সম্পাদক পরিষদের আলোচনা সভা

প্রেস কাউন্সিলকে শক্তিশালী করার আহ্বান

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২১, ০১:৩২ এএম

স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের মতো আইনগুলো বাদ দিয়ে বা সংশোধন করে সাংবাদিকতার বিকাশ ও সাংবাদিকদের সুরক্ষায় নতুন আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন সম্পাদকরা। একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রেস কাউন্সিল, প্রেস ইনস্টিটিউট ও তথ্য কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয় করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।

গতকাল শনিবার সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ আয়োজিত ‘৫০ বছরের বাংলাদেশ : গণমাধ্যমের অর্জন ও আগামীর চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন বক্তারা। সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও  দৈনিক বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। আলোচনা সভায় মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম।

অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের সমস্ত পেশায় দলীয় রাজনীতির বিভাজন বড় সংকট সৃষ্টি করেছে। সাংবাদিকতার মতো স্বাধীন চিন্তাশীল পেশাও এই পথে বিভক্ত। এতে চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং সুশাসন নিশ্চিতে গণমাধ্যম শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারছে না। এর সঙ্গে রয়েছে সরকার, মালিক ও বিজ্ঞাপনদাতাদের অনৈতিক চাপ। সব মিলিয়ে চরম প্রতিকূল পরিবেশে তরুণ সাংবাদিকদের কাজ করতে হচ্ছে। তারা যে বেতন ভাতা পাচ্ছে সেটি অত্যন্ত সীমিত ও দায়সারা।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সাংবাদিকদের প্রতি নির্যাতনমূলক ব্যবস্থা উল্লেখ করে এই শিক্ষাবিদ বলেন, নগণ্য অভিযোগেও সাংবাদিকদের জেলে যেতে হচ্ছেএটা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য অবমাননাকর। সাংবাদিকদের যাতে আদালতের দরজায় যেতে না হয় সে জন্য প্রেস কাউন্সিলকে সাংবিধানিক ব্যবস্থার আদলে সাংবাদিকদের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য গড়ে তোলার পক্ষে মত দেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক সাবেক অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান বলেন, সাংবাদিকরা এখন রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করেনযার প্রভাব পড়ছে মানবাধিকার, ভোটাধিকার, মুক্ত চিন্তার মতো মৌলিক অধিকারের ওপর। সাংবাদিকদের একটি সংগঠনের বাইরে আর কোনো সংগঠন থাকা উচিৎ নয় বলে মনে করে সাংবাদিকতার সাবেক এই শিক্ষক।

সভাপতির বক্তব্যে মাহফুজ আনাম স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য দেশের বিচার বিভাগ, সরকার, মালিক ও সাংবাদিকএই চার পক্ষের কাছে চার দফা অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, বিচার বিভাগকে অনুরোধ জানাই, আইনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যে মামলা গ্রহণযোগ্য নয় তারা সেগুলোও গ্রহণ করছে। এগুলো যেন তারা বিবেচনা করে। সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, অফিসিয়াল সিক্রেসি আইনের মতো নিবর্তন আইনগুলো বাদ দিয়ে প্রোটেক্ট টু জার্নালিস্টের মতো আইন করতে হবে। সাংবাদিকরা সরকারের প্রতিপক্ষ নয়, বরং স্বাধীন সাংবাদিকতা ছাড়া সরকার কখনোই সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।

মালিকপক্ষের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে মাহফুজ আনাম বলেন, শিল্প মালিকরা তাদের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পণ্যের মানের দিকে সর্বোচ্চ নজর দেন। কিন্তু গণমাধ্যমের বেলায় ভিন্ন নীতি।

তিনি বলেন, গণমাধ্যম একটি ভিন্ন ব্যবস্থা এটি অনুধাবনের চেষ্টা করুন। আপনারা যখন সংবাদপত্রে বিনিয়োগ করবেন তখন এর কোয়ালিটির দিকে নজর দিতে হবে। কারণ সাংবাদিকতার একমাত্র কোয়ালিটি হচ্ছে ক্রেডিবিলিটি বা বস্তুনিষ্ঠতা। সবশেষ সাংবাদিকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, অন্য দশটি পেশার মতো এই পেশা নয়। এটি একটি পাবলিক ইন্টারেস্ট (জনস্বার্থ) সংশ্লিষ্ট পেশা। ফলে হৃদয় দিয়ে আপনার পেশাকে অনুধাবন করুন।       

নিউ এইজ সম্পাদক নুরুল কবির তার বক্তব্যে স্বাধীন সাংবাদিকতা কীভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন করে তার বৈশ্বিক চিত্র ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, কোনো রাষ্ট্রে প্রবল সাংবাদিকতা থাকলে গণতন্ত্রের সব সূচক গতিশীল থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান সাংবাদিকতা ম্রিয়মাণ। রাষ্ট্র অবমাননার অজুহাত তুলে একজন এমপি-মন্ত্রী এমনকি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করলে সাংবাদিকদের জেলে যেতে হচ্ছে। এটি দাসত্বের শৃঙ্খল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন, বড় বড় শিল্পপতিরা সংবাদপত্র শিল্পে বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসছেন। কিন্তু তারা প্রত্যেকে আসছেন নিজের স্বার্থরক্ষায়। তারা গণমাধ্যমের স্বার্থ নিয়ে চিন্তা করবেন, এটা ভাবার কারণ নেই। কে গণমাধ্যমের মালিক হতে পারবেন, তার কোনো নীতিমালা নেই। যে কেউ গণমাধ্যমের মালিক হতে পারেন।

শ্যামল দত্ত প্রশ্ন রাখেন, কর্র্তৃত্বপরায়ণ শাসনব্যবস্থা যখন প্রবলভাবে শাসন করে, তখন গণমাধ্যম কীভাবে স্বাধীনভাবে কাজ করবে? সংসদ, বিচার বিভাগ কি যথাযথভাবে কাজ করছে? নির্বাহী বিভাগ দলীয় আনুগত্যের একটি উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, নিউজ টুডের সম্পাদক রিয়াজউদ্দিন আহমেদ, ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক জাফর সোবহান ও দৈনিক আজাদীর সম্পাদক আব্দুল মালেক। এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানসহ সারা দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত