সাইবার বুলিং নারী অধিকারের চরম লঙ্ঘন

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২১, ১০:৩২ পিএম

আমাদের এখন যতটা না সামাজিক পরিমণ্ডলে বসবাস বা সময় কাটানো হয়, তার থেকে বেশি ঘোরাফেরা সাইবার দুনিয়ায়, এই জগতে এখন সবকিছুই যেন হাতের মুঠোয়। অবাধ তথ্যপ্রবাহ ও যোগাযোগ যেন মুহূর্তের ব্যাপার। কী নেই এখানে? শিল্প, সাহিত্য, তথ্য, রাজনীতি, ব্যবসা, এমনকি প্রতারণা, ঠকবাজি, হুমকি-ধমকি ইত্যাদি আরও অনেক কিছু। এ যেন আরেক দুনিয়া, এই দুনিয়ার সঙ্গে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অনেক পার্থক্য, এর যেন কিছু চেনা আবার অনেকটা অচেনা। এই জগতের আদব, কায়দা ও কৌশল সব কিছুই নতুন, ভিন্ন, কিছুটা দুর্বোধ্য ও অসংগঠিত। 

সাইবার দুনিয়া সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়নের ক্ষেত্র প্রশস্ত করেছে, তথ্যের আদান-প্রদানের জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা এখন অনেক কমেছে। এখানে যে কারও তথ্যের ওপর যেমন অবাধ প্রবেশাধিকার আছে একই সঙ্গে তারা তাদের তথ্যসমূহ অন্যদের জানাতে পারে উন্মুক্তভাবে। তাই সাইবার দুনিয়ার সম্ভাবনা যেমন অসীম একইসঙ্গে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেকগুলো ঝুঁকিও রয়েছে। এই ঝুঁকিগুলো অনেক সময় আজানা এবং বিস্তৃত ব্যাপ্তি, কোনো কোনো সময় নিয়ন্ত্রণহীন। তাই এই ঝুঁকিগুলো বিবেচনায় নেওয়া খুবই জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ। 

সাম্প্রতিক সময়ে সাইবার জগতে গ্রাম ও শহরের বিপুল জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, বিশেষত বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যুবদের অংশগ্রহণ লক্ষণীয় মাত্রায় আশাব্যঞ্জক। এর মাধ্যমে বিপুল জনগোষ্ঠী যেমন বিভিন্ন ধরনের তথ্যের আদান-প্রদান করে একইসঙ্গে এর একটি বিশাল অংশ আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তির ওপর দক্ষতা অর্জন করে থাকে। ব্যবসা-বাণিজ্য, সাহিত্যচর্চা, উদ্ভাবনী চিন্তা সব কিছুই হয় এখন সাইবার জগতে। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি-কেন্দ্রিক অপচর্যা ও অপরাধ, সহিংসতা ক্রমশ বেড়েই চলছে এখানে, বিশেষ করে একটি গোষ্ঠী ও শ্রেণি তাদের প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গি ও চর্চার পুনরুৎপাদনে যারপরনাই সক্রিয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশ্বাসগত গোঁড়ামি, পুরুষতান্ত্রিকতা ও লিঙ্গ বিদ্বেষ ও বর্ণবৈষম্যের মতো বিষয়গুলো ব্যাপকমাত্রায় সক্রিয়। বর্তমান সময়ে সাইবার আক্রমণ ও বুলিং অনলাইনে এক আতঙ্কের নাম। যার মূল শিকার কিশোরী, তরুণী ও নারীরা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা। আমরা দেখতে পাই সাইবার বুলিংয়ের মাধ্যমে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা ও যৌন সহিংসতাকে উসকে দেওয়া হয়, সামাজিকভাবে হেয় করা হয়। এর অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে নারীর সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে বাধাগ্রস্ত করা এবং নারী ও পুরুষের উভয়ের অংশগ্রহণে সমাজ নির্মাণের ধারণাকে অসম্মান করা। আমরা সবাই জানি, পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা আমাদের সমাজের অন্যতম নীতি-আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। এই নীতি-আদর্শ বাস্তবায়নের একটি বড় উপায় হচ্ছে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং নারীর চলা ও গতিকে বাধাগ্রস্ত করা। আর সাইবার স্পেসে বুলিং যেন এরই প্রতিফলন যেখানে অনেকেই তাদের পুরুষতান্ত্রিকতার চূড়ান্ত প্রকাশ করে থাকে। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও পরিবারের সদস্য পরিবেষ্টিত হয়ে একজন যে আচরণ করতে সংকোচ বোধ করে তারাই সাইবার জগতে যেন উল্টো, একটু বেশিমাত্রায় সক্রিয়। মূলত লোকচক্ষুর অন্তরালে, অনেক সময় পরিচয় গোপন করে। আমরা প্রায়শই দেখি ক্রমাগত সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে অনেক তরুণী ও কিশোরীর জীবনে নানা ধরনের বিপর্যয় নেমে আসে। অনেকে আবার বিভিন্ন ধরনের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে।

আমাদের সমাজে সাইবার বুলিং কতটা ব্যাপক পরিসংখ্যান তার প্রমাণ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব আইসিটি ইন ডেভেলপমেন্ট-এর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী দেশে ৮০ শতাংশ নারী ও তরুণী সাইবার বুলিংয়ের শিকার। এর মধ্যে ৬৪ শতাংশ শহরের তরুণী ও ৩৩ শতাংশ গ্রামের তরুণী অনলাইনে বিভিন্ন ধরনের যৌন উদ্দেশ্যপূর্ণ ভিডিও, বার্তা ও ছবি পেয়ে থাকেন। সম্প্রতি অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ-এর এক গবেষণা অনুযায়ী ৫০ শতাংশের বেশি নারী অনলাইনে সহিংসতার শিকার হন, এর মধ্যে ৬২ শতাংশের বয়স ২৫ বছরের নিচে এবং এর মধ্যে ৫৫ শতাংশই ছাত্রী। এই একই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে ৭১ শতাংশ নারীই ফেইসবুকে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হন। নারীর বিরুদ্ধে সাইবার সহিংসতার এই উচ্চ হার এটাই প্রমাণ করে সময়ের সাথে সাথে পরিবেশ ও পরিস্থিতির পরিবর্তন হলেও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ হয়নি। বরং এর নতুন নতুন রূপ ও ধরণ তৈরি হয়েছে আর অনলাইন স্পেস যেন এর জন্য একটি উর্বরভূমি, আর এই ভূমিতে নিত্য নতুন চাষবাস হচ্ছে সহিংসতার বিভিন্ন নতুন নতুন ধরণ। ১৯৯১ সাল থেকে আন্তর্জাতিকভাবে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে ২৫ নভেম্বর-নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা দূর করার আন্তর্জাতিক দিবস থেকে মানবাধিকার দিবস ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৬ দিনব্যাপী ক্যাম্পেইন কর্মসূচি শুরু করে। প্রতিবছর নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই সময় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে। সাইবার স্পেসে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা মানবাধিকারের মারাত্মক লংঘন। এর কারণে অনেক কিশোরী ও নারীর ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বিকাশের পথ রুদ্ধ হচ্ছে। আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে এমনিতেই ডিজিটাল বৈষম্যের কারণে সমাজে নারী ও তরুণীরা সাইবার দুনিয়ায় পিছিয়ে পড়ছে এখন ধারাবাহিক ও প্রতিনিয়ত সাইবার স্পেসে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার কারণে তাদের আরেকধাপ পিছিয়ে দেবে। সাইবার বুলিং প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে নানা অজুহাতে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার সামাজিক স্বীকৃতি ও এ সম্পর্কে সচেতনতার অভাব। সাইবার স্পেসে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রতিরোধে আমরা যেন অসহায়। এক্ষেত্রে আইনও যেন অকার্যকর ও অপারগ। ফৌজদারি বিধি ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ অনুযায়ী সাইবার স্পেসে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও নানা কারণে আমাদের সমাজের মেয়েরা ও নারীরা এর সুফল পান না। এক্ষেত্রে পদ্ধতিগত জটিলতা তো আছেই একইসঙ্গে লোকলজ্জার কারণে প্রকাশ না করা ও সামাজিক সংস্কার ইত্যাদির মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা দেয়।

সাইবার স্পেসে বুলিং থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নারীদের ইন্টারনেট দুনিয়ায় অংশগ্রহণ বন্ধ করা কোনো সমাধান না। আর সবার মতো এটি তার অধিকার অধিকন্তু নতুন এই সম্ভাবনার দুনিয়ায় আর সবার মতো নারীর অংশগ্রহণ বড়ানোর জন্য সাইবার সুরক্ষার মতো বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। এক্ষেত্রে কিশোরী ও নারীদের সাইবার স্পেসে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আরও দক্ষতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি যারা সাইবার স্পেসে সহিংসতা, হিংসা, বিদ্বেষ ছড়িয়ে থাকে তাদের ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে। সহিংসতা প্রতিরোধের জন্য একটি ব্যাপক বিস্তৃত মনিটরিং সেল গঠন করা প্রয়োজন, যার কাজ হবে সাইবার জগতে যারা ঘৃণা, হিংসা ও লিঙ্গ বিদ্বেষ ছড়ায় তাদের আইনের অওতায় নিয়ে আসা এবং এ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় প্রচার-প্রচারণা চালানো।

লেখক : উন্নয়নকর্মী

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত