কামরুল হাসান জন্মশতর্বষ

বাঙালিত্বের এবং শিল্পযাত্রার অনন্য উৎসব

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১০:১৯ পিএম

কামরুল হাসানের জন্মশতবর্ষ বাঙালির গৃহদ্বারে করাঘাত করেছে, তবে সাড়া দেওয়ার মতো বিশেষ কাউকে মিলছে না, না ঘরে না বাইরে। এমন নয় যে কভিড অতিমারী আক্রান্ত হয়ে আমরা কুঁকড়ে গেছি, সম্মিলিত কোনো উদ্যোগ নিতে পারছি না। সেই সংকট একান্ত বাহ্যিক, এর অভিঘাত ব্যাপক হলেও কেবল বাস্তব কারণে যে আমরা কামরুল হাসানকে তার যোগ্য মর্যাদায় উদ্যাপন করতে পারছি না তা নয়, মানসিকভাবে কিংবা চিন্তাজগতেও আমরা নানা রোগে জর্জর হয়ে পড়েছি, তাই যথাযোগ্যভাবে কামরুল হাসান স্মরণে আমাদের রয়েছে উদ্যমহীনতা। এর ফলে কামরুল হাসানের জীবন, শিল্পচিন্তা ও কর্ম এবং বাঙালি জীবনে মুক্তি বয়ে আনতে তার বহুমুখী ভূমিকা, কোনো কিছুই তুচ্ছ হয়ে যায় না, উল্টো আমরাই খেয়ানত করি আমাদের আমানতের। কেননা এত বিপুল এবং বহুবিচিত্রভাবে বাঙালির জীবন ও চিত্তপট যিনি রাঙিয়ে তুলেছিলেন, জন্মশতবর্ষে তার মহিমা অনুধাবন না করতে পারলে আমরা পথের দিশা হারিয়ে ফেলব, ঘুরে মরব গোলকধাঁধায়, যার লক্ষণ নানাভাবে আমাদের জানান দিচ্ছে। ফলে কামরুল হাসানের জন্মশতবর্ষের শুভক্ষণকে আমরা যেন শুভাশিষ হিসেবে গ্রহণ করে নিজেদের জানি আরও নিবিড়ভাবে, বুঝি মানবের অভিযাত্রা, শিশুতীর্থের যাত্রীদলের মতো জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে আমরা অভিযাত্রীদলেরই তো সদস্য, যদিও পথ আমাদের জানা নেই, অভীষ্ট নিয়েও নেই কোনো বিকার, আপাততুষ্টি নিয়ে বিভোর এবং জীবনের অমোঘ টানে ভেসে বেড়াবার আনন্দে বুঁদ, চলার প্রত্যয় আমাদের জন্য অবান্তর।

কামরুল জন্মশতবর্ষ আমাদের জন্য তাৎপর্যময়, ব্যক্তি-কামরুলের নিরিখে যেমন, তেমনিভাবে বাঙালি জীবনের পটবিস্তারেও। তার জন্মের কাল এবং পরবর্তী সমাজ-বিবর্তনের ধারায় তাকে বিচার করতে হবে এবং তখনই আমরা বুঝতে পারব কতভাবেই-না তিনি শিং উঁচিয়ে ছুটে আসা ধাবমান বৃষের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাকে বশে আনা ও পরাভূত করার চেষ্টা করেছিলেন। বাঙালি বাবুর যে সংস্কৃতি, মেট্রোপলিটান কলকাতায় বেড়ে-ওঠা এই যুবকের মধ্যে তার ছিটেফোঁটাও ছিল না। কেন কীভাবে এটা সম্ভব হয়েছিল তা বুঝতে আমরা চট করে চোখ ফেরাতে পারি অভাবী সংসারে বেড়ে-ওঠা তার শৈশব-যৌবনের দিকে। অভাব-অনটন তাকে বঞ্চিত করতে চাইছিল অনেক কিছু থেকে, কিন্তু কামরুলের চরিত্রে বুঝি তার চেয়েও বেশি কিছু ছিল, তিনি চলার পথে আহরণ করেছিলেন বহুবিচিত্র উপাদান।

কামরুল হাসান গোরস্থানের সন্তান, পিতা ছিলেন কলকাতার তিলজালার মুসলিম কবরস্থানের তত্ত্বাবধায়ক। গোবরার সেই কবরস্থানের পূর্বমহিমা এখন আর নেই, তবে সেখানে কেউ কেউ আছেন যারা আত্মীয়তার দাবি করেন কামরুল হাসান অথবা তার সুহৃদ অনন্য সংগীতশিল্পী আবদুল লতিফের সঙ্গে। তার চেয়ে বড় কথা গোরস্থানের যুবক একদিকে ভিড়লেন শরীরচর্চার আখড়ায়, অন্যদিকে বলা যেতে পারে দেয়াল টপকে ঢুকলেন কলকাতা আর্ট কলেজে। শরীরচর্চায় তার আগ্রহ নিছক ‘বঙ্গশ্রী’ হওয়ার আকাক্সক্ষা থেকে নয়, বরং স্বদেশি যুগের বীরত্বে বাঙালি প্রত্যয় প্রতিষ্ঠার তিনি বুঝি ছিলেন শেষ সদস্য। আর্ট কলেজে তিনি সুযোগ পেয়েছিলেন রীতিবদ্ধভাবে শিল্পশিক্ষা ও শিল্পচর্চার। তবে আমরা জানি, সবচেয়ে বড় শিল্পশিক্ষা তিনি গ্রহণ করেছিলেন গুরুসদয় দত্ত দ্বারা প্রাণিত হয়ে ব্রতচারী আন্দোলন এবং লোকশিল্প মেলা ও লোকশিল্পীদের সান্নিধ্যে। শিল্পচর্চা কামরুল হাসানের কাছে কখনোই অ্যাকাডেমিক বিষয় হয়ে থাকেনি, কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পচর্চার বৃত্তে অবস্থিত হয়ে বাইরের দিকে হাত বাড়ানো শিল্পী তিনি ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাঙালির জীবনধারার মূল বৈশিষ্ট্যের সন্ধানী এবং সেই জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে লোকশিল্পের বিচিত্রতার মধ্যে শিল্পরূপ খুঁজে ফিরেছেন সদা-সর্বদা। ফলে কামরুল হাসান বহুভাবে নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং তার কর্মের কল্যাণস্পর্শে বাঙালি সমাজ অর্জন করেছে নানা সমৃদ্ধি। কর্মীপুরুষ তিনি বটে, সেইসঙ্গে সর্বক্ষণের চিত্রশিল্পী, দেশভাগের পূর্ববর্তী কলকাতা-জীবনে তিনি শিল্পের শিক্ষা নিচ্ছেন এবং জীবিকার জন্য নানা ধরনের ব্যবহারিক কাজে হাত লাগাচ্ছেন। সৃজনশীল শিল্পী হিসেবে তিনি সবে বিকশিত হচ্ছিলেন এবং সেই পর্বেই সংবাদপত্র সাময়িকীর নকশাকরণে কাজ করেছেন, কখনো কার্টুন কিংবা সচিত্রকরণ করেছেন, অর্থপ্রাপ্তির জন্য কবরের নামফলকের নকশাও করে দিয়েছেন। সৃজনশীলতার সঙ্গে উপযোগিতা মিলেই তার শিল্পযাত্রা। সেই সঙ্গে দেখি ব্রতচারী শিবিরে যোগ দিচ্ছেন তিনি, বাংলার লোকজীবন এবং লোকশিল্পের নানা পরিচয় পাচ্ছেন, কিশোরদের সংগঠন মণিমেলায় কাজ করছেন এবং ১৯৪৬-এর দাঙ্গার সময় উপদ্রুতদের ত্রাণে ঝাঁপ দিয়েছেন।

দেশভাগের পর তিনি স্বভূমি ত্যাগ করে ঢাকায় এসে স্থিত হওয়ার চেষ্টা করেন। লড়েছেন বটে জীবন-জীবিকার জন্য, সেইসঙ্গে চলেছে সমাজের বিকাশের জন্য কর্ম-সাধনা এবং ঢাকায় শিল্পশিক্ষালয় প্রতিষ্ঠা ও জায়মান শিল্পচর্চায় জয়নুল-আনোয়ারুল ও অন্যদের সঙ্গে সক্রিয় হওয়া। পরবর্তী ইতিহাস পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক কূপমন্ডকতা, জাতিগত অস্বীকৃতির বিপরীতে বাঙালিত্বের উদ্ভাসনের অযুত ঘটনা ও পদক্ষেপে পরিপূর্ণ, যেখানে কামরুল হাসানকে নানাভাবে আমরা খুঁজে পাই।

একেবারে গোড়া থেকে আমরা দেখি বলবান ও কর্মিষ্ঠ কামরুলকে, মুকুল ফৌজ নিয়ে তিনি নবীন কিশোরদের সংগঠিত করছেন, শিবির পরিচালনা করছেন, ফৌজ হয়েছিল অবলম্বন কেননা ব্রতচারী পাকিস্তানে ব্রাত্যই হয়ে উঠেছিল, কিন্তু রায়বেঁশে স্মৃতি কী করে মন থেকে মুছে ফেলেন তিনি। ভাষা-আন্দোলন থেকে শুরু করে জাতীয় অধিকারের প্রতিটি সংগ্রামে যুক্ত হয়েছেন কামরুল হাসান, ষাটের দশকে পূর্ববাংলার নবজাগরণে তিনি হয়ে উঠলেন অনন্য পুরুষসিংহ, তেল চকচকে লাঠি হাতে লাফ দিয়ে মাটিতে পড়ে ভূমি-সংলগ্ন রায়বেঁশের যে হুংকার, সেটা সমবেতভাবে শোনানো যখন সম্ভব ছিল না, তখন জসীম উদ্দীনের ‘নকশি-কাঁথার মাঠ’-এর নৃত্যরূপে মঞ্চে তিনি সেই হুংকার যোগ করলেন। অবশেষে ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনের সময় ব্রতচারীর পুনরুত্থান তিনি ঘটালেন, পূর্ববাংলায় গুরুসদয় দত্তের গানসমূহ সম্মেলকভাবে গাইতে শুরু করল ছায়ানট, সংস্কৃতি সংসদ ও আরও কোনো কোনো দল, নবীন-নবীনাদের শিখিয়ে দিলেন ব্রতচারী নৃত্য, বাঙালিত্বের মহিমা পুনরায় ফিরিয়ে আনতে কামরুলের উদ্যম পেল নতুন মাত্রা। একুশে ফেব্রুয়ারিতে অক্ষর-চিহ্ন ঝুলিয়ে দিলেন গাছে গাছে, এক একটি অক্ষর একটি বাঙালির জীবন। আর্ট কলেজ ছেড়ে কামরুল হাসান ততদিনে ডিজাইন সেন্টারের পরিচালক হিসেবে খুঁজে পেয়েছেন মনের মতো কাজ। লোকশিল্পের নবায়নে বাজার ও ব্যবহারিক উপযোগিতা প্রতিষ্ঠায় নানা উদ্ভাবন ও প্রয়োগে আরেক সৃজনধারার তিনি উদ্গাতা হলেন। পাশাপাশি কামরুল হাসানের শিল্পচর্চা ও সৃজনশীল প্রয়াস ছিল প্রবলভাবে সক্রিয়। সবসময়ে তিনি স্কেচ করছেন, ঘরে-বাইরে যখন যেখানে আছেন। ছবি আঁকছেন দ্রুত হাতে, বেশির ভাগ জলরং, বিলিয়ে দিচ্ছেন জলের দরে। সজাগ দৃষ্টি নিয়ে অবলোকন করছেন জীবন, রঙে রেখায় তার মূর্তায়ন করছেন, অজস্র কাজে ছড়িয়ে আছে যে-পরিচয়। এভাবে দেশ যখন পৌঁছল মুক্তিযুদ্ধে, সেখানে শিল্পীবাহিনী নিয়ে সবার আগে আমরা পাই পুরুষসিংহ কামরুলকে, যে-শক্তিরূপ তিনি আজীবন বহন করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও এই তেজস্বিতা কখনো ম্লান হয়নি, মৃত্যুর ক্ষণেও যে-পরিচয় তিনি রেখে গেছেন।

কামরুল হাসানের জন্মশতবর্ষ পালিত হওয়া দরকার ঢাকঢোল পিটিয়ে সাড়ম্বরে। তিনি যেমন ছিলেন বহুধা-বিস্তৃত, কর্মে ও শিল্প-সাধনায়, তেমনি বহুভাবে উদ্যাপিত হওয়া দরকার তার জন্মতিথির শতাব্দীপূরণ, বিভিন্ন কর্মোদ্যোগে এবং শিল্পের বহুমাত্রিক উপস্থাপন, উপলব্ধি ও বিশ্লেষণে। এই উদযাপন কামরুল হাসানের প্রাপ্য, তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন আমাদের নিজেদের জন্য, জাতির এবং আজকের প্রজন্মের সদস্য-সদস্যাদের জন্য, বাঙালির সুন্দর আগামীর জন্য। চারপাশে মূঢ়তার আস্ফালন দেখে পীড়িত অথচ তেজোদ্দীপ্ত কামরুল হাসান বলেছিলেন বান্ধব নিসর্গবিদ নওয়াজেশ আহমদকে, ‘এবারের পয়লা বৈশাখে দেখো রায়বেঁশে হয়ে পাকা বাঁশের লাঠি নিয়ে বেরিয়ে পড়ব রাস্তায়।’ আমরা সেভাবেই দেখি রায়বেঁশে যোদ্ধা কামরুলকে, মাটির কাছে মুখ নিয়ে তিনি ডাকছেন লাঠিয়ালদের লড়াইয়ে, ‘আয়... আয়... আয়।’ এভাবেই তো উদযাপিত হওয়ার কথা পটুয়া কামরুল হাসানের জন্মশতবর্ষ-উৎসব।

লেখক : লেখক, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও প্রকাশক। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত