জড়িতদের স্থায়ী বহিষ্কার চান শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২১, ০৫:৫৫ এএম

অধ্যাপক ড. সেলিম হোসেনের মৃত্যুর পর উত্তপ্ত হয়ে ওঠা খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) এখন বন্ধ রয়েছে। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন এবং ছাত্রলীগ নেতাসহ ৯ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ। কিন্তু শিক্ষক সমিতি ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের স্থায়ী বহিষ্কারের দাবিতে অনড় রয়েছেন। তারা চলমান ক্লাস বর্জনসহ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

শিক্ষক সেলিম হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের স্থায়ী বহিষ্কার দাবি করে কুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রতীক চন্দ বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কুয়েট কর্র্তৃপক্ষের নয়জন শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করাকে আমরা নেতিবাচকভাবে দেখছি। আমাদের প্রধান দাবি ছিল ভিডিও ফুটেজ দেখে প্রকৃত অপরাধীদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা। সেটা করা হয়নি। তাই কুয়েট শিক্ষক সমিতি আন্দোলন অব্যাহত রাখবে।’

গত মঙ্গলবার কুয়েটের ইইই বিভাগের অধ্যাপক ও লালন শাহ হলের প্রাধ্যক্ষ সেলিম হোসেন (৩৮) ক্যাম্পাসের পাশের ভাড়া বাসায় মারা যান। অভিযোগ উঠেছে, ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মীর মানসিক নিপীড়নের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি বলছে, এটি হত্যাকাণ্ড। অধ্যাপক সেলিমের পরিবারও এটিকে হত্যাকাণ্ড বলে অভিযোগ করেছে।

শিক্ষক সেলিম হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় ছাত্রশৃঙ্খলা ও আচরণবিধি ভঙ্গের দায়ে কুয়েট কর্র্তৃপক্ষের সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা ৯ শিক্ষার্থীর সবাই বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতা। এর মধ্যে সাতজন সম্পাদক ও দুজন সদস্য হিসেবে রয়েছেন।

কুয়েটের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বলছেন, দীর্ঘদিন থেকে হলে ছাত্র ওঠানো, ডাইনিং ম্যানেজার (খাবার পরিচালনা) নির্বাচন এবং বিভিন্ন কর্মসূচি পালনে ছাত্রলীগ নেতাদের কথামতোই চলে কুয়েটের ছয়টি ছাত্রাবাস। মেধার ভিত্তিতে সিট বরাদ্দের কথা থাকলেও ছাত্রলীগ নেতাদের অনুমতি না পেলে আসন বরাদ্দ পাওয়া যায় না। ডাইনিং পরিচালনাসহ আর্থিক সুবিধা-সংবলিত পদগুলোতে ছাত্রলীগ নেতারাই দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এর বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত নিলেই প্রভোস্টসহ সিনিয়র শিক্ষকদের চাপ প্রয়োগ ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। ছাত্রদের মধ্যে কেউ কোনো বিষয়ে প্রতিবাদ করলেই তারা নির্যাতনের শিকার হন। ভিন্নমতের ‘ছাপ’ দিয়ে ছাত্রদের পিটিয়ে পুলিশে তুলে দেওয়ারও অনেক ঘটনা ঘটেছে হলগুলোতে। এসব ঘটনার বাইরে হলে বা ক্লাসে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের শিকার হতে হয়।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ভর্তির প্রথম বছর পর হলে উঠতে আবেদন গ্রহণ করা হয়। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে মেধাবীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু প্রথম বর্ষে যারা ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে অংশ নেন, নেতাদের সঙ্গে থাকেনÑ তারাই প্রথমে হলে সিট পান। যাদের সিট পাওয়ার কথা তারা পান আরও এক বছর পর। আর যারা সাধারণ ছাত্র, শিক্ষাজীবনের পুরোটাই তাদের মেসে থেকে কাটিয়ে দিতে হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কম্পিউটার সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এক ছাত্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি নিজে দেখেছি ছাত্রলীগের অত্যাচার। তাদের কথামতো চলতে না পারায় আমাকেও অত্যাচার করা হয়। হল থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে হাত-পা ধরে আবার ফিরে আসি। কুয়েটে শিক্ষার পরিবেশ ও শান্তি ফিরিয়ে আনতে তাদের বহিষ্কার করা হোক। কারণ তাদের কাছে সাময়িক বহিষ্কার কোনো ব্যাপার নয়।’

ছাত্রলীগ নেতাদের এমন চাপ সহ্য করতে না পেরে চলতি ১ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রভোস্ট পদ থেকে পদত্যাগ করেন ড. কল্যাণ কুমার হালদার। তার পদত্যাগপত্র এখনো গ্রহণ করা হয়নি। তিনি বলেন, ‘সবাই নিজের অনুসারীদের কমিটি বা ডাইনিং ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ দিতে চেষ্টা করে। আমার ওপরও চাপ ছিল। এজন্য আমি দুটো ডাইনিং দুপক্ষের দুজনকে দিয়ে (ম্যানেজার) পরিচালনা করেছি। আর চাপ নিতে পারছি না। তাই পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি।’

তবে কুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হল নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ সঠিক নয়। কুয়েট ছাত্রলীগে কোনো গ্রুপিং নেই। হলে ছাত্র ওঠানোর দায়িত্ব প্রভোস্টদের। আমাদের কিছু অনুরোধ থাকে কিন্তু প্রভোস্টরাই সব নিয়ন্ত্রণ করেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত