্লার ঘটনার পরপরই এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়; বিশেষ করে গতকাল শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রতিমা বিসর্জনের দিনে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকবে।
তারা আরও বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কুমিল্লার ঘটনার জের ধরে তৃতীয় একটি পক্ষ নাশকতা করার অপচেষ্টায় রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল জুমার নামাজের পর রাজধানীর বায়তুল মোকাররম এলাকায় মিছিল থেকে পুলিশের ওপর আক্রমণ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দেশের সব ইউনিট ও জেলার পুলিশ সুপারদের বিশেষ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। গোয়েন্দা কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বলা হয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা আরও জানান, পূজামণ্ডপসহ স্পর্শকতার এলাকা চিহ্নিত করে সেখানকার নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গুজব সৃষ্টিকারীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও শনাক্ত করার কাজ চলছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্থানে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় মামলা দায়ের ও আসামিদের গ্রেপ্তারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তবে গতকাল রাত ৮টা পর্যন্ত কতটি মামলা বা কতজন গ্রেপ্তার হয়েছে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেনি পুলিশ সদর দপ্তর।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফ মাহমুদ অপু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য সরকারের শীর্ষপর্যায় থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর অবস্থানে থাকার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দেশের কোথাও যাতে গুজবের মাধ্যমে হঠাৎ করেই কোনো অপ্রীতিকর বা অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়ে সজাগ থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, কুমিল্লার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পূজামণ্ডপ, মন্দির ও তাদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় জড়িত সম্প্রীতি রক্ষায় আইন প্রয়োগে কঠোর বার্তা অনেককে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে রাজধানীর নাইটিঙ্গেল মোড় ও পল্টনে পুলিশের সঙ্গে বায়তুল মোকাররমে নামাজ পড়তে আসা মুসল্লিদের একটি অংশের সংঘর্ষ হয়েছে। এতে অন্তত ৫ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। ঘটনাস্থল থেকে চারজনকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া সিলেট নগরীর আখালিয়া হালদার পাড়া এলাকায় জুমার নামাজের পর মিছিল নিয়ে একটি পূজামণ্ডপে হামলা করা হয়। মাদারীপুরের কালকিনি পৌর এলাকার ভুরঘাটা বাসস্ট্যান্ডে ‘তৌহিদি জনতার’ ব্যানারে মিছিল হয়। এ সময় উসকানিমূলক স্লোগান দেওয়ার কারণে মিছিল বন্ধ করার চেষ্টা করলে তারা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় অন্তত ৫ জন আহত হয়। পুলিশ অন্তত ৫০ জনকে আসামি করে মামলা করেছে।
সাইবার পেট্রোলিং জোরদার : কুমিল্লার ঘটনার পর থেকে সাইবার ক্রাইম নিয়ে কাজ করা পুলিশের একাধিক সংস্থা অন্তত ৩০০ ফেইসবুক আইডি ও ইউটিউব লিঙ্ক বন্ধ করার জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) তথ্য দিয়েছে। এ ছাড়া শতাধিক সাইবার ক্রিমিনালকে শনাক্ত করে তাদের গ্রেপ্তার করার জন্য অভিযান চালানো হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার হারুন অর রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পূজামণ্ডপ ঘিরে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ধর্মীয় উসকানি দিয়ে যারা পরিস্থিতি খারাপ করার চেষ্টা করছে, তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য কাজ চলছে।’
ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) আ ফ ম আল কিবরিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাইবার স্পেসে গুজব প্রতিরোধ ও উসকানি বন্ধের জন্য সাইবার পেট্রোলিং জোরদার করা হয়েছে। গুজব ও উসকানিদাতাদের শনাক্তের পাশাপাশি অনেক ইউজার আইডি ও ইউটিউব লিঙ্ক বন্ধ করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কুমিল্লার ঘটনায় জড়িত বেশ কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, পূজামণ্ডপের নিরাপত্তার বিষয়ে সরকারপ্রধানের নির্দেশনার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। সেই সব সভার সিদ্ধান্ত কার্যকরের জন্য পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে সারা দেশে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোনো ঘটনার সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশপ্রধান সেই এলাকার ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সরাসরি নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন।
তাদের ভাষ্য, গতকাল বায়তুল মোকাররম এলাকাসহ কয়েকটি এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে কিছু লোকজন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির চেষ্টা করেছিল। সেসব জায়গায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়েছে। এসব ঘটনার জের ধরে তৃতীয় একটি পক্ষ দেশে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। এ জন্যই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্কাবস্থায় রয়েছে। অতীতের মতো কুমিল্লার ঘটনাকে পুঁজি করে তৃতীয় কোনো পক্ষ যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে না পারে, সে বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। গতকাল রাজধানীতে ‘মালিবাগ মুসলিম সমাজ’ নামের ব্যানার নিয়ে কিছু লোকজন মিছিল করার চেষ্টা করে। তারা পুলিশের ওপর চড়াও হয়। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ‘মালিবাগ মুসলিম সমাজ’ নামে কোনো সংগঠনের নাম এর আগে তারা শোনেননি। এ সংগঠনের নেপথ্যে কারা রয়েছে তা তদন্ত করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, গতকাল নোয়াখালীর চৌমুহনীতেও ‘তৌহিদি জনতার’ ব্যানারে একদল ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এতে পুলিশের সঙ্গে তারা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় এক ব্যক্তি নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের কয়েকটি স্থানেও প্রতিমা ভাঙচুরসহ নাশকতার চেষ্টা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে আগামী সপ্তাহের পুরোটাই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। সদর দপ্তরের নির্দেশনায় আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। এর পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে বলা হয়েছে।
পঞ্চগড় জেলার পুলিশ সুপার মো. ইউসুফ আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। কোনো পক্ষ যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে না পারে, সে জন্য পুলিশ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। গোয়েন্দা কার্যক্রমও বাড়ানো হয়েছে।’
পুলিশ সদর দপ্তরের আরেক কর্মকর্তা বলেন, গত তিন দিনে কুমিল্লা, চাঁদপুর ও কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় পূজামণ্ডপকেন্দ্রিক অপ্রীতিকর ঘটনার জের ধরে অন্তত এক ডজন মামলা ও অর্ধশতাধিক সন্দেভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে কুমিল্লার ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে। এখন তাদের গ্রেপ্তার করার চেষ্টা চলছে।
