কারসাজির তদন্ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি, মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতাসহ বিভিন্ন করণে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে দেশের পুঁজিবাজারে। এক বছরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়ার পর সাম্প্রতিক সময়ের সৃষ্ট অস্থিরতায় কিছুটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কৌঁসুলি বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ শেয়ার বিক্রি করে সাইডলাইনে ফিরছেন।
গত সপ্তাহের ধারাবাহিকতায় শেয়ারের বিক্রি চাপে গতকাল সপ্তাহের প্রথম দিনও মূল্যসূচকের বড় পতন হয়েছে। ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ৭৫ শতাংশ শেয়ারের দরহ্রাসে প্রধান মূল্যসূচকটি ৫৬ দশমিক ৮ পয়েন্ট কমে ৭১৮৬ পয়েন্টে নেমেছে। এ নিয়ে টানা পাঁচ কার্যদিবসের পতনে সূচকটি ১৮১ পয়েন্টের বেশি হারিয়েছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এক বছরে ডিএসইর প্রধান সূচক প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে গত ১০ অক্টোবর রেকর্ড ৭৩৬৭ পয়েন্টে উন্নীত হয়। পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ নজরদারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কড়াকড়ি আরোপের পর গত ১৬ আগস্ট মার্জিন ঋণে সর্বোচ্চ সুবিধা দিয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) নির্দেশনা জারি করে দ্বিতীয় দফায় উল্লম্ফন পরিস্থিতি তৈরি হয়। এরপর গত ১০ আগস্ট পর্যন্ত সূচকটি ৯ শতাংশের বেশি বাড়ে।
এর আগে গত বছরের অক্টোবর থেকে টানা উত্থানে ডিএসইর প্রধান সূচকটি ৪৯৯৫ পয়েন্ট থেকে ৩৫ শতাংশ বেড়ে ৬৭৪৮ পয়েন্টে উন্নীত হয়। দুই দফায় সূচকের টানা উত্থানে অনেক শেয়ার অতিমূল্যায়িত হয়ে পড়ে। করোনা পরিস্থিতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যে তেমন প্রবৃদ্ধি না থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কারসাজির মাধ্যমে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার দর বাড়ানোর ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রেই কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকরাও কারসাজির সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। কোম্পানি থেকেই মূল্য সংবেদনশীল তথ্য আগেই বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ করে শেয়ারের দর বাড়ানো হয়েছে। এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে কিছু কোম্পানির শেয়ারের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি খতিয়ে দেখতে তদন্তের ঘোষণা দেওয়া হলে মূল্য সূচকের পতন ঘটিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে কারসাজিকারকদের একটি পক্ষ। এছাড়া কিছু শেয়ারের দর উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ায় কৌঁসুলি বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলে নিতে শুরু করছেন। এটিও বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে যেসব শেয়ার লেনদেনের শীর্ষ অবস্থানে ছিল এবং টানা দর বেড়েছে গতকাল সেসব শেয়ার সবচেয়ে বেশি দর হারিয়েছে। এরমধ্যে লাফার্জহোলসিম, ওরিয়ন ফার্মা, জিপিএইচ ইস্পাত, রবি, পাওয়ার গ্রিড, বেক্সিমকো ফার্মা ও বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানি ছিল অন্যতম। বড় মূলধনী কোম্পানি লাফার্জহোলসিমের সাড়ে ৬ শতাংশ দরপতনে ডিএসইর প্রধান সূচকটি ১৫ পয়েন্ট কমিয়েছে। এছাড়া আইসিবি, রবি আজিয়াটা, বিকন ফার্মা, ওরিয়ন ফার্মা, ইউনাইটেড পাওয়ার, পাওয়ার গ্রিড, জিপিএইচ ইস্পাত, বেক্সিমকো ফার্মা ও বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানির দরপতনে প্রধান সূচকটির আরও প্রায় ৪৮ পয়েন্ট কমাতে ভূমিকা রেখেছে।
অবশ্য বিপরীত চিত্রও দেখা গেছে। কারসাজিতে ফরচুন সুজের দর টানা বাড়লেও গতকাল শেয়ারটি সর্বোচ্চ সীমায় কেনাবেচা হয়েছে। ডেল্টা লাইফের শেয়ার দরও বাড়ছে। বড় মূলধনী কোম্পানি বিএটি বাংলাদেশ, বেক্সিমকো লিমিটেড, গ্রামীণফোন ছাড়াও এনআরবিসি, এসবিএসি, আইএফআই, ইসলামীসহ কয়েকটি ব্যাংকের শেয়ারও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। মূলত গতকাল ব্যাংকের শেয়ারের দরবৃদ্ধির কারণে সূচক আরও বড় পতন থেকে রক্ষা পেয়েছে।
গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ৩৭৬টি সিকিউরিটিজের মধ্যে দর বেড়েছে মাত্র ৬৫টির। বিপরীতে কমেছে ২৮৭টির ও অপরিবর্তিত রয়েছে ২৪টির দর। খাতওয়ারি পর্যালোচনায় দেখা যায়, গতকাল বেশিরভাগ খাত দর হারালেও ব্যাংক, খাদ্য ও অনুষঙ্গ, বিবিধ, কাগজ ও ট্যানারি খাতের বাজার মূলধন বেড়েছে। বিপরীতে সবচেয়ে বেশি বাজার মূলধন হারিয়েছে সিমেন্ট খাত। লাফার্জহোলসিমের বড় পতনের কারণে পুরো খাতটির বাজার মূলধন কমেছে ৫ শতাংশ। এছাড়া ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত হারিয়েছে প্রায় আড়াই শতাংশ বাজার মূলধন। এর বাইরে সিরামিক, জ¦ালানি, সাধারণ বীমা, ফার্মাসিউটিক্যালস ও বস্ত্র খাত উল্লেখযোগ্য পরিমাণে দর হারিয়েছে।
এদিকে দরপতন হলেও গতকাল ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ আগের কার্যদিবসের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হয়েছে ১ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা, যা গত বৃহস্পতিবারের তুলনায় ১৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেশি।
