রাজ্যের রাজনৈতিক হল্লার মধ্যে এ ব্যাপারটা হয়তো চাপাই পড়ে গেছে যে ক্ষোভের শুরুটা হয়েছিল একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর অবমাননাকর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। সেই অশুভ বিকেলে গাড়িচাপা পড়ে মারা যাওয়া কৃষকরা ছিল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অজয় মিশ্রের কটু মন্তব্যের প্রতিবাদ জানাতে সমবেত লোকজনের মধ্যে। মন্ত্রী দম্ভ করে বলেছিলেন, কৃষি আইনের বিরোধিতাকারীদের ‘দুই মিনিটে সোজা করে’ দেবেন তিনি। মিশ্রবাবুর উসকানিমূলক কথা ভারতের রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়। তবে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দেখভালের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একজন ব্যক্তির এ কথা বলা এবং এখন পর্যন্ত তার স্বপদে বহাল থাকা বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা নিয়ে বিজেপির বর্তমান ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এক নাটকীয় পরিবর্তনেরই বার্তা দেয়। আবার লখিমপুর কাণ্ডের একসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া থেকে এটাও বোঝা গেল যে, বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা নিয়ে নীতির ওই রদবদল আগামীতে আর ক্ষমতাসীন দলের জন্য বাড়তি সুবিধা বয়ে না-ও আনতে পারে।
অল্প কিছুদিন আগেও ভারতে রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হলেও বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা রয়েসয়েই বলতেন নেতারা। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের নেতা হলে। আইনপ্রণেতাদের বেমক্কা কথা বলে আইন ভঙ্গ করাটা খারাপ কাজ হিসেবেই দেখা হতো। আবার ওইসব কথার জের ধরে মাত্রাছাড়া ঘটনা ঘটে গেলে সেটাকে মনে করা হতো সরকারের অদক্ষতা। এ বিষয়ে ভারসাম্য রেখে চলার কঠিন কাজটা করতেন বড় নেতারা। ছোটখাটো অনুল্লেখ্য নেতা বা সহযোগী সংগঠনের ওপর চাপানো হতো বিরোধীদের আজেবাজে ভাষায় ‘গালমন্দের’ কাজ। অতীতে ক্ষমতাসীন দলগুলো গালমন্দের কাজটা সারতো রীতিমতো মাপজোখ করে। এমনভাবে কথাগুলো তোলা হতো যাতে কাক্সিক্ষত ফলটি মেলে (সুশাসনের অভাব বা অন্যান্য সমস্যা থেকে নজর সরানো) কিন্তু এমন কোনো গোলমালের সূত্রপাত না হয় যাতে তাদের স্থিতিশীল সরকারের দাবিটা প্রশ্নের মুখে না পড়ে। তবে আজকের বিজেপির অধীনে দেখছি ওই সূক্ষ্ম ভারসাম্যটি ভেঙে পড়েছে। ঘৃণা-বিদ্বেষ আর পার্শ্ব চরিত্রদের হাতে ছেড়ে দেওয়া বিষয় নয়। ফোঁটায় ফোঁটায় চুয়ে পড়া বিষের ধারা এখন জ্বলোচ্ছ্বাসে পরিণত। মুসলিমবিরোধী মন্তব্য করার বা সহিংসতার হুমকি দেওয়ার (অনেক সময় উভয়টিই) ঘৃণা-বিদ্বেষের কারবারিদের বিপুলায়তন দলে এখন নিয়মিত দেখা যায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়ক, গভর্নর ও দলের বড় নেতাদের।
বড় রাজনৈতিক নেতাদের বিদ্বেষমূলক বক্তৃতান্ডবিবৃতির হিসাব করতে এনডিটিভির চালানো এক প্রকল্পে দেখা যায়, ইউপিএ সরকারের আগের ৫ বছরের তুলনায় মোদি সরকারের প্রথম ৫ বছরে ‘ভিআইপি বিদ্বেষ’ বেড়েছে ভয়াবহরকম হারে, ৭৯০ শতাংশ! মোদির দ্বিতীয় মেয়াদে অবস্থা হয়েছে আরও খারাপ। উচ্চপদস্থ দলীয় ব্যক্তিদের মাসে গড় বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা মোদির প্রথম মেয়াদের তুলনায় ৮০ শতাংশ বেড়েছে। গত ৭ বছরে আমাদের হিসাব করা ৩১৫টি ঘৃণা-বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের মধ্যে ২৬৪টিই (বা ৮৪ শতাংশ) এসেছে বিজেপির শীর্ষ নেতাদের কাছ থেকে। বিপরীতে ১৬ শতাংশ মন্তব্য হচ্ছে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের বড় নেতাদের। গেরুয়া পতাকাধারী ভিআইপি ঘৃণার কারবারিদের কাউকেই কখনো আইনগত বা অন্য কোনো ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হয়নি। অথচ তাদের কথার জের ধরে অন্যদের জন্য ঘটে গেছে অনেক বিপর্যয়কর ঘটনা। লখিমপুর খেরি তার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ।
তবে লখিমপুরের বিষয়টা আলাদা। সেখানে বিজেপি তার আরেক ‘ঘৃণা প্রচারকের’ সূত্রপাত করা রাজনৈতিক আগুনের তোড় সামলাতে বেগ পাচ্ছে। পাশের রাজ্য হরিয়ানায় বিজেপিদলীয় মুখ্যমন্ত্রী এমএল খাত্তার প্রতিবাদরত কৃষকদের দিকে ‘ইটের বদলে পাটকেল মারার’ ডাক দেওয়ায় সেই আগুনে ঘি-ই পড়েছে আরো। লখিমপুরের পাশের এলাকার এমপি বরুণ গান্ধী দলের এই বিষয়টি সামলানোর কায়দার নিন্দা করেছেন। তবে তাকেও ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে মুসলিমবিরোধী কথা বলতে দেখা গিয়েছিল। কিছু বিজেপি নেতা লখিমপুর ইস্যুতে দলের অনেক নেতার কথা ও কাজের সমালোচনা করেছেন বেনামে। তাহলে কি এটা শেষ পর্যন্ত বিজেপির জন্য এ শিক্ষাই হতে যাচ্ছে যে, ঘৃণাকে বোতল থেকে বের হতে দিলে তা শুধু রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক সময়ে রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক ফল নিয়ে আসবে তা নিশ্চিত করা আসলে অসম্ভব? দলের ঊর্ধ্বতনদের তরফ থেকে বিদ্বেষ ছড়ানোর বিষয়ে দায়মুক্তির আশ্বাস না থাকলে মন্ত্রী মিশ্রর (বা মুখ্যমন্ত্রী খাট্টার) জন্য নির্বাচনের মৌসুমে কৃষকদের মতো গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণির সঙ্গে এমন আচরণ করার ঝুঁকি নেওয়া খুবই অস্বাভাবিক।
আপাতত প্রাথমিক যেসব ইঙ্গিত পাওয়া গেছে তা অবশ্য অন্য বার্তাই দিচ্ছে। কাউকে দলের পক্ষ থেকে যদি শাস্তি দেওয়া হয়েই থাকে তবে তিনি বরুণ গান্ধী। লখিমপুর নিয়ে দলীয় নেতাদের সমালোচনার পর মা মানেকা গান্ধী ও তাকে একসঙ্গে বিজেপির জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে বিজেপি এখনো অজয় মিশ্রের বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা নিতে পারে। তা যদি হয়-ও, ঘৃণাসূচক বক্তব্যের বিষয়ে বিজেপির দৃষ্টিভঙ্গিতে নাটকীয় পরিবর্তন আশা করা বোকামি হবে। ঘৃণার রাজনীতি থেকে নগদ লাভ এতই বেশি যে তা থেকে খুব বেশি পিছিয়ে যাওয়ার আকর্ষণ কমই। ঘৃণার রাজনীতির জন্য কোনো কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার মতো বিরল ঘটনা শেষ পর্যন্ত ঘটেই গেলে লখিমপুর হতে পারে বিজেপির ‘নতুন স্বাভাবিক’ রাজনীতির সীমার (ঘৃণার রাজনীতির পরিণতির থোড়াই কেয়ার করে চালিয়ে যাওয়া) প্রথম আসল পরীক্ষা।
লেখক : ভারতের এনডিটিভির ‘গ্রুপ এডিটর’। এনডিটিভি অনলাইন থেকে ভাষান্তর আবু ইউসুফ
