মুনাফার লোভ দেখিয়ে শামীমের প্রতারণার ফাঁদ

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২১, ১১:৫২ পিএম

সরবরাহের ব্যবসায় উচ্চ মুনাফার লোভ দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের থেকে কৌশলে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ইসমাইল ট্রেডার্স লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক শামীম ভূঁইয়া (৩০)। জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া কার্যাদেশ ও নথিপত্র দেখিয়ে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতেন তিনি। তার বিরুদ্ধে টাকা ফেরতে মামলা করলে পাল্টা মামলার মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। এরই মধ্যে শামীমের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীরা ২২টি মামলা করেছেন। গ্রেপ্তার হলেও জামিনে মুক্তি পাওয়ার পরে অনেক ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে নিজে মামলা করেছেন তিনি।

শামীমের প্রতারণার ফাঁদে অনেকে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। এক ভুক্তভোগীকে অচেতন করে নারীর সঙ্গে আপত্তিকর ডিডিও ধারণের মাধ্যমে জিম্মি করেন শামীম। ভয়ে ভুক্তভোগীরা শামীমের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছেন না বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।

শামীম ভূঁইয়ার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর থানার বুধান্তি গ্রামে, বাবার নাম সৈয়দ ভূঁইয়া। থাকতেন রাজধানীর খিলগাঁও থানার বনশ্রী এলাকায়। শামীমের ইসমাইল ট্রেডার্স লিমিটেডের কার্যালয় রয়েছে রাজধানীর মেরুল বাড্ডায়। তবে সেটি দেড় বছর ধরে বন্ধ। চারটি মামলায় শামীমের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

শামীমের প্রতারণার শিকার ব্যক্তিরা জানান, জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া কার্যাদেশ ও নথিপত্র দেখিয়ে বিনিয়োগের নামে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন শামীম। তার সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য এস এম আনিসুর রহমান, ময়না, সালাউদ্দিন, হান্নান ভূঁইয়া, সালমা ভূঁইয়া, খলিল, আহমেদ হোসাইন ও খন্দকার এনামুল হক।

ইসমাইল ট্রেডার্স যে ভবনে, তার দোতলায় ওয়ালটন শোরুমের মালিক হাসান আল মামুন। তার প্রায় ২ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে আত্মগোপন করেছেন শামীম ভূঁইয়া।

হাসান আল মামুন গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একই বিল্ডিংয়ে ব্যবসার সুবাদে ২০১৬ সাল থেকে শামীমের সঙ্গে পরিচয়। তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরবরাহের ব্যবসা করতেন। উচ্চ মুনাফার কথা বলে এ ব্যবসায় বিনিয়োগে আমাকে প্রভাবিত করেন তিনি। প্রথম দিকে লাভের টাকা দিতেন। ধীরে ধীরে আমি বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়িয়েছি। কিন্তু গত দেড় বছর অফিস বন্ধ করে উধাও রয়েছেন তিনি। তার ফোনও বন্ধ।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনেকেই শামীমের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে মামলা করলে পাল্টা হয়রানিমূলক মামলা করেন। এ ভয়ে আমার মতো অনেকেই মামলাও করতে পারছেন না। খুবই অসহায় অবস্থায় রয়েছি।’

শামীমের ব্যবসায়িক অংশীদার জেড টেকনোলজির মালিক এ কে এম শিহাবউদ্দিনকে ২০১৯ সালে শামীম জানান, জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তনের গাউন ও ব্যাগ সরবরাহের কাজটি জেড টেকনোলজি এবং ইসমাইল ট্রেডার্স লিমিটেডের নামে পাওয়া সম্ভব। এ জন্য শিহাবউদ্দিনের কাছে টাকা চান তিনি। পরে জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ের প্যাডে দুটি কার্যাদেশও দেখান শামীম। শিহাব আশ^স্ত হয়ে লাভের আশায় ঋণ করে ১ কোটি ১০ লাখ টাকা দেন শামীমকে।

একইভাবে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনের কার্যাদেশ পাওয়ার কথা বলে আরও ২০ লাখ টাকা নেন। এভাবে বিভিন্ন ধাপে প্রায় ৮ কোটি টাকা দেন শামীমকে। সেই টাকা আর ফেরত পাননি তিনি। পরে সন্দেহ হলে শিহাবউদ্দিন খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, জগন্নাথ ও শাহজালাল বিশ^বিদ্যালয়ে যে সমার্বতন হয়েছে, সেখানে ইসমাইল ট্রেডার্স লিমিটেড কিংবা জেড টেকনোলজি নামে কোনো প্রতিষ্ঠান কাজ পায়নি।

এভাবে ভুয়া কার্যাদেশ, নথিপত্র ও চেকে জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে চারটি মামলা করেছেন শিহাব। পেশায় প্রকৌশলী শিহাবউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যবসায়িক সূত্রে ২০১৬ সালে পরিচয় শামীমের সঙ্গে। আমি বেশিরভাগ সময় দেশের বাইরে থাকি। জেড টেকনোলজি নামে আমার নিজস্ব একটি প্রতিষ্ঠান আছে। ২০১৭ সালে শামীমের খপ্পরে পরে ইসমাইল ট্রেডার্সে বিনিয়োগ করি। পরে সেটি ইসমাইল ট্রেডার্স লিমিটেডে পরিণত হয়, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বানানো হয় আমাকে। কিন্তু ব্যবসার সবকিছু তিনি দেখভাল করতেন। আমি শুধু টাকা দিতাম। নগদ ও চেক মিলে শামীমের অ্যাকাউন্টে ৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা দিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ব্যবসায় তিনি আমাকে কোনো লাভ না দিলেও বিনিয়োগের কথা বলে টাকা নিয়েছেন। আমি ২০১৯ সালের শেষদিকে দেশে এসে ব্যবসা থেকে সরে যাওয়ার কথা বললে শামীম টালবাহানা শুরু করেন। আমাকে টাকা ফেরত না দিতে বিভিন্ন ফন্দি আঁটেন। এর মধ্যে আমার বিরুদ্ধে চেক জালিয়াতির মিথ্যা মামলা করেন। আমি পরে তার বিরুদ্ধে চারটি মামলা করি, যার দুটিতে তিনি চার্জশিটভুক্ত আসামি।’

আরেক ভুক্তভোগী মিরপুর শেওড়াপাড়ার শরীফ ইলেকট্রনিক্সের কর্ণধার এস এম ফকরুল জানান, গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর শামীমের বিরুদ্ধে উত্তরা পূর্ব থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন তিনি। ২০১৬ সাল থেকে গিফট আইটেম সরবরাহের ব্যবসায় বিনিয়োগের নামে তার কাছ থেকে ৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা নেন শামীম। তাকেও ভুয়া কার্যাদেশ দেখিয়ে টাকা নেওয়া হয়। তিনি আরও জানান, বিনিয়োগ করা টাকার জন্য চাপ দিলে শামীম ও তার সহযোগী সালমা ভূঁইয়া গত বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি তাকে (ফকরুল) ফোন করে উত্তরার ৬ নম্বর সেক্টরের ৯ নম্বর সড়কের একটি বাড়িতে ডেকে নেন। সেখানে তাকে জুস পান করিয়ে অচেতন করে এক নারীর সঙ্গে আপত্তিকর ছবি ধারণ করেন। পরে শামীম তাকে বাসায় পৌঁছে দেন। ফকরুলের ফেইসবুক মেসেঞ্জারে সেই ধারণ করা ছবি পাঠিয়ে চুপচাপ থাকতে বলেন। এ ঘটনায় উত্তরা পূর্ব থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন তিনি।

উত্তরা পূর্ব থানায় ফকরুলের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আজিজুল তালুকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলাটি তদন্ত করে আসামি শামীম ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। তদন্তে নেমে এজাহারভুক্ত আসামি ছাড়াও ময়না নামের এক নারীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।’

ভুক্তভোগীদের অভিযোগের সূত্র ধরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শামীমের কাছে একই ধরনের জালিয়াতির শিকার হয়েছেন অন্তত নয় ব্যবসায়ী। তাদের দুজন টাকা ফেরত পেতে মামলা করলে পাল্টা মামলায় তারা জেল খাটেন। শামীম ঠিকানা পাল্টে নতুন এলাকায় গিয়ে নতুন করে মামলা করে ভুক্তভোগীদের চাপে রাখেন। এ কারণে চরম অসহায় অবস্থায় পড়েছেন ভুক্তভোগীরা। এখন পর্যন্ত শামীমের বিরুদ্ধে ২২টি মামলা হয়েছে। সর্বশেষ তার বিরুদ্ধে বাড্ডা থানার একটি মামলার তদন্তভার সিআইডির কাছে গেছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, রুহুল আমিন রানা, হাসান আল মামুন, বিবি আয়শা, ইমরান ফয়সাল, ওয়াহিদুজ্জামান মোহাম্মদ, আশরাফুল আমিন ও মনিরুল ইসলাম মুন্না নামে অন্তত নয়জন একই রকম প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তাদের কয়েকজন আইনের আশ্রয় নিয়েছেন।

শামীমের বিরুদ্ধে রাজধানীর বাড্ডা থানায় হওয়া একটি প্রতারণার মামলা তদন্ত করছে সিআইডি। তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক কাওসার আলী সরদার গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শামীমের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এসব আর্থিক বিষয়ের নথিপত্র যাচাই করার পাশাপাশি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

অভিযোগের বিষয়ে শামীম ভূঁইয়ার বক্তব্য নেওয়ার জন্য তার দুটি মোবাইল ফোন নম্বরে গত দুদিন একাধিকবার চেষ্টা করলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত