আনোয়ার ইব্রাহিমের রাজনৈতিক জীবন উত্থান-পতনে ভরা। ক্ষমতার খুব কাছে থেকে তাকে বারবার ফিরে আসতে হয়েছে নিরাশ হয়ে। ক্ষমতার জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন তিনি। এতকিছুর পরও কি ক্ষমতার বাইরেই থেকে যাবেন আনোয়ার ইব্রাহিম? লিখেছেন মুফতি এনায়েতুল্লাহ
ভাগ্যবিড়ম্বনা
মালয়েশিয়ার রাজনীতির ইতিহাসে বহুল আলোচিত এক নাম আনোয়ার ইব্রাহিম। বারবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার হাতছানি পেলেও শেষ পর্যন্ত তা অধরা থেকেছে ৭৩ বছর বয়সী ভাগ্যবিড়ম্বিত এই নেতার। সম্প্রতি ফরেন পলিসি পত্রিকার এক নিবন্ধে বিশ্লেষকরা অবশ্য আনোয়ারকে আশার বাণী শুনিয়েছেন। তরুণ ছাত্র ছাত্রনেতা থেকে সংস্থারপন্থি অর্থনীতিবিদ, মন্ত্রী থেকে উপ-প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হওয়া, বারবার কারাবরণ এবং মালয়েশিয়ার কয়েক দশকের শাসনকারী দলকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের প্রতিটি পর্যায়ে আনোয়ার ইব্রাহিম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন। কিন্তু নানা ষড়যন্ত্র তার স্বপ্নপূরণে অলঙ্ঘনীয় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আনোয়ার বলেছেন কেন তাকে ক্ষমতার বাইরে রাখা হচ্ছে। তার ভাষায়, ‘আপনি যদি অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর হন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হন, ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর হন, সম্পদের পাহাড় গড়া কিছু পরিবারের বিরুদ্ধে কঠোর হন তাহলে শাসকগোষ্ঠীর কাছে তো আপনি জনপ্রিয় হতে পারবেন না। এ সম্পর্কে আমি পূর্ণ ওয়াকিবহাল।’
আনোয়ার ইব্রাহিম রাজনৈতিক জীবনে নানা উত্থান-পতনের সম্মুখীন হয়েছেন। তবে তিনি ভেঙে পড়েননি, হারিয়ে যাননি। ফিরে এসেছেন রাজনীতির মাঠে নতুনভাবে, নতুন উদ্যমে। মালয়েশিয়ার রাজনীতির জটিল কিছু অলিখিত সূত্র রয়েছে, এসব সূত্র-সমীকরণ ডিঙিয়ে আনোয়ার বরাবরই রাজনীতির মাঠে ছিলেন, কিন্তু সেভাবে ক্ষমতার ভাগীদার হতে পারেননি। বারবার ক্ষমতার খুব কাছে থেকে তাকে ফিরে আসতে হয়েছে। এবার গুঞ্জন উঠেছে রাজনীতির মাঠের নেতৃত্বও তাকে ছাড়তে হতে পারে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে তার নেতৃত্বের ধার নিয়ে। বিরোধী জোট নেতা হিসেবে নতুন মুখের সন্ধান করছে। গুঞ্জনের পালে হাওয়া দিয়েছে, গত নভেম্বরের গুরুত্বপূর্ণ মালাক্কা রাজ্যের নির্বাচনের পরাজয়। ওই নির্বাচনে ইউনাইটেড মালয় ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের (ইউএমএনও) নেতৃত্বে বারিসান ন্যাশনাল (বিএন) জোট ২৮ আসনের মধ্যে ২১টি জিতেছে। অন্যদিকে আনোয়ার ইব্রাহিমের নেতৃত্বাধীন পাকাতান হারাপান (পিএইচ) জোট ৭টি আসন পেলেও তার পিপলস জাস্টিস পার্টি (পিকেআর) কোনো আসন পায়নি।
মালাক্কার নির্বাচনকে মালয়েশিয়ার ভগ্ন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ দলগুলো আগামী বছরের মধ্যে জাতীয় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছে। মালয়েশিয়ার আগামী জাতীয় নির্বাচন ২০২৩ সালের জুলাই বা তার আগে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
বিদ্বেষের শিকার আনোয়ার
তুখোড় ছাত্রনেতা থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সাফল্যের সঙ্গে সামলে ২৮ বছর আগে ১৯৯৩ সালে উপ-প্রধানমন্ত্রী হন আনোয়ার ইব্রাহিম। মনে করা হচ্ছিল প্রধানমন্ত্রী মাহাথিরের উত্তরসূরি হতে যাচ্ছেন তিনি। ১৯৯৭ সালে এশিয়ায় অর্থনৈতিক সংকট শুরু হলে মাহাথিরের সঙ্গে আনোয়ারের দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। তিনি সরকারের অব্যবস্থাপনা, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির সমালোচনা করতে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের সঙ্গে বিরোধের সূত্র ধরে তিনি বরখাস্ত হন। এরপর শুরু হয় তার দুর্ভাগ্যের কাল। তার বিরুদ্ধে সডোমিসহ নানা অভিযোগ আনেন মাহাথির। জেলে কাটাতে হয় তাকে বছরের পর বছর। মাহাথির দুই দশকের বেশি সময় দেশ শাসন করে অবসর নিলে নতুন একাধিক প্রধানমন্ত্রীও (যারা একসময় আমনো দলে তার সহযোগী ছিলেন) আনোয়ারের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রাখে। এই দলের সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক ও তার স্ত্রী ব্যাপক দুর্নীতি করলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির দেশের অর্থনীতি রক্ষায় আবার নতুন দল করে রাজনীতিতে ফেরেন। তিনি সঙ্গে নেন সাবেক সহযোদ্ধা আনোয়ারকে। মাহাথির অতীতের ভুলের জন্য ক্ষমা চান, অতীতের গ্লানি ভুলে আনোয়ারও সম্মত হন মাহাথিরের প্রস্তাবে।
২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে মাহাথির ও আনোয়ারের রাজনৈতিক জোট দেশটির সাত দশকের ক্ষমতাসীন দলকে পরাজিত করে জয় পায়। তাদের পাকাতান হারাপান জোট বিজয়ী হয় ২২২ আসনের পার্লামেন্টে ১১৩টিতে। মাহাথিরের নতুন দল ছিল ছোট, তারা আসন কম পায়, মাত্র ১৩টি। আনোয়ারের দল পায় বেশি আসন, ৪৭টি। তবু তিনি মাহাথিরকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ দেন। শর্ত থাকে, দুই বছর পর আনোয়ার প্রধানমন্ত্রী হবেন।
২০২০ সালে মাহাথির পূর্ব সমঝোতা অনুসারে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে গড়িমসি করতে থাকেন। এ সময় মাহাথিরের দলের নেতারা দাবি করেন, মাহাথিরকে পুরো মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে দিতে হবে। এ নিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতাসীন জোটে ভাঙন দেখা যায়। এর জেরে মাহাথির পদত্যাগ করেন। এরপর রাজা মাহাথিরের আপত্তি উপেক্ষা করে মুহিউদ্দীন ইয়াসিনকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ দেন। সংসদে তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল কি না তা নিয়ে ঘোর সংশয় ছিল। এ কারণে সংসদে ভোটাভুটির আয়োজন করার সাহস দেখাতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী মুহিউদ্দীন। শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেন তিনি। প্রশ্ন হলো, রাজা কি মুহিউদ্দীনকে সরকার গঠনের আহ্বান করে ভুল করেছিলেন। তার কি আনোয়ারের প্রতি কোনো বিদ্বেষ ছিল? আনোয়ারকে প্রধানমন্ত্রী করলে তিনি কি সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে পারতেন?
এসব প্রশ্নের মধ্যেই এখন জানা যাচ্ছে, মাহাথির স্থিরচিত্ত ছিলেন যাতে আনোয়ার ইব্রাহিম দেশের প্রধানমন্ত্রী না হন। সম্প্রতি মালয়েশিয়া সুপ্রিম কাউন্সিলের মেম্বার ওয়ান সাইফুল ওয়ান এ কথা প্রকাশ করেছেন। ‘ট্রেন্ডস ইন সাউথ ইস্ট এশিয়া’ সিরিজ প্রকাশনা উৎসবে বক্তৃতাকালে তিনি এমন ‘বোমা ফাটানো তথ্য’ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হস্তান্তরে মাহাথির কখনো আন্তরিক ছিলেন না। বিভিন্ন ক্লোজ ডোর সভায় মাহাথির এ মত প্রকাশ করেন।
সুলতান আবদুল্লাহর সূক্ষ্ম চাল
মালয়েশিয়ার সংবিধান অনুসারে, কোনো নেতা পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখাতে পারলে তিনি সরকার গঠন করতে পারেন। তার আগে তাকে রাজার সম্মতি নিতে হয়। রাজা তাকে অনুমতি দিলে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন। মাহাথিরের পদত্যাগের পর দেশটির রাজা সুলতান আবদুল্লাহ কার্যত একটি গেম খেলেন। মাহাথির ভেবেছিলেন, তাকেই আবার সরকার গঠনের জন্য ডাকা হবে। যে কারণেই হোক ২০১৯ সালে দায়িত্বপ্রাপ্ত নতুন রাজার সঙ্গে মাহাথিরের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। মালয়েশিয়ার রাজার আনুষ্ঠানিক পদবি হলো ইয়াং দি-পারতুয়ান আগং। রাজার পদটি আলংকারিক, তিনি নিয়মিত সরকার পরিচালনার কোনো কাজে অংশ নেন না। আর মনঃক্ষুন্ন আনোয়ারও মাহাথিরকে আবার দায়িত্ব দেওয়ার পথে দেন বাগড়া। কারণ আনোয়ারের দল পিকেআর ও ক্ষমতাসীন জোট পাকাতান হারাপানে বিরোধ দেখা দেয়। মাঝখান থেকে মাহাথিরের দল বেরাসাতু নেতা মুহিউদ্দীন ইয়াসিনকে রাজা প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিয়ে দেন। এটাই ছিল রাজার গেম। আনোয়ার সরকার গঠনে সক্ষম বলে দাবি জানালেও রাজা তাতে কান দেননি। মুহিউদ্দীনের সরকার ছিল থিন মার্জিনের সরকার, যেকোনো সময় পড়ে যাবে এমন অবস্থা। তিনি নানা টালবাহানা করে সময়ক্ষেপণ করেন, আনোয়ারের দাবি মতো আস্থা ভোটের দিকে যাননি। এক বছরের কিছু বেশি সময়ের মাথায় সেটাই হলো মুহিউদ্দীনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে।
মালয়েশিয়ার রাজনীতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজা কোনো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিষ্পত্তি করে না। তিনি সংবিধান ও সংসদের ওপর ছেড়ে দেন। কিন্তু ঘটনা পরম্পরায় দেখা যায়, রাজা যেন পক্ষাবলম্বন করছেন। আনোয়ার ইব্রাহিম সরকার গঠনের দাবিদার ছিলেন, জনগণের রায়ও তাই ছিল, রাজা তাকে আমন্ত্রণ না জানিয়ে কেন একটি ভগ্নাংশকে সরকার গঠনে আমন্ত্রণ জানালেন এটা মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। তার এই সিদ্ধান্ত যে ভুল ছিল ইয়াসিনের সরকারের পতনই তার বড় প্রমাণ। এরপর সবাই সবকিছু গুছিয়ে-গাছিয়ে নেওয়ায় আনোয়ারও বিপদে পড়েন। তার পিকেআর ছেড়ে যান বেশ কিছু এমপি। ফলে ইয়াসিনের পতনের পরও তাকে ডাকেননি রাজা। নির্বাচনে পরাজিত আমনো দলের নেতা ইসমাইল সাবরিকে তিনি ক্ষমতা দেন। রাজাক নেই কিন্তু তার দল আমনো পাকাতান নেতাদের ভুলে ফিরল ক্ষমতায়। এখন সাবরির পেছনে আছে ১১৪ এমপির সমর্থন, মাত্র ৪ আসনের মেজরিটি। কারণ পার্লামেন্টে এখন আছেন ২২০ জন সদস্য, দুটি আসন উপনির্বাচন না হওয়ার কারণে খালি। আর দল ও জোট থেকে এমপিরা চলে যাওয়ায় আনোয়ারের আছে ৮৮ জন এমপির সমর্থন।
অভিনব রাজনৈতিক চুক্তি
মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন জিনিসের উদয় হয়েছে সরকার-বিরোধী দল চুক্তি। প্রধানমন্ত্রী ইসমাইল সাবরি ইয়াকুব ১৩ সেপ্টেম্বর দেশের বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে এক চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। দেশটিতে চলমান দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সৃষ্টি, করোনা মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াই এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে সবাই একমত হয়েছেন এবং আগামী বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত সংসদ ভেঙে দেওয়া হবে না মর্মে আশ্বস্ত করেছেন।
অনেকে এটাকে ‘চুক্তি করে গণতন্ত্র জিইয়ে রাখা’ বলে অভিহিত করেছেন। কেউ আবার বলছেন, এটা স্থিতিশীল সরকারের জন্য দরকার ছিল। তাতে উভয় পক্ষেরই লাভ হয়েছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, আগামী বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে পারবেন সাবরি। প্রধানমন্ত্রী পদে ১০ বছরের বেশি কেউ থাকতে পারবে না এবং আরও কিছু শর্তারোপ করে এ সমঝোতা হয়েছে। হঠাৎ রাস্তার আন্দোলন ছেড়ে এই সমঝোতা কেন করতে গেলেন আনোয়ার ইব্রাহিম? তাহলে কি ফরেন পলিসির রিপোর্টে তার প্রত্যয় জন্মেছে? নাকি কোনো দিনই শীর্ষপদে বসতে পারবেন না এটা কি তিনি বুঝতে পেরেছেন? এই সমঝোতায় অবশ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির নেই। কারণ বিরোধীদলীয় নেতা আনোয়ার তা চাননি। না চাওয়ার কারণ বারবার তার আশাভঙ্গের কারণ হয়েছেন মাহাথির। আবার সাবরি কেন বিরোধী দলের সঙ্গে চুক্তি করলেন এটাও একটা প্রশ্ন। তিনি কি সরকার নিয়ে উদ্বিগ্ন? এর উত্তরও আপাতত অজানা।
মাহাথির মোহাম্মদ
মাহাথির মোহাম্মদ যদি মালয়েশিয়ার রাজনীতির সবচেয়ে চতুর খেলোয়াড় হন, তবে ভাগ্যবিড়ম্বিত নায়ক হচ্ছেন আনোয়ার ইব্রাহিম। আনোয়ারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মাহাথির পুষ্পবৃষ্টির মধ্য দিয়ে শপথ নিয়েছেন। সাধারণ মানুষ তার ভুল স্বীকার করা, ঔদার্য ও মহত্তম উদাহরণ তৈরির জন্যই তাকে এভাবে স্বাগত জানিয়েছে। গণতন্ত্রকে যে ‘আর্ট অব কম্প্রোমাইজ’ বলা হয়, মালয়েশিয়া তা বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর না করা ড. মাহাথিরের সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা। মাহাথিরের ডিগবাজির রাজনীতির মাধ্যমে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার কৌশল গ্রহণের কারণে মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে গেছে। মাহাথির এবং আনোয়ার দুজন প্রথমে বন্ধু, তারপর শত্রু ও পরে জোটের মিত্র হয়েছেন। তাদের এমন পরিবর্তনশীল সম্পর্ক তিন দশক ধরে মালয়েশিয়ার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে সামনের পথ কোনদিকে যাবে, সেটা বলার সময় এখনো আসেনি।
প্রবাদে আছে, ‘যুদ্ধ ও ভালোবাসায় সবই সিদ্ধ।’ তেমনি রাজনীতিতে কৌশলের খেলায় সবই সিদ্ধ। মাহাথির যে কৌশলে আনোয়ারকে বঞ্চিত করলেন, তা অনৈতিক হতে পারে বটে, কিন্তু মেনে নেওয়া ছাড়া আনোয়ারের সামনে আর কোনো পথ নেই। দৃশ্যত মাহাথির সংবিধান অনুসারেই কাজ করেছেন। তিনি এমন কিছু করেননি, যাতে তাকে জেল-জরিমানা করা যাবে। কিন্তু মাহাথির নিজের ভাবমূর্তি ও অবস্থান হারিয়েছেন, এটা সত্য। ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল অবধি মালয়েশিয়ার শাসন করেছেন মাহাথির। দেশটির অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে ব্যাপক অবদান রয়েছে তার। পাশাপাশি ক্ষমতায় থাকাকালে বিরোধী মতের ওপর দমন-পীড়ন চালানোর অভিযোগও আছে বিস্তর। জীবনের শেষপ্রান্তে অঙ্গীকার রক্ষা না করার দায়ও নিতে হলো তাকে। আপাতত আনোয়ার রাজনীতির মাঠে থাকলেও মাহাথির নেই। কেউ কেউ এমন পরিস্থিতি মাহাথিরের অবস্থাকে ‘বিশ্বাসঘাতকদের পরিণতি’ বলতে পিছপা হচ্ছেন না।
পথের কাঁটা
আনোয়ার ইব্রাহিম কখনোই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বাসনা ছাড়েননি। আনোয়ার পারিবারিকভাবে রাজনৈতিক রক্ত বহন করছেন। তারা বাবা ছিলেন একজন এমপি। মাও সক্রিয় রাজনীতি করতেন। আনোয়ারের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় কুয়ালালামপুরের মালয় বিশ্ববিদ্যায়ে অধ্যয়নকালে। তখন তরুণ ছাত্রনেতা আনোয়ার ‘মুসলিম ইয়ুথ মুভমেন্ট অব মালয়েশিয়া’ গঠন করেছিলেন। ১৯৭৪ সালে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় দুই বছর জেল খাটেন তিনি। ১৯৮২ সাল পর্যন্ত এই সংগঠনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন আনোয়ার। সে সময় তিনি সুদক্ষ বাগ্মিতায় গ্রামীণ জীবনের সমস্যার কথা তুলে ধরে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। একপর্যায়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহাথিরের নজরে পড়েন তিনি। এরপরই তার উত্থান ঘটে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সাফল্যের সঙ্গে সামলে ১৯৯৩ সালে উপ-প্রধানমন্ত্রী হন। দীর্ঘ এ যাত্রাপথে তিনি তার ইসলামকেন্দ্রিক রাজনীতিকে ত্যাগ করেননি।
মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে মালয়, চাইনিজ ও ইন্ডিয়ানদের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম বিভাজন বিদ্যমান। যদিও এটাকে সে অর্থে আন্তঃগোষ্ঠী বিরোধ বলার সুযোগ নেই। মালয়রা মোট জনসংখ্যার ৬৮ শতাংশ। রাজনীতিতে সাফল্য পেতে, মালে সম্প্রদায়কে সন্তুষ্ট রাখা যেমন জরুরি, তেমনি ধনী চাইনিজ মালয়দের সমর্থন পেতে হয়। যেভাবে ইউএমএনও মালে জাতিগোষ্ঠীর অভিভাবক এবং চাইনিজদের আস্থাভাজন হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই জায়গায় আনোয়ার এখনো আস্থা অর্জন করতে পারেননি। এটাই আনোয়ারের ক্ষমতার পথের অন্তরায়, যা রাজার পক্ষপাতমূলক আচরণের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে।
বলা হয়, ‘দুঃসহ স্মৃতি ও বঞ্চনার কারণে সৃষ্ট মনের ক্ষোভ দ্রুত মেলায় না।’ তার পরও মালয়েশিয়ায় চলমান রাজনৈতিক মঞ্চে আনোয়ার ইব্রাহিম একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। ১৯৪৭ সালে মালয়েশিয়া উত্তরাঞ্চলীয় পেনাং রাজ্যের চিরোক তক্কুন গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে নেওয়া আনোয়ার লড়াই করছেন এবং এখনো টিকে আছেন রাজনীতির মাঠে। রাজনৈতিক পালাবদলে নিজেকে পরিণত করেছেন, তার অর্জিত অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করছে তার দল ও জোটের ভবিষ্যৎ। বরাবরের মতো আশাভঙ্গ হলেও ২০২৩ সালের নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা ছাড়া আপাতত আর কোনো পথ খোলা নেই তার সামনে।
