ছাত্ররাজনীতি গণতান্ত্রিকতা ও ছাত্রলীগ

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২১, ১০:৩৬ পিএম

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকান্ডের রায়ে ২০ জনের ফাঁসি ও ৫ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ডের রায়ের পর বাংলাদেশ ছাত্রলীগ জনসমাজে আবার ব্যাপক আলোচনায় এসেছে। বিগত বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বেপরোয়া সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে যুক্ত হওয়া, চাঁদাবাজি এবং ক্যাম্পাসে অন্যান্য ছাত্রসংগঠন ও সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ওপর ছাত্রলীগের নিপীড়ন-নির্যাতন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে বহু মানুষকে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে বিশেষ আলোচনায় আসে কয়েক বছর আগে রাজধানীতে প্রকাশ্য দিবালোকে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হাতে বিশ্বজিৎ দাসের পৈশাচিক হত্যাকান্ডের কথা। আলোচনায় আসে কয়েক বছর আগে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের আন্দোলন এবং কোটা সংস্কার আন্দোলনে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের নিপীড়নমূলক ভূমিকার কথা। আলোচনায় আসে অতি সম্প্রতি খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক মো. সেলিম হোসাইনের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের নিপীড়নের কথা। বলা বাহুল্য, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছাত্রলীগ সম্পর্কে ছাত্রসমাজ ও জনমানসে যে ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে তা স্বাধীনতা সংগ্রামসহ দেশের নানা গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনে ছাত্র সংগঠনটির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস-ঐতিহ্যের বিপরীত।

লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, আবরার ফাহাদের বর্বরোচিত হত্যাকা-ের ঘটনায় যেমন দেশের মানুষ মুষড়ে পড়েছিল, তেমনি এই হত্যাকা-ের রায়ে একসঙ্গে বুয়েটের ২৫ জন মেধাবী ছাত্রের ফাঁসি ও যাবজ্জীবন কারাদন্ডের রায় বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনসহ দেশের মানুষকে ব্যথিত করে তুলেছে। খুব জোরেশোরেই এই প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা মেধাবী ছাত্ররা কোন প্রক্রিয়ায় কোন বাস্তবতায় এমন অমানবিক চর্চায় লিপ্ত হয়ে উঠছে, এভাবে খুনি হয়ে উঠছে? দেশের খ্যাতনামা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এমনকি রাজনীতিবিদরাও এই রায়ের পর ছাত্ররাজনীতির বর্তমান চর্চা নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করছেন। প্রশ্ন উঠছে ছাত্র সংগঠনের রাজনীতি এবং জাতীয় রাজনীতির সম্পর্ক নিয়েও। আবার অনেকে বলছেন, ছাত্র সংগঠনের রাজনীতি করার সুযোগ থাকলেও শিক্ষাঙ্গনগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়া এবং ক্যাম্পাসগুলোতে সব ছাত্র সংগঠনের সহাবস্থানের পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে না পারার কারণেই এমন অরাজক অবস্থা তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে দীর্ঘ ২৯ বছর পর সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন হওয়া সত্ত্বেও নতুন ধারাবাহিকতা তৈরি না হওয়ার কথাও আসছে। উপরোক্ত বাস্তবতায় বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতৃত্ব নির্বাচন এবং সংগঠনের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার চর্চা না থাকার কথাও সামনে আসছে।

শুক্রবার দেশ রূপান্তরে ‘সভাপতি সাধারণ সম্পাদকসর্বস্ব ছাত্রলীগের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতৃত্ব নির্বাচনে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার নানা দিক তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মেয়াদোত্তীর্ণ কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দিয়ে দ্রুত সম্মেলন দাবি করছেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতাদের অধিকাংশ। আগামী বছরের জানুয়ারি মাসের মধ্যে সম্মেলনের দাবিতে এরই মধ্যে আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা। তারা বলছেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী গত বছর জুলাই মাসে বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। বর্তমানে সংগঠন চলছে কেন্দ্রীয় সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের ইচ্ছেমাফিক। সংগঠন পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা কেন্দ্রীয় অন্য কোনো নেতার পরামর্শ নেন না। ফোনেও ঠিকমতো পাওয়া যায় না তাদের। এমনকি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত মধুর ক্যান্টিনেও খুব একটা দেখা যায় না সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে। শুধু সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রেখেছেন। তাও আবার সেসব বিজ্ঞপ্তি গণমাধ্যমে না পাঠিয়ে শুধু সংগঠনের ফেইসবুক পেজে তুলে দিয়ে দায় সারেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এদিকে শুধু কেন্দ্রীয় কমিটিই নয়, ছাত্রলীগের ১১১টি সাংগঠনিক ইউনিটের (জেলা, মহানগর, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ) মধ্যে ১০৪টি কমিটিই বর্তমানে মেয়াদোত্তীর্ণ। বাকি সাতটির মধ্যে কোনো সম্মেলন ছাড়াই প্রেস রিলিজের মাধ্যমে নড়াইল, চাঁদপুর, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও সিলেট জেলা কমিটি ঘোষণা করেন জয়-লেখক। এদিকে, আবার অনেক সাংগঠনিক কমিটি গঠনে পদ বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে তাদের (জয়-লেখক) বিরুদ্ধে। প্রকাশ্যে মুখ খুললে বর্তমান পদ বা সংগঠন থেকে বহিষ্কার অথবা আগামীতে কমিটি হলে সেখানে ‘পদবঞ্চিত’ হওয়ার ভয় রয়েছে।

নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির মধ্য দিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলো নিজেদের কর্মসূচি চালিয়ে যাবে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাবেসেটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, জাতীয় রাজনীতির মতোই ছাত্ররাজনীতিতেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের কোনো ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে না। ক্যাম্পাসগুলোতে চলছে পারস্পরিক সহাবস্থানের গণতান্ত্রিক চর্চার তীব্র অভাব। এমতাবস্থায়, ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সমর্থনপুষ্ট ছাত্র সংগঠন হিসেবে এই পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কি নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন এবং ছাত্ররাজনীতিকে কলুষমুক্ত করার জন্য গণতান্ত্রিক চর্চা অনুসরণের দায়িত্বশীল ভূমিকা গ্রহণ করতে সক্ষম হবে?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত