আবরার হত্যার রায়

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২১, ১০:৩৪ পিএম

বুয়েটের ছাত্র আবরার হত্যা মামলার রায়ে ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও অপর ৫ আসামির যাবজ্জীবন সাজা ঘোষণার মাধ্যমে আলোচিত এ মামলার বিচারের প্রাথমিক পর্ব শেষ হয়েছে। গত বুধবার ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক এ রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২০ আসামি এবং যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ৫ আসামির সবাই বুয়েটের শিক্ষার্থী।

২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর ভোরে বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরারের মরদেহ উদ্ধার করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শের-ই-বাংলা হলের সিঁড়ি থেকে। পরে জানা যায়, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চুক্তি নিয়ে ফেইসবুকে দেওয়া একটি পোস্টের জের ধরে রাতে আবরারকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শের-ই-বাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে পিটিয়ে হত্যা করে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী (পরে বহিষ্কৃত)। এ নিয়ে সারা দেশে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠে। বিক্ষোভ ও আন্দোলনে অচল হয়ে পড়ে বুয়েট। হত্যার ঘটনায় আবরারের বাবা বরকতউল্লাহ ঢাকার চকবাজার থানায় ১৯ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। একই বছরের ১৩ নভেম্বর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা শাখা ২৫ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়। গত ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। ৭৮ কার্যদিবসের মধ্যে এ মামলার বিচারকাজ শেষ হয়। এরই ধারাবাহিকতায় মামলার রায় হলো।

অল্প সময়ের মধ্যে আলোচিত আবরার হত্যা মামলার রায় নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এর আগে ফেনীর নুসরাত হত্যা ও বরগুনার চাঞ্চল্যকর রিফাত হত্যা মামলার রায়ও দ্রুততম সময়ে হয়েছিল। আবার দেশে অনেক চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকতেও দেখা গেছে। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি, কুমিল্লার কলেজশিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনু হত্যার তদন্তকাজই শেষ হয়নি। অপরাধের বিচার না হলে অপরাধীরা আশকারা পেয়ে যায় এবং নতুন করে অপরাধমূলক কাজে নেমে পড়ে।

আবরার হত্যা মামলার বিচারে জনমনে স্বস্তি এসেছে, যদিও আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বলা যাবে না অপরাধীরা শাস্তি পেয়েছে। অন্যদিকে উদ্বেগজনক ঘটনা হলো, দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এ ধরনের ঘটনা এখনো বন্ধ হয়নি। দেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিবেশের কথা গণমাধ্যমের সূত্রে জানা যায়। সেখানে টর্চার সেলগুলোতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনগুলোর তাণ্ডবের খবর জানা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নাকের ডগায় এমন ঘটনা হতাশার। রাজনীতির চক্করে পড়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরা ঘাতকে পরিণত হচ্ছে। নিজের সহপাঠীদের পিটিয়ে-কুপিয়ে হত্যা করছে। দিয়াজ, আবু বকর, দ্বীপ, আবেদসহ বহু হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। বিশ^বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে এসে এভাবে প্রাণ হারানো পরিবারের কোনো সান্ত¡না থাকে না। সেখানে এসব পরিবার তাকিয়ে থাকে বিচারের দিকে।

আবরার হত্যা মামলার রায়ে বিচারক বলেছেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আসামিদের সবার সংশ্লিষ্টতা মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে একে অপরের সহায়তায় শিবির সন্দেহে গুজব ছড়িয়ে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে, যা বাংলাদেশের সব মানুষকে ব্যথিত করেছে। বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরারের নৃশংস হত্যাকান্ডের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে আর কখনো না ঘটে তা রোধকল্পে এ ট্রাইব্যুনালে সব আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো।

আবরার হত্যা মামলার বিচারকে স্বাগত জানাই। আশা করি, দ্রুততম সময়ে আপিল নিষ্পত্তি করে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। সেই সঙ্গে এ কথাও বলা প্রয়োজন, ব্যক্তিবিশেষ শাস্তি পেলেই সমাজে ও রাষ্ট্রে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি দূর হবে না, এর সঙ্গে জড়িত নেপথ্যের ঘটনা ও জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় নতুন নতুন আবরারের মতো ঘটনা ঘটবে, যা কোনো সভ্য ও সুস্থ সমাজে চলতে পারে না। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সহাবস্থানে মানসিকভাবে তৈরি হতে হবে। রাজনৈতিক কর্মসূচি ও প্রভাব বিস্তারকে ঘিরে প্রাণহানির ঘটনা বন্ধ করতে হবে। বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনকে আরও সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। বিশ^বিদ্যালয়ের হলগুলোকে নিরাপদ রাখতে মনিটরিং বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় যেন আর কোনো প্রাণহানির কেন্দ্র না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।

বিচারিক আদালতের রায় হলো বিচারের প্রাথমিক ধাপ। ন্যায়বিচার তখনই নিশ্চিত হবে, যখন সর্বোচ্চ আদালতে আবরার হত্যা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত