শ্যামাপূজায় দীপাবলি উৎসব বর্জনের ঘোষণা

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২১, ০২:০৯ এএম

দেশের বিভিন্ন এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও সহিংসতার ঘটনায় প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ। পরিষদের নেতারা বলছেন, কোনো ঘটনার পর রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি দোষারোপের সংস্কৃতি প্রধান হয়ে উঠেছে। এতে প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। এর প্রতিবাদে এবারের শ্যামাপূজায় দীপাবলির উৎসব বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ। সম্প্রতি শারদীয় দুর্গাপূজায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে পরিষদ এ ঘোষণা দিয়েছে।

গতকাল শুক্রবার পূজা উদযাপন পরিষদের এক বিবৃতিতে বলা হয়, এবারের শ্যামাপূজা সংশ্লিষ্ট মন্দির কর্র্তৃপক্ষের ইচ্ছানুযায়ী করা হবে এবং একাধিক দিনের অনুষ্ঠান বর্জন করতে হবে। এছাড়া শ্যামাপূজায় দীপাবলির উৎসব বর্জনসহ মন্দিরে সন্ধ্যা ৬টা থেকে ১৫ মিনিট কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে দর্শনার্থী ও ভক্তরা নীরবতা পালনের আহ্বান জানানো হয় বিবৃতিতে।

পঞ্জিকা অনুযায়ী, আগামী ৪ নভেম্বর এবারের শ্যামাপূজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। পরিষদ আরও জানায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে মাগুরা, ঝিনাইদহসহ একাধিক স্থানে এবারের কাত্যায়নী পূজা বর্জন করার সিদ্ধান্তে পূজা উদযাপন পরিষদ একাত্মতা প্রকাশ করেছে।

এদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংস হামলার ঘটনার বিচার চেয়ে বাগেরহাটে রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠ এবং দিনাজপুরে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে রামকৃষ্ণ মঠ ও আশ্রম।

গতকাল রাজধানীর জাতীয় ঢাকেশ্বরী মন্দিরে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে পূজা উদযাপন পরিষদ। পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নির্মল চ্যাটার্জি লিখিত বক্তব্যে বলেন, কুমিল্লা নানুয়া দীঘিরপাড়ের মন্ডপটি অস্থায়ী। ঘটনার রাতে প্রশাসনের কোনো লোক মন্ডপ পাহারায় ছিল না। তবে পুলিশ কয়েকবার টহল দিয়েছে যা পূর্ববর্তী বছরসমূহে দেখা যায়নি। সেদিন পার্শ্ববর্তী এক স্থানে কয়েকজন যুবককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। ঘটনার রাতে মন্ডপে নাকি একজন পাহারায় ছিল। রাত ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে কিছুক্ষণের জন্য পূজামন্ডপ এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

আমাদের প্রশ্ন, কী কারণে কিছু সময়ের জন্য বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, সেই বিষয়গুলো তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে কি? তিনি আরও বলেন, ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কেন ভিডিও করার সুযোগ করে দিলেন এবং কেন সে ভিডিও ভাইরাল হয়েছে তা সবার কাছে বিরাট প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। নির্মল চ্যাটার্জি বলেন, নোয়াখালীর চৌমুহনীতে বেলা ১১টার মধ্যে সব পূজাম-পে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন হওয়ার পরও যখন হামলা শুরু হয়, তখন পুলিশ ও প্রশাসনের কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি মর্মে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের কোনো পর্যায়ের দায়িত্ব পালনে গাফিলতি আছে কি না তা অবিলম্বে চিহ্নিত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মনে করি।

তিনি আরও বলেন, ‘এবার করোনা নিম্নমুখী হওয়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ দুর্গাপূজা উদযাপনে সানন্দে অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু সাম্প্রদায়িক অপশক্তির দ্বারা দেশের বিভিন্ন স্থানে পুজোকালীন তা-বের ফলে আনন্দময় অনুষ্ঠানকে নিরানন্দ করে তোলে। প্রশাসনিক ব্যর্থতাও হিন্দু সম্প্রদায়কে প্রচন্ডভাবে আহত ও হতাশ করেছে। দুর্গাপূজা উদযাপনকালে সীমাহীন সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, হত্যা, নির্যাতনের কঠোর নিন্দা ও গভীর শোক প্রকাশ করছি। সে সঙ্গে প্রশাসনের সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আপাত নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছি।’

নির্মল চ্যাটার্জি বলেন, ‘২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনার পর এবং বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গঠিত এক সদস্যবিশিষ্ট শাহাবুদ্দিন কমিশনের রিপোর্টের আলোকে একজনেরও বিচার হয়েছে কি না, তা দৃশ্যমান নয়। বিচারহীনতা বা বিচার না হওয়ার সংস্কৃতি দুষ্কৃতকারীদের উৎসাহিত করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কোনো একটি ঘটনা ঘটলে রাজনৈতিক দলসমূহের পারস্পরিক দোষারোপ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রধান হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক দলসমূহের পারস্পরিক দোষারোপের কারণে প্রকৃত দোষীরাও পার পেয়ে যাচ্ছে, যা দেশের আইনশঙ্খলা ও পারস্পরিক আস্থার জন্য সুখকর নয়। আমরা চাই সরকার, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলসমূহ ও সব স্তরের প্রগতিশীল সুশীল সমাজ সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জোরালো ভূমিকা গ্রহণ করুক।’

নির্মল চ্যাটর্জি বলেন, বিগত ৫০ বছরে সম্প্রদায়িক সহিংসতার শিকার হয়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হিন্দু দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। যারা এখনো দেশকে ভালোবেসে মাতৃভূমিতে থাকতে চাইছেন বা আছেন, তারাও পর্যায়ক্রমে সহিংসতার শিকার হয়ে যে আস্থার সংকটে পড়েছেন, তাতে ভবিষ্যৎ বলে দেবে তারা কতদিন দেশে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারেন। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আসন্ন শ্যামাপূজা সংশ্লিষ্ট মন্দির কর্তৃপক্ষের ইচ্ছা অনুযায়ী প্রতিমা বা ঘটে করা হবে এবং একাধিক দিনের অনুষ্ঠান পরিহার করা হবে। একই সঙ্গে শ্যামাপূজায় দীপাবলির উৎসব বর্জন করা হবে। এছাড়া ওইদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে ১৫ মিনিট কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে দর্শনার্থী ও ভক্তরা নিজ নিজ মন্দিরে নীরবতা পালন করবেন। সংবাদ সম্মেলনে পরিষদের সভাপতি মিলন কান্তি দত্ত, ঢাকা মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কিশোর রঞ্জন মণ্ডল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

বাগেরহাটে মানববন্ধন করেছেন রামকৃষ্ণ আশ্রম ও মিশনের ভক্তরা : শারদীয় দুর্গাপূজায় কুমিল্লা, নোয়াখালীর ইস্কন মন্দির ও পূজাম-পসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাটের প্রতিবাদে বাগেরহাটে এবার মানববন্ধন করেছে রামকৃষ্ণ আশ্রম ও মিশন। গতকাল বেলা ১১টায় বাগেরহাট রামকৃষ্ণ আশ্রমের সামনে সড়কে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন করেন রামকৃষ্ণ আশ্রমের ভক্তরা। মানববন্ধনে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ এবং জাতীয় হিন্দু মহাজোট সংহতি প্রকাশ করে অংশ নেয়। মানববন্ধন থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ভক্তবৃন্দরা। মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন বাগেরহাট রামকৃষ্ণ আশ্রম ও মিশনের মহারাজ গুরু সেবানন্দজী মহারাজ, জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অমিত রায়, সাধারণ সম্পাদক অবনিশ চক্রবর্ত্তী সোনা, জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি শিবপ্রসাদ ঘোষ ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিলন কুমার ব্যানার্জি প্রমুখ।

দিনাজপুরে রামকৃষ্ণ মঠ ও আশ্রমের মৌন মানববন্ধন : দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের ওপর সহিংসতার প্রতিবাদে মৌন মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে দিনাজপুর রামকৃষ্ণ মঠ ও আশ্রম। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় দিনাজপুর শহরের মিশন রোডে দিনাজপুর রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ আশ্রম সম্মুখ সড়কে এ মানববন্ধন হয়। দিনাজপুর রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ আশ্রমের অধ্যক্ষ স্বামী বিভাত্মানন্দজী মহারাজের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিষদ দিনাজপুর শাখার সভাপতি ড. মাসুদুল হক, সাধারণ সম্পাদক ডালিম কুমার রায়, দিনাজপুর রামকৃষ্ণ মিশন কমিটির সভাপতি অজয় কুমার চ্যাটার্জি, সন্ন্যাসী উত্তমানন্দজী, বিকেকানন্দ শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিষদ কাহারোল উপজেলা শাখার সভাপতি মহিত লাল রায়, মা শারদা সংঘের সভানেত্রী রত্না মিত্র, ক্ষত্রিয় সমিতি দিনাজপুরের সাধারণ সম্পাদক মৃত্যুঞ্জয় রায় প্রমুখ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত