জন্মসনদের সুযোগই নেই পথশিশুদের

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২১, ০১:২৭ এএম

ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত এলাকা গুলিস্তানের পাশে মহানগর নাট্যমঞ্চ। এখানে ভাসমান শিশু হিসেবে দিন এবং রাত কাটে সাগরিকা (৮), জান্নাতুল (৯), শুভ (১১), জিয়াদ (৪), হয়বত (১০)সহ আরও অনেক শিশুর। ঠিকানাহীন এ শিশুদের অনেকের বাবার পরিচয় জানা নেই, কারও নেই মা। কারও মা-বাবা কেউ নেই। সমাজের দৃষ্টিতে এরা পথশিশু। এদের অনেকের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির নির্ধারিত বয়স পেরিয়ে গেলেও জন্মসনদের অভাবে স্কুলের চৌকাঠে পা পড়েনি তাদের। এ শিশুরা জানে না জন্মসনদ কী। শিশুকন্যা সাগরিকার মা পাখি বেগম (৩০) আলাপকালে জানান, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থাতেই তাকে ছেড়ে চলে যান স্বামী সাগর। ভবঘুরে স্বামীর কোনো স্থায়ী ঠিকানা ছিল না। মেয়েকে নিয়ে কেরানীগঞ্জের কালীগঞ্জের বাস করতে শুরু করেন পাখি। সেখান থেকে চলে আসেন গুলিস্তানে। স্বপ্ন দেখেন মেয়ে সাগরিকাকে পড়ালেখা করিয়ে মানুষ করবেন। কিন্তু বাধ সাধে জন্মসনদের শর্ত। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ে গেলেও পরিচয় ও ঠিকানাবিহীন থাকা ও জন্ম নিবন্ধনের ফি দেওয়ার মতো সামর্থ্য না থাকায় ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হয় তাকে। একটি জন্মসনদের অভাবে সাগরিকার মতো অসংখ্য শিশু পরিচয়হীন। তারা বঞ্চিত শিক্ষা, রাষ্ট্রীয়, সামাজিক অধিকার ও সুবিধা থেকে। পরিচয়হীনতায় নিজেকে নিরাপদ ভেবে অসংখ্য শিশু জড়িয়ে পড়ছে নানা অনৈতিক ও অপরাধমূলক কাজে।

সারা দেশে পথশিশুর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে সরকারিভাবে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। কারা পথশিশু সে বিষয়ে কোনো সংজ্ঞাও নির্ধারণ হয়নি এখনো। জানা গেছে, ২০০৪ সালে বিবিএসের (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো) জরিপে বলা হয়, দেশে পথশিশুর সংখ্যা ৬ লাখ ৭৯ হাজারের কিছু বেশি। এরপর আনুষ্ঠানিক কোনো জরিপ হয়নি। যে পরিসংখ্যান করা হয়েছিল তাতে বিবিএসের অভিক্ষেপণ (প্রজেকশন) ছিল এমন ২০১৪ সালে এ সংখ্যা হওয়ার কথা ১১ লাখ ৪৪ হাজার। একইভাবে ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ১৬ লাখ হবে বলে ধরে নেওয়া হয়। তবে সংজ্ঞা নির্ধারণ না হওয়ায় এদের মধ্যে কতজন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, কতজন পরিবারের সঙ্গে থাকে সে বিষয়টি সামনে আসেনি।

পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা ব্যক্তি ও সংগঠনসমূহের সংগঠন স্ট্রিট চিলড্রেন অ্যাকটিভিস্টস নেটওয়ার্ক-স্ক্যানসহ বিভিন্ন সংগঠন বিবিএসের অভিক্ষেপণের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে জানায়, সারা দেশে পথশিশুর সংখ্যা ১৩ লাখের বেশি। জন্মসনদ না থাকায় এদের বড় একটা অংশ পরিচয়হীন। রাজধানী ঢাকাতে পথশিশুর সংখ্যা সাড়ে চার লাখ। ঢাকায় তিন লাখের মতো শিশুর পরিচয় ও বাসস্থান নেই। পরিচয়হীন এসব শিশুর জন্মসনদও নেই এবং অতি দারিদ্র্যের দরুন এদের বেশিরভাগ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। পারিবারিক সান্নিধ্য ও জন্মসনদ না থাকায় প্রাথমিক শিক্ষা তো নয়ই, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বিভিন্ন পরিষেবা থেকে তারা বঞ্চিত। সংশ্লিষ্টরা জানান, পরিবারে ভরণপোষণের নিশ্চয়তা না থাকায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পথশিশুদের অনেকে পেশা হিসেবে হকারি, বিভিন্ন গণপরিবহনের চালকের সহকারী, রিকশা চালনা, পান-সিগারেট বিক্রি, বর্জ্য সংগ্রহ, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন শিল্পকারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। পথশিশুদের অনেকেই মাদকাসক্ত ও মাদক বহনকারী। আর্থিক নিশ্চয়তা ও পারিবারিক সান্নিধ্য না থাকায় মেয়ে পথশিশুদের অনেকে একসময় বেছে নেয় যৌন পেশা। পথশিশুদের বেশিরভাগের রাত কাটে ফুটপাতে, পদচারী সেতুতে, পার্ক, রেলস্টেশন কিংবা লঞ্চঘাটে। ছেলেশিশুগুলো বড় হচ্ছে ভবঘুরে হিসেবে। এদের অনেকেই বড়দের যৌন নির্যাতনের শিকার হলেও প্রতিকার পায় না।

স্ক্যানের সভাপতি জাহাঙ্গীর নাকির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কারা পথশিশু সে বিষয়ে এখনো সংজ্ঞা নির্ধারণ হয়নি। সরকারিভাবে সঠিক কোনো পরিসংখ্যানও হয়নি। ইউনিসেফের পর্যবেক্ষণের নিরিখে আমাদের প্রস্তাব ছিল যে শিশু দিনরাত ফুটপাত কিংবা রাস্তায় থাকে, যে শিশু সারা দিন রাস্তায় থাকে কিন্তু দিন শেষে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ফেরে এবং যে শিশু রাস্তায় থাকে কিন্তু পরিবারের সঙ্গে থাকে তাদের মধ্যে থেকে পথশিশু নির্ধারণ করা হোক। আমাদের প্রশ্ন, যে শিশুটি ভূমিষ্ঠ হলো তার জাতীয় পরিচয় কী? সে কি এ দেশের নাগরিক নয়? জন্মসনদ না থাকায় ভবিষ্যতে জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা মৌলিক অধিকার থেকে সে বঞ্চিত হতে যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘দিন দিন পথশিশুর সংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে তাদের পরিচয়হীনতায় বাড়ছে নানা অপরাধ।’ আপাত সমাধান হিসেবে বায়োমেট্রিক পদ্ধতির ব্যবহার চালুর ওপর জোর দেন তিনি।

আইনজীবী ও শিশু অধিকারকর্মীরা জানান, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪-এর ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের ২০১৮ সালের জন্ম/মৃত্যু নিবন্ধন বিধিমালাসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, পিতৃপরিচয়হীন, এতিম শিশুর জন্ম নিবন্ধন করা যাবে। তথ্যের ঘাটতিতে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধক জন্ম বা মৃত্যুর নিবন্ধন প্রত্যাখ্যান করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে যেসব তথ্যের ঘাটতি বা অসম্পূর্ণ থাকবে সেখানে ‘অপ্রাপ্য’ লিখে জন্ম ও মৃত্যুর নিবন্ধন করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শিশুর পিতৃ, মাতৃপরিচয় ও ঠিকানা না থাকা, শিশুর ধর্ম নির্ধারণ করতে না পারা, নিবন্ধন নিয়ে শিশুর অজ্ঞতা ও ফি দিতে না পারায় সংশ্লিষ্টরা নিবন্ধন করতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। উপরন্তু নিবন্ধন ফরমে অসামঞ্জস্যতার অভিযোগ করে শিশু অধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা বলছেন, নিবন্ধন ফরমে নাম, পিতা-মাতার নাম, স্থায়ী ঠিকানা, বর্তমান ঠিকানার জন্য পৃথক ক্রম রাখা হলেও পথশিশুদের তথ্য সংবলিত কোনো ক্রম রাখা হয়নি। যারা পথশিশু তাদের অনেকের পরিচয় ও বাসস্থান নেই। এ ক্ষেত্রে নিবন্ধন ফি একটি বড় বাধা বলে মনে করেন শিশু অধিকারকর্মীরা।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও শিশু অধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট এএম জামিউল হক ফয়সাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিতাপের বিষয় হলো, পথশিশুর বিষয়ে নিবন্ধন ফরমে কিছু উল্লেখ নেই। এখন প্রশ্ন হলো, এ শিশুটির কি জন্ম নিবন্ধন হবে না? পথশিশুদের বিষয়ে ফরমে বিশেষ কিছু রাখা এবং তাদের নিবন্ধনে আর্থিক ফি না রাখলে বিষয়টি সহজ হতো।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশের সংবিধান ও আইন কাউকে বিভাজনের দৃষ্টিতে রাখার বিষয়ে সমর্থন দেয় না। পথশিশুরাও এ দেশের নাগরিক। কিন্তু শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য ন্যায্য অধিকার থেকে তারা কেন বঞ্চিত হবে?’

শিশু অধিকারকর্মীরা জানান, নিবন্ধনহীন শিশুদের অপরাধে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। পরিণত বয়সের অপরাধীরা তাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নানা অপরাধমূলক কাজকর্ম করিয়ে নিচ্ছে। আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশুদের আইনের আওতায় এনে সংশোধনের সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। শিশুদের অপরাধমুখী হওয়ার এটিও একটি বড় কারণ বলে মনে করেন শিশু অধিকারকর্মীরা। শিশু অধিকার সংগঠন চিলড্রেন চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার এম আবদুল হালিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মোটামুটি ১৫ বছর বয়স থেকে একজন শিশুর বোধশক্তি শুরু হতে থাকে। আর যখন সে বুঝতে পারে তার কোনো জন্ম নিবন্ধন নেই, পরিচয় নেই, স্কুলের সার্টিফিকেট নেই তখনই তার মধ্যে এক ধরনের দুঃসাহস ও অপরাধপ্রবণতা কাজ করে। নিজেদের নিরাপদ ভেবে সে তখন মানুষের গলা কাটতেও দ্বিধাবোধ করে না। যেহেতু জন্ম নিবন্ধন নেই তার সম্পর্কে কোনো তথ্যও নেই, তাই সে থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ জায়গাটায় অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আমরা সমাজে দেখছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘যেখানে একজন শিশুর খাদ্য ও বাসস্থানের কোনো নিশ্চয়তা নেই সেখানে জন্ম নিবন্ধন তার কাছে একটি অকল্পনীয় বিষয়। এখন এটাকে কল্পনীয় করার দায়িত্বটা আসলে সরকারের। না হলে পথশিশুদের অপরাধপ্রবণতা বাড়তেই থাকবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত