বিদেশে সম্পদ গড়ে তোলা আরও ৮ বাংলাদেশির নাম প্রকাশ করেছে প্যান্ডোরা পেপার্স। দ্বিতীয় দফায় প্রকাশ করা এবারের প্যান্ডোরা পেপার্সে ৭ লাখ ৪০ হাজার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এই ৮ বাংলাদেশির নাম পাওয়া গেছে। এরা সবাই ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জে বিভিন্ন কোম্পানির মালিক।
গত সোমবার রাতে প্যান্ডোরা পেপার্সের দ্বিতীয় দফার এই তালিকা প্রকাশিত হয়। অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের জোট- ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (আইসিআইজে) সম্পদশালী অভিজাতদের অফশোর সম্পদের রহস্য উন্মোচন করতে প্যান্ডোরা পেপার্স নামক নথিভাণ্ডার তৈরি করে।
এবারের তালিকায় যেসব বাংলাদেশির নাম পাওয়া গেছে তারা বাংলাদেশ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া ও আর্জেন্টিনাসহ বিভিন্ন দেশের ঠিকানা ব্যবহার করেছেন।
তবে প্যান্ডোরা পেপার্সে নাম উঠে আসা সবাই অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন বা পাচার করেছেন তা বলা হয়নি। বলা হয়েছে, বিভিন্ন উৎস থেকে এ ধরনের কিছু গোপন নথি পাওয়া গেছে, যার ওপর ভিত্তি করে ধারণা করা হয় এসব ক্ষেত্রে অনিয়ম বা দুর্নীতির ঘটনা থাকতে পারে। তাছাড়া এই তালিকায় থাকা নামগুলোতে বানানগত ভুলও ঘটতে পারে। এই পেপার্স ফাঁসকারী সংস্থাই এ বিষয়ক ঘোষণা দিয়েছে।
আইসিআইজে বলছে, এই তালিকায় থাকা নামগুলো প্রকাশ করা হয় মূলত বিভিন্ন সংস্থাকে তদন্তে সহযোগিতা করার লক্ষ্য নিয়ে। প্যান্ডোরা পেপার্সে এবার ১৪টি অফশোর সার্ভিস প্রোভাইডারের সরবরাহ করা প্রায় ১ কোটি ১৯ লাখ নথিপত্রের ভিত্তিতে একটি তথ্যভাণ্ডার প্রকাশ করা হয়।
প্যান্ডোরা পেপার্সের দ্বিতীয় কিস্তির এই তথ্যভাণ্ডারে রয়েছে নিহাদ কবির নামে এক বাংলাদেশির নাম। রাজধানী ঢাকার ইন্দিরা রোডে তার বাড়ির ঠিকানা দেওয়া হয়েছে। তিনি মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান সভাপতি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জে ক্যাপিটাল ফেয়ার হোল্ডিং লিমিটেড নামে একটি কোম্পানি গঠন করেছেন নিহাদ কবির। ২০০৮ সালের আগস্টে কোম্পানিটি সেখানে নিবন্ধন নেয়।
প্যান্ডোরা পেপার্সে মঞ্জুরুল ইসলাম নামে আরেক বাংলাদেশির নাম রয়েছে। ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জে তার মালিকানায় থাকা কোম্পানির নাম ওরিয়েন্টাল এগ্রিকালচারাল কেমিক্যাল কোম্পানি। কোম্পানি নিবন্ধনের সময় তিনি ঢাকার গুলশান এবং যুক্তরাজ্যের একটি ঠিকানা ব্যবহার করেছেন।
অন্যান্য যাদের নাম এসেছে তারা হলেন সাইদুল হুদা চৌধুরী, অনিতা রানি ভৌমিক, সাকিনা মিরালি, মোহাম্মদ ভাই, ওয়াল্টার প্রহমাদ এবং ড্যানিয়েল আর্নেস্টো আয়ুবাত্তি। এদের মধ্যে সাইদুল হুদা, সাকিনা ও মোহাম্মদ ভাই গুলশানের ঠিকানা ব্যবহার করেছেন। অনিতা রানি দিয়েছেন চকবাজারের ঠিকানা।
সাইদুলের মালিকানাধীন কোম্পানির নাম বেবেন ইন্টারন্যাশনাল। অনিতার মালিকানায় এন্টারপ্রাইজ হোল্ডিং লিমিটেড, সাকিনার মুন রেকার সার্ভিসেস কর্পোরেশন, মোহাম্মদ ভাইয়ের ১৯৩৬ হোল্ডিংস লিমিটেড, প্রহমাদের সিøন্ট লিঙ্ক এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড এবং ড্যানিয়েলের মালিকানাধীন কুডেল লিমিটেড।
এর আগে গত ৩ অক্টোবর প্রথম দফায় বিশ্বের প্রভাবশালী এবং ধনাঢ্য ব্যক্তিদের পেশাদার সেবা দিয়ে নামমাত্র কর অথবা করবিহীন ব্যবসা ও সম্পদ কেনার কাজে সহায়তা করেছে এমন ১৪টি কোম্পানির ১ কোটি ২০ লাখ গোপনীয় আর্থিক দলিলপত্র বিশ্লেষণ করে তথ্য তুলে ধরা হয় প্যান্ডোরা পেপার্সে। ওইবার প্রকাশিত প্যান্ডোরা পেপার্সে বাংলাদেশি ব্যবসায়ী আব্দুল আউয়াল মিন্টুসহ এক নেপালি ব্যবসায়ীর নাম ছিল।
আইসিআইজে প্যান্ডোরা পেপার্সের তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ না করলেও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে তা বিনিময়ের জন্য তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। প্রায় এক কোটি ২০ লাখ নথি নিয়ে গঠিত প্যান্ডোরা পেপার্স। এসব নথিতে রয়েছে অর্থপাচার, করফাঁকি এবং ধনী ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক এবং প্রভাবশালীদের গোপন সম্পদের তথ্য। বেশ কয়েক মাস ধরে ১১৭টি দেশের প্রায় ৬০০ সাংবাদিক এসব নথি সংগ্রহ করেছেন।
প্যান্ডোরা পেপার্সে গোপনীয় আর্থিক দলিলপত্র বিশ্লেষণ করে দ্বিতীয় দফায় ১৫ হাজারেরও বেশি অফশোর কোম্পানি, ফাউন্ডেশন, ট্রাস্ট এবং অন্যান্য সংস্থার সুবিধাভোগী মালিকদের তথ্য প্রকাশ করা হয়।
প্রথম দফায় প্রকাশ করা প্রায় এক কোটি ২০ লাখ নথির বেশিরভাগই ছিল অগোছালো। এসব নথির অর্ধেকের বেশিই (৬৪ লাখ) ছিল টেক্সট আকারে। যার ৪০ লাখের বেশি পিডিএফ; যা ১০ হাজার পৃষ্ঠারও বেশি। প্যান্ডোরা পেপার্সের নথিপত্রে পাসপোর্ট, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ট্যাক্স ডিক্লারেশন, কোম্পানির অন্তর্ভুক্তির রেকর্ড, রিয়েল এস্টেট চুক্তিও আছে। এছাড়া এতে ৪১ লাখের বেশি ছবি এবং ই-মেইলও ছিল।
নথিপত্রের ৪ শতাংশ ছিল স্প্রেডশিট আকারে; যা ৪ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি।
