বিএনপিপ্রধান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শরীরে অস্ত্রোপচার করে একটি টিউমার অপসারণ করা হয়েছে। টিউমারটি ম্যালিগন্যান্ট কি না তা পরীক্ষা করতে বায়োপসি করা হচ্ছে। তবে গত ১২ অক্টোবর জ¦র নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বিএনপি নেত্রীর অন্যান্য ডাক্তারি পরীক্ষা স্বাভাবিক রয়েছে জানিয়ে তার চিকিৎসকরা বলছেন, তিনি বিপদমুক্ত। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে বলে তার চিকিৎসক ও দলীয় মহাসচিব সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন। খালেদা জিয়াকে এখন সার্জিক্যাল আইসিইউ থেকে কেবিনে স্থানান্তর করা হয়েছে। গতকাল সোমবার সারাদিন খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে বিভিন্ন রকমের খবর প্রকাশ হওয়ায় এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দলের মহাসচিব।
এদিকে অপারেশন করার আগে তাকে দেখাশোনার জন্য গত রবিবার রাতে দেশে আসেন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে যান। হাসপাতাল থেকে রাতেই চলে যান খালেদা জিয়ার গুলশানের বাসভবন ফিরোজায়। গতকাল অপারেশনের সময় তিনি হাসপাতালেই ছিলেন। অপারেশনের পর তিনি তার শাশুড়ি খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলেন।
২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আরাফাত রহমান কোকো। তার মৃত্যুর পর স্ত্রী শর্মিলা দুই সন্তানকে নিয়ে মালয়েশিয়া থেকে লন্ডনে চলে যান। এখন তারা সেখানেই বসবাস করছেন।
বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান মির্জা ফখরুলের : গতকাল সকাল থেকে গুজব ছড়িয়ে পড়ে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে। তাকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়েছে। শেষবারের জন্য দেখতে এসেছেন শর্মিলা রহমান। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে আসেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর জন্য গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘ভালো করে খোঁজ-খবর নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করুন।’
তিনি বলেন, ‘আপনারা নিশ্চিত থাকুন যে, খালেদা জিয়া একদম সুস্থ আছেন। অপারেশনের পর আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তার ভাই (শামীম এস্কান্দার) কথা বলেছেন। বায়োপসির সঙ্গে সম্পৃক্ত দুই চিকিৎসক আমাকে নিশ্চিত করেছেন যে, তিনি সুস্থ আছেন, ভালো আছেন। তিনি বিপদমুক্ত। সি ইজ আউট অব এভরি থিং। অর্থাৎ কোনোরকম বিপদের সম্ভাবনা নেই বলে চিকিৎসকরা মনে করেন।’
খালেদা জিয়ার সর্বশেষ অবস্থা তুলে ধরে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, ‘উনার শরীরের এক জায়গায় ছোট একটা লাম্প আছে। এ লাম্পের ন্যাচার অব অরিজিন জানতে হলে বায়োপসি করা প্রয়োজন। সেজন্য আজকে উনার সেই ছোট একটা বায়োপসি করতে ওটিতে (অপারেশন থিয়েটার) নিয়ে সেটি করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বায়োপসির পর উনি সুস্থ আছেন। উনি আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে পেরেছেন, আফটার অপারেশন, উনার খোঁজ নিয়েছেন। উনার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার সাহেব ও মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শর্মিলা রহমান সিঁথির সঙ্গেও উনি কথা বলেছেন। বায়োপসি-পরবর্তীতে উনার সমস্ত প্যারামিটারস এই মুহূর্তে স্টেবল আছে। উনি সার্জিক্যাল আইসিইউতে চিকিৎসাধীন আছেন।’
ডা. জাহিদ বলেন, ‘আপনারা সবাই দোয়া করবেন। উনি আজকে যে অবস্থায় আছেন, ইনশাআল্লাহ আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে দোয়াও চেয়েছেন যাতে অতি দ্রুত সুস্থ এবং দেশের বাইরে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা যায় সে ব্যাপারে আপনারা যথাযথ ভূমিকা পালন করবেন।’
এক প্রশ্নের জবাবে ব্যক্তিগত এই চিকিৎসক বলেন, ‘বায়োপসি মানে চিকিৎসা নয়। বায়োপসি মানে হচ্ছে একটা ডায়াগনস্টিক প্রসেসের পার্ট এবং এই প্রসেসটা পরবর্তীতে চিকিৎসা কী হবে সেই পরীক্ষার ওপর বেইস করে নির্ধারিত হবে। উনার বয়স ৭৬ বছর। উনার আরও যেসব জটিলতা আছে সেগুলো মাথায় রেখে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য একটা ডেডিকেটেড ডেভেলপড সেন্টার উনার সুচিকিৎসা প্রয়োজন রয়েছে বলে এভারকেয়ার হাসপাতালের মেডিকেল বোর্ড প্রাইমারেলি অপিনিয়ন দিয়েছেন।’
লাম্প কী জানতে চাইলে অধ্যাপক জাহিদ বলেন, ‘এটা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় “ষঁসঢ়” বলে। লাম্প শব্দের অর্থ হচ্ছে ছোট মাংসপি-। ইট ইজ নিয়ারলি ১.২ সেন্টিমিটার ইন সাইজ।’
শরীরের কোথায় লাম্প জানতে চাইলে এ সময় ডা. জাহিদকে থামিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমি একটা এথিক্সের কথা বলি। প্রত্যেকটা রোগীর তার প্রাইভেসি বলে লিগ্যালাইজ বিষয় আছে। এই পর্যন্ত আমরা বলেছি। প্লিজ আপনারা এটা দেখবেন। এটা একটা মোরাল ব্যাপার আছে, এথিক্সের ব্যাপার আছে। আমরা আশা করি এ ব্যাপারে আপনারা আমাদের সহযোগিতা করবেন।’
বায়োপসির প্রতিবেদন কবে নাগাদ হাতে আসে জানতে চাইলে তখন অধ্যাপক জাহিদ বলেন, ‘বায়োপসির রেজাল্ট পেতে সায়েন্টিফিক্যালি ৭২ ঘণ্টা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৫ দিন থেকে ২১ দিন সময় লাগে আমেরিকার মতো জায়গায়।’
গত কয়েক দিন যাবৎ খালেদা জিয়া জ¦র অনুভব করার পর গত ১২ অক্টোবর তাকে বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদারের তত্ত্বাবধায়নে একটি মেডিকেল বোর্ডের অধীনে চিকিৎসাধীন আছেন। ৭৬ বছর বয়সী খালেদা জিয়া বহু বছর আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস ও চোখের সমস্যায় ভুগছেন।
খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন : সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘ডাক্তাররা বারবার বলে আসছেন, তার মেডিকেল বোর্ড বলে আসছেন যে, তার যে মাল্টি ডিসিপ্লিনারি ডিজিস আছে এগুলোর পরিপূর্ণ চিকিৎসা এখানে করানোর কোনো অ্যাডভান্স সেন্টার নেই। এজন্য তার পরিবারের পক্ষ থেকে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছিল। দুর্ভাগ্য আমাদের, আমরা এমন একটা দেশে বাস করি যে একটা সাবেক প্রধানমন্ত্রী তার সাধারণ মানুষের মতো চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার আছে। তার এ অধিকারটুকু সরকার স্বীকার করেনি। তাকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি।’
তিনি বলেন, ‘আমি আবার বলছি, সি নিডস এ অ্যাডভান্স ট্রিটমেন্ট ইন এ অ্যাডভান্স সেন্টার। এটা খুব প্রয়োজন। তার জন্য আইনগত কোনো বাধা আছে বলে আমরা মনে করি না। কারণ সি ইজ এনটাইটেল টু বেইল। কেন বেইল পাবেন না? এটা তার অধিকার, এটা কোনো দয়া নয়। কারণ এ ধরনের একটা মিথ্যা মামলা তারপরও এ মামলায় জামিন পাওয়া তার অধিকার। সরকারের উচিত অবিলম্বে তাকে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার।’
খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসা যদি না পান তার জন্য সরকারকেই শতভাগ দায়-দায়িত্ব বহন করতে হবে বলে হুঁশিয়ারিও দেন বিএনপি মহাসচিব। সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক মো. আল মামুন উপস্থিত ছিলেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের করা দুর্নীতি মামলায় দ-িত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ২০০৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাবাসের পর গত বছর ২৫ মার্চ মানবিক বিবেচনায় সরকার তাকে শর্তসাপেক্ষে সাময়িক মুক্তি দেয়। এরপর থেকে তিনি গুলশানে তার ভাড়া করা বাসা ফিরোজায় থাকছেন। খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার অনুমতি চেয়েছিল তার পরিবার। তবে সরকার বলেছে, সাময়িক মুক্তির শর্ত অনুযায়ী তাকে দেশে রেখেই চিকিৎসা দিতে হবে।
গত এপ্রিল মাসে খালেদা জিয়া বাসায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন। সেখানে ব্যক্তিগত বিশেষ চিকিৎসকদের একটি মেডিকেল টিমের চিকিৎসায় সেরে উঠলেও পোস্ট কভিড জটিলতায় গত ২৭ এপ্রিল তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রায় দুই মাস তিনি সিসিইউতে চিকিৎসা নেওয়ার পর গত ১৯ জুন মেডিকেল বোর্ড বাসায় নিয়ে চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে ছাড়পত্র প্রদান করে।
