গত শুক্রবার মুক্তি পেয়েছে এন রাশেদ চৌধুরী পরিচালিত সিনেমা ‘চন্দ্রাবতী কথা’। প্রিমিয়ার শোতে উপস্থিত চলচ্চিত্র বোদ্ধা ও সমালোচকরা ছবিটির দারুণ প্রশংসা করছেন। প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেছেন, ‘ছবিটি নতুন একটি ধারার সৃষ্টি করেছে।’ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নির্মাতা কামার আহমেদ সাইমন তার ফেইসবুক পেজে লিখেছেন, ‘নিজে যতদিন নির্মাণে আছি, ততদিন অন্তত অন্য ছবি নিয়া লিখব না ভাবসিলাম, ঠিক হবে না, তাই। কিন্তু আহা, চন্দ্রাবতী কথা! সময় কম তাই ছোট করে লিখলাম, ইচ্ছা আছে ভবিষ্যতে বিস্তারিত লিখব এই নিয়া যে, ‘চন্দ্রাবতীর কথা’ আমাদের চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটা সিনেমার দাবি রাখে কেন! কে দেখবে, দেখবে না, সেই লাভ-ক্ষতির হিসাব দিবে মজুদদারে, আমরার আসমানদারিই ভালো!’
ছবিতে প্রধান তিনটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন দিলরুবা দোয়েল, ইমতিয়াজ বর্ষণ ও কাজী নওশাবা আহমেদ। এই তিন তারকাও ছবিটি নিয়ে খুব আশাবাদী। একদিনে প্রত্যেকেই প্রত্যাশার চেয়ে বেশি দর্শক সাড়া পেয়েছেন। দোয়েল বলেন, ‘ছবিটি দেখার পর অনেকেই তাদের ভালো লাগার কথা বলেছেন। যদিও আমরা সেভাবে প্রচারণা করতে পারিনি। আমাদের ছবির নায়ক অন্য শ্যুটিংয়ে ব্যস্ত। তার আগের ছবি ঊনপঞ্চাশ বাতাস দর্শক পছন্দ করেছে। তাই তার প্রচারণায় থাকাটা ছবির জন্য আরও ভালো কিছু বয়ে আনত। তারপরও বলব, দর্শকেরও কিছু দায় আছে। আমরা একটা ভালো সিনেমা উপহার দিয়েছি। সেটা দেখা, সেটা নিয়ে কথা বলা, অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া খুব দরকার।’ দোয়েল আরও বলেন, ‘ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে এখন ছবিটি চলছে। আমি আজ নারায়ণগঞ্জের দর্শকের সঙ্গে ছবিটি দেখব। তবে আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগবে যদি ছবিটি কিশোরগঞ্জের মানুষ দেখতে পারেন। কারণ এই ছবিটি যে মহঅয়সী নারীকে নিয়ে তৈরি, সেই চন্দ্রাবতী এই কিশোরগঞ্জের মেয়ে। তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি। তাই আমরা ছবিটির শ্যুটিংও করেছি কিশোরগঞ্জে। এই এলাকার মানুষ আমাদের তখন নানাভাবে সহায়তা করেছেন। সব মিলিয়ে এই এলাকার মানুষের ছবিটি দেখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় সপ্তাহে আমরা আরও কিছু সিনেমা হল পাব। আমি সবগুলো হলে গিয়ে গিয়ে ছবিটি দেখতে চাই। দর্শকের প্রতিক্রয়া জানতে চাই।’
ছবির নায়ক ইমতিয়াজ বর্ষণ এখন জৈন্তাপুরে। তিনি খিজির হায়াত খানের ‘ওরা সাতজন’ সিনেমার শ্যুটিং নিয়ে ব্যস্ত। সেখান থেকে বললেন, ‘সত্যি আমার মন খারাপ। যে ছবিটি অনেক কষ্ট, সময় ও মনোযোগ দিয়ে করেছি সেটি মুক্তির সময় একদমই থাকতে পারিনি। তারপরও অনেকেই ফোনে এসএমএসে আমাকে ছবিটি তাদের ভালো লেগেছে বলে জানিয়েছেন। আসছে প্রতিটি ছবির আলাদা লক্ষ থাকে। এই ছবির ক্ষেত্রে আমার প্রত্যাশাও ছিল একদম ভিন্ন। আমি জানতাম ছবিটি হয়তো লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কেটে দর্শক দেখতে ভিড় করবেন না। তবে এটির আর্কাইভ্যাল ভ্যালু অনেক বেশি। এটি এমন একটি সময়ের সিনেমা যার কোনো রেফারেন্স নেই। চারশ বছর আগের সময়কে তুলে ধরা হয়েছে। তাও বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবিকে নিয়ে। ফলে ছবিটি সিনেমার ছাত্রদের জন্য একটা রেফারেন্স। ক্রিটিকরা ভীষণ পছন্দ করেছেন ছবিটি।’ এই ছবিতে নিজের চরিত্র নিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে আমি কবি চন্দ্রাবতীর প্রেমিক জয়ানন্দ। আমরা দুজনই একসঙ্গে বেড়ে উঠি, একসঙ্গে সাহিত্যচর্চা করি। আমাদের দুজনেরই গুরু চন্দ্রাবতীর পিতা কবি দ্বীজবংশী। এই চরিত্র আমার জন্য সত্যি চ্যালেঞ্জিং ছিল। কোনো ধরনের রেফারেন্স নেই বলে তৎকালীন ও এই প্রেক্ষাপটে আধুনিক সময়ে লেখা অনেকগুলো বই পড়ে একটু একটু করে চরিত্রের লুক সেট করেছি। দীর্ঘ সময় চুল দাড়ি কাটিনি। শীত ও বর্ষা, দুটি সময় শ্যুটিং হয়েছে। ততদিনে আমাকে চরিত্রের গেটাপেই থাকতে হয়েছে। এ সময়ে কোনো ধরনের কাজও তাই করতে পারিনি। অবশেষে সেই কষ্ট দর্শকের মনে লেগেছে, সেটাই তৃপ্তির।’
অভিনেত্রী নওশাবা বলেন, ‘ছবিটি এক কথায় খুবই সাহসী উদ্যোগ। কোনো ধরনের রেফারেন্স ছাড়া চারশ বছর আগের চিত্র পর্দায় তুলে আনা চাট্টিকথা কথা নয়। সবাই এই সাহসও করতে পারবেন না। ছবিটি দেখলেই বুঝতে পারবেন এর আর্ট ডিরেকশনে কত খরচ হয়েছে। এজন্য অভিনেত্রী হিসেবে আমি বেশকিছু দৃশ্যের শ্যুটিং করতে পারিনি। যদিও তাতে ছবির গল্প বলাতে কোনো অসুবিধা হয়নি পরিচালকের। আমি তার কাছে
চিরকৃতজ্ঞ। কারণ, এই ছবিটি করার সময় অভিনেত্রী হিসেবে যা প্রত্যাশা করি অনেকটাই পেয়েছি। পরিচালক আমাকে চরিত্র হয়ে উঠতে অনেকগুলো বই পড়তে দিয়েছেন। পারফেকশনের জায়গাটা ছিল। এটা একজন শিল্পী হিসেবে আমাকে ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই অনেক হেল্প করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ছবিটি মূলত চন্দ্রাবতীর চোখে রামায়ণের বহিঃপ্রকাশ। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ময়মনসিংহ গীতিকার মলুয়া সুন্দরী পালার সোনাই মাধবের গল্প। আমি এখানে সোনাইয়ের চরিত্রটি করেছি। যে এখনকার সচেতন নারীর প্রতীক। চারশ বছর আগেও যে আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে চায়নি। ছবির শ্যুটিং কয়েক বছর আগে শেষ হলেও আমি এখনো এই চরিত্র নিজের মধ্যে ধারণ করি।’
