মাত্র তিন দিন আগেই চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে আরও একটি বন্যহাতির মরদেহ পাওয়া গেছে। আনুমানিক ২২ বছর বয়সী হাতিটি বৈদ্যুতিক শক দিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পরে সেটি আড়াল করতে দেওয়া হয় মাটিচাপা। তবে পাহাড়ে কাজ করতে গিয়ে সেটি চোখে পড়ে স্থানীয়দের। তারা খবর দেন বন বিভাগে। বন কর্মকর্তারা ছুটে আসেন। ময়নাতদন্তের জন্য সংগ্রহ করা হয় হাতির মরদেহের নমুনা। এই ঘটনায় মামলা হবে বলেও জানান তারা। কিন্তু বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একের পর এক হাতি হত্যার পরও কোনো বিচার না হওয়ায় দিন দিন প্রাণীটির প্রতি মানুষের সহিংসতা বাড়ছে। এ ছাড়া হাতির বিচরণক্ষেত্র মানুষের দখলে চলে যাওয়ায় খাদ্যের খোঁজে লোকালয়ে ঢুকে হাতিও সহিংস আচরণ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে এসব সহিংস ঘটনা বেড়েছে কয়েকগুণ। গত নভেম্বর মাসের দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৮টি হাতি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই এশীয় প্রজাতির হাতিকে বন্যপ্রাণীবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইউসিএন ‘মহা-বিপন্নের তালিকায়’ অন্তর্ভুক্ত করেছে। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক দশকের মধ্যেই বাংলাদেশে বুনো পরিবেশে আর হাতি থাকবে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রাণীটিকে রক্ষায় প্রশাসনের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। নেই যথাযথ কোনো উদ্যোগও। তাদের পরামর্শ, হাতি হত্যায় ঝুলে থাকা মামলাগুলো নিষ্পত্তি করা, হাতির বিচরণক্ষেত্র ও চলাচালের পথ সংরক্ষণ করা, বনের ভেতরে হাতির খাবার উপযোগী গাছ লাগানোসহ মানুষের সচেতনতা বাড়াতে হবে।
বন বিভাগের হিসাবে ১৯৯২ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট ১৪১টি বন্যহাতির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ ৬ বছরেই মারা গেছে অর্ধেকের বেশি। ২০১৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে হত্যা করা হয়েছে ৭৬টি বন্যহাতি। তবে বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা আরও বেশি। বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করে এমন কয়েকটি সংগঠনের তথ্য বলছে, গত দুই বছরেই ৪০টি বন্যহাতি হত্যার তথ্য পেয়েছে তারা। এর মধ্যে ২০২০ সালে ২২টি ও ২০২১ সালের সাড়ে ১০ মাসে ১৮টি। আর সদ্য শেষ হওয়া নভেম্বর মাসেই হত্যা করা হয়েছে আটটি হাতি। বন বিভাগের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও দায়ের করা মামলাসূত্রে জানা গেছে, বেশিরভাগ হাতিই গুলি করে, বিষ প্রয়োগ করে কিংবা বিদ্যুৎস্পৃষ্টে হত্যা করা হয়।
বন বিভাগের হিসাব বলছে, ১৯৯২ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সারা দেশে দেড়শ’র মতো হাতি হত্যার ঘটনা ঘটলেও মামলা হয়েছে মাত্র ৩৭টি। কিন্তু এখন পর্যন্ত একটি মামলারও রায় হয়নি। বন কর্মকর্তারা এর দায় অবশ্য চাপাতে চান আদালতের ওপর। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মামলা চালানোর ক্ষেত্রেই বন বিভাগের উদাসীনতা আছে।
মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বন সংরক্ষক মোল্লা রেজাউল করিম বলেন, ‘মামলাগুলো আমাদের পক্ষ থেকে করা হয় ঠিকই। কিন্তু এর তদন্তে পুলিশও থাকে। যথাসময়ে প্রতিবেদন জমা না পড়ায় আদালতে ঝুলে থাকে মামলাগুলো।’
হাতি হত্যা কেন ঠেকানো যাচ্ছে না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা কি করে ঠেকাব। আমাদের একার পক্ষে তো হাতি হত্যা ঠেকানো সম্ভব নয়। সারা দেশে আমাদের লোকবল সংকট রয়েছে। যেখানে হাতি হত্যা হয় সেখানে তো গহিন বন। একজন বা দুজন বন বিভাগের লোক গিয়ে তো হাতি হত্যা ঠেকানো যাবে না। কারণ বনের ভেতর অবৈধ দখলদাররা কীভাবে বিদ্যুৎসংযোগ নেয়, ফসলের চাষ করে আর অস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করে, তা দেখার দায়িত্ব একা আমাদের নয়। সরকারের অন্য সংস্থাগুলোর সহযোগিতা ছাড়া হাতি বাঁচানো যাবে না।’
বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিচালক এ এস এম জহির উদ্দিন বলেন, ফসলের ক্ষতি হচ্ছে দোহাই দিয়ে একের পক এক হাতি হত্যা করা হচ্ছে। বৈদ্যুতিক তার, গুলি করে হাতি হত্যার ঘটনা ঘটছে। কিন্তু এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কিনা সেটা আমরা খতিয়ে দেখছি। এ ছাড়া হাতি হত্যার মাধ্যমে বন অধিদপ্তরকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে কিনা সেটাও দেখার চেষ্টা করছি। কিন্তু যতক্ষণে হাতি হত্যার ঘটনা ঘটছে ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায় আমাদের পৌঁছাতে। কারণ আমাদের লোকবলের ঘাটতি রয়েছে।
এভাবে একের পর এক হাতি হত্যা হলে দ্রুতই বাংলাদেশ হাতিশূন্য হয়ে যাবে বলে মনে করেন আইইউসিএন আবাসিক প্রতিনিধি রকিবুল আমিন। তিনি বলেন, এমনিতেই হাতি চলাচলের পথ বন্ধ হচ্ছে। তাদের আবাস দখল করা হচ্ছে। এতে করে হাতি মানুষের দ্বন্দ¦ বাড়ছে। বনের বাইরে যে দ্বন্দ্ব, তা নিরসনে রাষ্ট্রকে উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য বন বিভাগ একা পারবে না, আমাদের দরকার বহুমাত্রিক ব্যবস্থাপনা। সবাইকে এক করতে না পারলে হাতি থাকবে না।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি বা বেলার নির্বাহী প্রধান সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ৩৭টি মামলা আমি কেন করব একই বিষয়ে। যেখানে ৩৬টি মামলার রায় হয়নি। হাতিগুলো কেন মারা পড়ছে? কারণ বন বিভাগ হাতির খাবারের ব্যবস্থা রাখেনি। ফলে তারা লোকালয়ে আসছে এবং মারা পড়ছে। তিনি বলেন, বন বিভাগ বনের মধ্যে ইউক্যালিপটাস গাছ আর আকাশমনি গাছ লাগিয়ে রাখে। এগুলো তো হাতির খাদ্য নয়। যেগুলোতে হাতির খাদ্যের জোগান হবে সেগুলো লাগাতে হবে। এই আইনজীবী বলেন, বন বিভাগের কাজ হচ্ছে হাতির করিডোর নিশ্চিত করা। গ্রামবাসীদের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলা। অথচ এসব কাজ না করে একটা করে হাতি মরে আর তারা মামলা দেয়। এটা তো তার কাজ না। এখন পর্যন্ত একজনকেও যদি শাস্তি দিতে পারত তাহলে অন্যরা এই অপরাধ পুনরায় করত না।
তিনি বলেন, বন বিভাগ সাধারণ মানুষের ক্ষতি কমাতে এখন পর্যন্ত কী করেছে। বন বিভাগ আসলে সিরিয়াস না। তার মামলা করতে হয় সেটা সে করছে। এবং মামলাগুলো তারা তদারকিও করেনি। তদারকি করলে ৩৭ মামলা রায় হবে না তাতো হয় না। একটা হাতির মৃত্যুরও সুষ্ঠু ময়না তদন্ত করেনি। এসব ময়নাতদন্ত জনসম্মুখে প্রকাশ করেনি। বিচার প্রক্রিয়ার গতি আনতে হলে বন বিভাগকে সৎ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল দেশ রূপান্তরকে বলেন, বন ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে হাতি লোকালয়ে চলে আসছে। এর প্রথম দায় হচ্ছে বন বিভাগের। কারণ হাতি হত্যার পর যদি যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তবে এ সময় এসে এতগুলো হাতি হত্যার ঘটানা ঘটত না। এ ছাড়া হাতির আবাসস্থল সংরক্ষণ না করাও হাতি হত্যার অন্যতম কারণ। এ জন্য আমরা আগে থেকেই বলছি যতগুলো হাতির করিডোর আছে সবগুলো চিহ্নিত করতে হবে। পরিবেশবিষয়ক সাংবাদিক ও হাতি রক্ষা আন্দোলনের কর্মী হোসেন সোহেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাতি রক্ষায় বিভিন্ন প্রজেক্ট রয়েছে যেগুলো বন বিভাগ সরাসরি দেখভাল না করে বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে করান। কিন্তু সেখানে তারা কী ধরনের কাজ করছে তার কোনো জবাবদিহিতা নেই। এ ছাড়া হাতি হত্যার পর এগুলো লুকানোর চেষ্টা করা হয়। যার পেছনে বন বিভাগের ইন্ধন রয়েছে। বন বিভাগের জবাবদিহিতা না থাকার কারণে একের পর এক হাতি হত্যার ঘটনা ঘটছে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল হাসান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাতির মতো বন্যপ্রাণী থাকার কারণে বন পুরোপুরি মানুষের কবজায় আসতে পারে না বা দখলমুক্ত থাকে। সে হিসেবে হাতি বনের রক্ষক হিসেবে কাজ করে। আর হাতি প্রচুর পরিমাণে মল ত্যাগ করে। হাতির মল বনে জৈব সার হিসেবে কাজ করে। তাই পরিবেশের জন্য হাতির গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু মানুষ বনের জায়গা দখল করে চাষবাস করছে। সেখানে হাতিরা গেলে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। যে কারণে এলাকাবাসীর সঙ্গে হাতির সংঘাত হচ্ছে। এর ফলে হাতি হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে।’
হাতি হত্যা বন্ধ না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হাতি হত্যার সময় মানুষ এর শাস্তি হবে কিনা তা নিয়ে চিন্তা করে না। তারা মনে করে এ অপরাধ থেকে পার পেয়ে যাবে। হাতি হত্যার ঘটনায় মামলা হওয়ার পর শাস্তি নিশ্চিতের কথাও শোনা যায় না। এটা একটি কারণ।’
হাতি হত্যা বন্ধ কীভাবে করা যায়এ সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রথমত, বিদ্যুতের ফাঁদ নির্মূল করতে হবে। আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে হাতির আবাসস্থল দখলমুক্ত করতে হবে। কারণ যেসব জায়গায় হাতিরা বিচরণ করে সেখানে মানুষ এখন চাষাবাদ করছে। এসব জায়গা বন বিভাগের। তাই এসব জায়গা দখলমুক্ত করতে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।’
হাতির মৃত্যুতে তদন্তের নির্দেশ সংসদীয় কমিটির : বিদ্যুতায়িত হয়ে হাতি মারা যাওয়ার বিষয়টি তদন্ত করে রিপোর্ট দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সংসদীয় কমিটি। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। বৈঠকে বিদ্যুতায়িত হয়ে হাতি মারা যাওয়ার বিষয়টি তদন্ত করে পরবর্তী বৈঠকে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পল্লী বিদ্যুতের ক্ষেত্রে সচেতনতামূলক প্রচারণা চলমান রাখার সুপারিশ করা হয়।
