বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোনো ঘটনায় সংকট তৈরি হলেই কর্তৃপক্ষের সহজ সমাধান, হল খালি করে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা! এই পুরনো ওষুধ আর কতদিন চলবে? করোনা মহামারীতে দেশের প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ১৯ মাস বন্ধ থাকার পর মাত্র কদিন আগেই খুলে দেওয়া হলো। বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার পর মাত্র দুই সপ্তাহ ক্লাস হয়েছে এই কুয়েটে। তারপর সেখানে দুই ছাত্রের আত্মহত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক সপ্তাহ ক্লাস বন্ধ থাকে। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৮ বছর বয়সী মেধাবী শিক্ষক ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সেলিম হোসেনের করুণ, মর্মান্তিক ও রহস্যজনক মৃত্যু হলো। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত ০৩ ডিসেম্বর বিকেল চারটার মধ্যে শিক্ষার্থীদের হলত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের চার হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে ৮০০ নারী শিক্ষার্থী। হঠাৎ করে হল বন্ধ হলে এবং বিকেল চারটার মধ্যে হলত্যাগের নির্দেশ দিলে মেয়েরা কোথায় যাবে এ বিষয়টি আজও পর্যন্ত বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় এলো না কেন? কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই আকস্মিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়ার এই সংস্কৃতি শুরু হয়েছে সেই এরশাদ আমল থেকে।
কুয়েটের ঘটনায় ভাবছিলাম নারী শিক্ষার্থীরা, যাদের বাড়ি অনেক দূরে এবং ঢাকা কিংবা নিকটবর্তী কোনো শহরে যাদের সেরকম আত্মীয়-স্বজন নেই তাদের এই পরিস্থিতিতে কী অবস্থা হয়? তবে, জাহাঙ্গীরনগরে যারা পড়েন তাদের হয়তো কোনো না কোনোভাবে ঢাকায় থাকার একটা ব্যবস্থা হয়। কিন্তু খুলনা, পটুয়াখালী, দিনাজপুর কিংবা সিলেটের মতো জায়গার উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হঠাৎ বন্ধ হওয়া আর হঠাৎ হল ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা নারীশিক্ষার্থীদের মহাবিপদে ফেলে দেয়। কাজেই কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল এই বিষয়টি সুবিবেচনায় নেওয়া। রাজনীতির ছত্রছায়ায় কী সব কান্ড ঘটাতে পারে এবং কী ঘটছে তা যারা রাষ্ট্রপরিচালনা করেন তাদের সবই জানা। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীরা তো ধরাকে সরা জ্ঞান করে না। ক’দিন আগে আমরা দেখলাম সিলেট মেডিকেল কলেজের এক শিক্ষার্থীকে নিজ সংগঠনের হয়েও কীভাবে সহপাঠীদের কাছে মূল্য দিতে হয়েছে! (মাথার খুলি সরিয়ে ফেলেছে)! তারপরও আমরা এগুলোকে প্রশ্রয় দিই। কুয়েটের অধ্যাপক সেলিম হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেছেন। কারণ হিসেবে সামনে আসছে যে, ক্ষমতাসীন শক্তিশালী ছাত্র সংগঠনের কিছু ছাত্র তার সঙ্গে চরম খারাপ আচরণ করেছে, যা এই শিক্ষক সহ্য করতে পারেননি। জানা যায় যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের লালন শাহ হলে ডাইনিং ম্যানেজার নির্বাচন নিয়ে কয়েকদিন ধরে ছাত্রনেতারা প্রভোস্ট ড. সেলিম হোসেনকে চাপ সৃষ্টি করছিলেন। ২৯ নভেম্বর দুপুরে ছাত্রনেতারা ওই শিক্ষকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং হুমকি দেন। তার পরপরই তার মৃত্যুর বেদনাদায়ক ঘটনাটি ঘটে।
ছাত্ররা এটি করেছে কারণ তারা জানে তারা এটি অনায়াসেই করতে পারে! কেউ তাদের কিছু বলতে পারবে না! তাদের বিরুদ্ধে শিক্ষক কিংবা কর্তৃপক্ষের কিছু করার সাহস নেই। তারা কিছু করলেও তাদের কিছু হবে না। উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এগুলো কি চলতেই থাকবে? কুয়েটে চার হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে ৮০০ শিক্ষার্থী নারী, ভাবতেই কত ভালো লাগে। আমার দেশে এত নারী প্রাযুক্তিক বিষয়ে উচ্চশিক্ষিত হচ্ছে। এত এত তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থী। তারা দেশকে পাল্টে দিতে পারে। কিন্তু যখন এসব ঘটনা দেখি তখন আশা জাগার জায়গাগুলো মেঘের অন্ধকারে ঢেকে যায়। সামান্য স্বার্থে এরা কীভাবে নিজেদের জীবন ও পুরো শিক্ষাকে কলুষিত করছে। যে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারে, তারা বিশ^বিদ্যালয় থেকে পাস করে বের হয়ে জাতিকে কী দেবে? মাথার ঘাম পায়ে ফেলে জনগণ যে ট্যাক্স প্রদান করছে তার বিনিময়ে এই শিক্ষার্থীরা এসব প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ পাচ্ছে। এই সত্যকে অনুধাবণ করার শিক্ষা যদি তারা এখান থেকে না পায় তাহলে বলতে হয় জাতি অমানিশার অন্ধকারে ঢেকে যাবে। পত্রিকায় দেখলাম কুয়েট অধ্যাপক সেলিমের মৃত্যুরহস্য উদঘাটনের জন তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু কমিটির দুজন তদন্তকাজ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এখানেই তো অনেক রহস্য। হতে পারে উক্ত দুই শিক্ষক যে রঙের রাজনীতি করেন মৃত্যুবরণকারী শিক্ষক সেই রঙের ছিলেন না। অথবা, তারা জানেন তারা যে রিপোর্ট দেবেন সেটি তারা যেভাবে চাইবেন সেভাবে দিতে পারবেন না। অথবা হতে পারে কোনো অজানা ইঙ্গিত তাদের তদন্তকাজ করতে না করেছে। এভাবেই আমরা সত্যকে চাপা দিতে থাকি। চাপা দিতে দিতে পরিস্থিতি এমন হয়েছে। এরই মধ্যে দেখলাম ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ বন্ধ হয়ে গেছে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের দুই পক্ষের সংঘর্ষে।
সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষকের প্রতি সম্মান ও আবেগে কিছুদিন ক্লাস বর্জন করবেন, মানববন্ধন করবেন তারপর প্রকৃতির নিয়মেই ধীরে ধীরে মানুষ সব ভুলে যাবে। গুরুত্ব পাবে দেশের অথবা বিশ^বিদ্যালয়ের অন্য কোনো একটা ঘটনা। যা এ ঘটনাকে তুচ্ছ করে ফেলবে কিংবা সবার দৃষ্টি অন্যদিকে নিবদ্ধ করবে। এসব ঘটনার যারা হোতা কিংবা নিয়ন্ত্রক তারা জানেন কীভাবে এসব পরিস্থিতি ম্যানেজ করতে হয়। তরুণ শিক্ষার্থীরা কোন অজানা ইঙ্গিতে বা নির্দেশে শুধু রক্ত গরম করা বক্তব্য দেবে, প্রতিপক্ষকে হামলা করবে, হলের দখল নেবে। কিন্তু এগুলো সমাজকে যে কিছুই দেয় না বরং গোটা সমাজে বিস্তার করে অশান্তির কালো ছায়া। আরও একটি দুঃখজনক ও উদ্বেগের বিষয় হলো, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর তো এখন প্রকৃত অর্থে কোনো অভিভাবক নেই। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা প্রতিষ্ঠান সৎভাবে, সঠিকভাবে চালাতে আসেন না, তারা আসেন অন্য কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য। তাই তাদের কাছ থেকে কোনো নিরপেক্ষ, সৎ ও সাহসী কোনো পদক্ষেপ বা ভূমিকা কেউ আশা করতে পারেন না। এখন আর করেনও না কেউ। তাই এসব দুঃখজনক ঘটনার পর ভিসির বক্তব্য বা ভূমিকা কী সেটি নিয়ে কেউ আর মাথা ঘামান না। কারণ সবাই জানেন তারা কিছুই করতে পারেন না। তবে, নিরীহ ছাত্রদের ওপর কর্তৃত্ব ফলাতে আবার পিছপা হন না। আমাদের যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী তো কদিন আগে বলেছেনই যে, ‘বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসিরা ছাত্রদের কথায় ওঠেন আর বসেন।’ এই বাস্তবতা তো আমরা অহরহ দেখছি।
এখন বিশ^বিদ্যালয়গুলোর যে অবস্থা তাতে বর্তমান পদ্ধতির ভিসি বা বিশ^বিদ্যালয় কলেজগুলোর অধ্যক্ষ পদের পরিবর্তন প্রয়োজন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, তাদের দ্বারা বর্তমান পরিস্থিতির শিক্ষা ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা সম্ভব নয় এবং তা হচ্ছেও না। বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসি বা কলেজের অধ্যক্ষ পদে নিয়োগকে আর তাদের ক্ষমতাকে সত্যিকার অর্থে ঢেলে সাজাতে হবে। যাতে তারা নিজেদের মতো কাজ করতে পারেন, এবং ইচ্ছে করলেই কেউ তাদের অপসারণ করতে না পারেন। বর্তমান বাস্তবতায় কোনো শক্তিশালী ছাত্র সংগঠন যদি গরম গরম দু’একটা মিছিল দেয়, চোখ রাঙা করে কথা বলে তাহলেই দেখা যায় এসব প্রতিষ্ঠান প্রধানদের গদি টলোমলো হয়ে যায়। তাই তারা স্রোতের সঙ্গে গা ভাসিয়ে দেন। কিন্তু এর ভবিষ্যৎ কী? প্রকৃত উচ্চশিক্ষায় আমাদের শিক্ষার্থীরা কি শিক্ষিত হবে না? আমাদের মেধাবী শিক্ষার্থীরা কি প্রকৃত উচ্চশিক্ষার পরিবেশ দেশে কখনই পাবে না? এভাবেই পেশিশক্তির প্রদর্শনী চলতে থাকবে আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে?
লেখক শিক্ষক ও শিক্ষাবিষয়ক লেখক
