সম্প্রতি পীরগঞ্জ, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিচার বিভাগীয় তদন্তসহ আট দফা দাবি নিয়ে রাজধানী ঢাকার শাহবাগ এবং দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলাতে গণঅনশন ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন সংগঠন। গত ২৩ অক্টোবার ভোর ৬টা থেকে শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের আহ্বানে এই কর্মসূচি শুরু করা হয়। দুপুর ১২টা পর্যন্ত সেখানে অবস্থান-অনশন করার পর প্রায় এক ঘণ্টা শাহবাগ মোড় আটকে রেখে বিক্ষোভ মিছিলের মাধ্যমে কর্মসূচি শেষ করা হয়। কর্মসূচি থেকে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ঘোষিত আট দফা দাবি বাস্তবায়ন না হলে আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামসহ সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ‘চল চল ঢাকায় চল’ স্লোগানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করা হবে বলে জানানো হয়। এ ছাড়া আগামী ৪ নভেম্বর হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শ্যামাপূজায় দীপাবলী উৎসব বর্জন করে সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৬টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে স্ব স্ব মন্দিরে নীরবতা পালন এবং মন্দির-মন্ডপ ফটকে কালো কাপড়ে সাম্প্রদায়িক সহিংসতাবিরোধী স্লোগান সংবলিত ব্যানার টানানোর প্রতিবাদী কর্মসূচির সঙ্গে সংহতি জানানো হয়।
পূজা উদযাপন পরিষদের আট দফা দাবির মধ্যে রয়েছে : ১. শারদীয় দুর্গোৎসব চলাকালে এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জেলায় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার তদন্তে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে। ২. সাম্প্রদায়িক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সব মন্দির, বাড়িঘর পুনর্নির্মাণ, গৃহহীনদের পুনর্বাসন, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান ছাড়াও আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা ও নিহতদের প্রতিটি পবিবারকে কমপক্ষে ২০ লাখ টাকা প্রদান, বিকল্পে প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের একজনকে যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। ৩. নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক হামলাকারী ও তাদের পেছনে থাকা চক্রান্তকারীদের অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিশেষ ক্ষমতা আইন, সন্ত্রাস দমন আইনের আওতায় এনে বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন করে দ্রুত অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ৪. সাম্প্রদায়িক হামলাকারীদের রোধে প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনা সত্ত্বেও প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের মধ্যে যারা দায়িত্ব পালনে গাফিলতি ও অবহেলা করেছেন, তাদের চিহ্নিত করে বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। ৫. সামাজিকমাধ্যম ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে যারা ধর্মীয় বিদ্বেষ ছাড়াও সাম্প্রদায়িক উসকানি দিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করে বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় এনে দৃৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। ৬. প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের মোকাবিলায় যেসব জনপ্রতিনিধি এগিয়ে আসেননি, তাদেরও চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ৭. ২০০১-০৬ সাল পর্যন্ত সংগঠিত সাম্প্রদায়িক ঘটনাবলি তদন্তে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনায় গঠিত সাহাবুদ্দীন কমিশনের সুপারিশ সংবলিত রিপোর্ট অনতিবিলম্বে প্রকাশ ও এর সুপারিশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ৮. ১৯৭২ সালের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে সরকারি দলের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুত সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, বৈষম্য বিলোপ আইন প্রণয়ন, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের দ্রুত বাস্তবায়নসহ ধর্মীয় জাতিগত সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে প্রদত্ত অঙ্গীকার দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
শারদীয় দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। যুগ যুগ ধরে এদেশে সাড়ম্বরে দুর্গাপূজা উদযাপিত হয়ে আসছে। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে মন্ডপের আশপাশে কুটির শিল্পের মেলা বসে। সনাতন ধর্মাবলম্বী ছাড়াও অন্য ধর্মের মানুষেরা সেই মেলায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে এই মেলা হয়ে ওঠে বাঙালির মহামিলন ক্ষেত্র। পাকিস্তান আমলেও দেখেছি দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে গ্রামে ৩-৪ দিনব্যাপী যাত্রাগান হতো। মানুষ রাতভর উপভোগ করত সেই যাত্রাগানের পালা। তখনো দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেনি। গত ১৩ অক্টোবর কুমিল্লার নানুয়া দীঘি পূজামন্ডপে পবিত্র কোরআন অবমাননার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারা দেশের পূজামন্ডপে যে হামলা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে, তার প্রতিবাদ জানিয়েছে দেশের কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পী সমাজ। তাদের কথা অতীতে সাম্প্রদায়িক হামলার হোতা অভিযুক্ত অনেক ব্যক্তিকে রাজনৈতিক দলে প্রকাশ্যে কর্মরত দেখা যায়, তাদের চিহ্নিত করে বহিষ্কার ও বিচার করা, ফেইসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ধর্মসভা তথা ওয়াজ মাহফিলে সাম্প্রদায়িক ও নারী বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া, স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তক থেকে সাম্প্রদায়িক পাঠ বিলুপ্ত করে অসাম্প্রদায়িক পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা, ‘রাষ্ট্রধর্ম’ বাতিল করা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় সারা দেশে সংস্কৃতিচর্চার প্রসার ঘটানোর পাশাপাশি বেসরকারি প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় অনুপ্রাণিত করতে প্রচুর সংখ্যক পাঠাগার ও সংস্কৃতি কেন্দ্র স্থাপন করা প্রয়োজন।
সনাতন ধর্মাবলন্বীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতিসহ সচেতন শিক্ষক সমাজ, সম্প্রীতি সমাবেশ করেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ৭৬টির অধিক সংগঠনের সম্মিলিত সংগঠন ‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত ওই মানববন্ধন থেকে বক্তারা বলেন, প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকে যে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করা হয়েছে, তা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে কেন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলিম এই বিভাজন থাকবে? পাঠ্যপুস্তকে বিভাজনের নীতি নয়; পাঠ্যপুস্তকে থাকবে মানবতার নীতি, একতার নীতি। আমাদের প্রথম দায়িত্ব হবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মনে যে ভয় ও শঙ্কা দেখা দিয়েছে তা থেকে তাদের বের করে আনা। কাজটি এত সহজ নয়। এর জন্য দরকার সাম্প্রদায়িকতার বিষধর সাপের শেকড় বাংলার মাটি থেকে সমূলে উৎপাটন করে ’৭১-এর চেতনায় দেশের জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করে তোলা। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার মধ্যেই রয়েছে ’৭১-এর শাণিত চেতনা। যার মূল কথা হলো : অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার কবিতায় বলেন, ‘মোরা একটি বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান। মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তার প্রাণ।’ আর বাঙালি কবি চন্ডিদাস বলেন, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ এ শ্বাশত সত্য প্রতিষ্ঠায় আমাদের ঘুমিয়ে পড়া বিবেককে জাগ্রত করতে হবে।
এ কাজে দেশের প্রগতিশীল ছাত্র, শিক্ষক, কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবীদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প বাঙালি জাতির জন্য এক ভয়াবহ সংকট বয়ে আনবে, যার প্রভাবে বাধাগ্রস্ত হবে আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন। বিশ্বের কাছে বিনষ্ট হবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি। গণতান্ত্রিক ও মানবিক মূল্যবোধ রক্ষা করা হবে কঠিন। ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ ও দু’লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম হারানোর বেদনা হবে অর্থহীন। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ির কারণে পৃথিবীর অনেক দেশে চলছে হানাহানি। দেশে অতীতে এ ধরনের সংকট জাতি দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করেছে। ১৯৪৬ ও ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মহাত্মা গান্ধী ও সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সাহসী পদক্ষেপের দৃষ্টান্তকে সামনে রেখে আমাদের সাম্প্রদায়িকতা রোধে সব ধরনের পার্থক্য ভুলে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন, ’৬৯-এ গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন ও ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে এ দেশের হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও আদিবাসী জনগণ মিলে কাঁধে কাঁধ রেখে যুদ্ধ করে যে দেশ স্বাধীন করেছে, সেই দেশে স্বাধীনতার ৫০ বছর পর কেন হবে সাম্প্রদায়িক সংঘাত? এর পেছনে নিঃসন্দেহে এক গভীর ষড়যন্ত্রের শেকড় লুকিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এই জঘন্য ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে। কিন্তু এবারের রাজনৈতিক দলগুলোর লোক দেখানো প্রতিবাদ কর্মসূচি এবং একে অন্যকে দোষারোপ করার সংস্কৃতি সংখ্যালঘু মানুষের মন থেকে আতঙ্কের কালো মেঘ দূর করতে পারেনি। রাজনৈতিক দোষারোপের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীকে আড়াল করার সুযোগ দেওয়া কোনো ক্রমেই উচিত হবে না। অনেকেই মনে করেন রামু, নাসিরনগর ও সুনামগঞ্জে ইতিপূর্বে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সংঘাতের সুষ্ঠু বিচার হলে দেশে শারদীয় দুর্গোৎসবের সময় এ ধরনের সংঘাত ঘটত না। তাই অপরাধীদের বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক দ্রুত বিচারের মাধ্যমে কঠোর শাস্তি প্রদান করতে হবে, যাতে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘৃণিত ঘটনা আর না ঘটে।
লেখক সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন
