দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির সহিংসতায় গত এক যুগে ২৭ শিক্ষার্থী ও এক শিশু প্রাণ হারিয়েছে। এসব ঘটনায় হত্যামামলা হলেও বেশিরভাগেরই অগ্রগতি নেই। মাত্র তিনটি মামলায় বিচারিক আদালতে রায় হয়েছে। বাকিগুলো বছরের পর বছর তদন্ত অথবা আদালতে ঝুলে আছে। এমনকি আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এই অবস্থায় বিচার পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছেন নিহত ছাত্রের স্বজনরা। সর্বশেষ বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের রায় হওয়ার ঘটনায় তারা বলেছেন, এটি একটি আইওয়াশের ঘটনা। কারণ স্বাধীনতার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র খুনের ঘটনায় সাজা হওয়ার কোনো নজির নেই। অন্তত একটি সাজা হলে ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস থামত বলে মনে করেন তারা।
আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১২ বছর শাসনামলে বিশ্ববিদ্যালয় হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, এ সময় ৯টি সরকারি ও দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ২৭ শিক্ষার্থী নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। যার সব ঘটনাতেই ছাত্রলীগ জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। সর্বশেষ খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সেলিম হোসেনকে মানসিক নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। এর আগে ২০১৯ সালের অক্টোবরে বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কয়েক নেতাকর্মী। এ ঘটনায় গত বুধবার ছাত্রলীগের ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ৫ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। চাঞ্চল্যকর এই রায়ের পরে ক্যাম্পাস হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচারের দাবি নতুন করে শুরু হয়েছে।
এই অবস্থায় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গত বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ছাত্র হত্যার অন্য মামলাগুলো আমার নলেজে নেই। আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ার বিষয়টি পুলিশের দায়িত্ব। যদি বিচারিক আদালতে দেরি হয় সেটি আমার দেখার বিষয়। নিহত ব্যক্তির স্বজনরা লিখিতভাবে জানালে আমি অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ছাত্র আবু বকর হত্যাকাণ্ডের রায় আইনমন্ত্রীর বক্তব্য সমর্থন করে না। ২০১০ সালে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের শিকার হয়ে প্রাণ হারান আবু বকর। ঘটনাটি সে সময় সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে। হত্যামামলায় ঢাবি ছাত্রলীগের ১০ আসামি ২০১৭ সালে আদালতের রায়ে বেকসুর খালাস পান। কিন্তু ঘটনার আট মাস পর এ বিষয়ে জানতে পারে আবু বকরের পরিবার। এরই মধ্যে তিন বছর পেরিয়ে গেলেও রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেনি রাষ্ট্রপক্ষ। এ বিষয়ে গত বুধবার কথা হয় নিহত আবু বকরের ছোটভাই টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ওমর ফারুকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘রায়ের খবর শুনে আমার বড় ভাই আমার কাছে পরামর্শ চান। এসময় আমি স্বাধীনতার পর সব ছাত্রহত্যার ইতিহাস পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে দেখি একটিরও বিচার হয়নি। রায়ের পরও আসামিরা সাজা পায়নি। এজন্য আমরা আর এগুইনি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত হত্যা মামলাগুলোর সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১২ সালের ৮ জানুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র জুবায়ের আহমেদ হত্যা মামলার বিচারই শুধু বিচারিক আদালতে শেষ হয়েছে। অবশ্য এ রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। সাজা পাওয়া আসামিরা সবাই পলাতক ও মুক্ত জীবনযাপন করছেন। সর্বশেষ ২০১৭ সালে আসামিদের কয়েকজন ফেইসবুকে ছবি দিয়ে ক্যাপশনে লেখেন ‘আমরা এখন পাখির মতো মুক্ত’! আসামিরা মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে।
বিশিষ্টজনরা বলেছেন, দেশের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতির শিকার অস্থিরতায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে এসব হত্যাকাণ্ডের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের কথা বলেছেন কেউ কেউ। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় নিহত ঢাবি ছাত্র আবু বকরের ছোটভাই ওমর ফারুক বলেন, ‘রায় শুনে আমি জাস্ট হাসলাম। এই দেশে সাজা হওয়া কোয়াইট ইম্পসিবল! অন্তত একটা মার্ডারে যদি শাস্তি হইত তাহলে খুনিরা আর সাহস পাইতো না। আবরার হত্যার ফাঁসির আদেশ শুধু একটা ইতিহাস হয়েই থাকল। ভবিষ্যতে মানুষ জানবে রায় হয়েছিল কিন্তু শাস্তি হয় নাই।’
১০ বছরে চবিতে ৮ হত্যা
জানা যায়, গত ১১ বছরে ছাত্র সংগঠনগুলোর হিংসাত্মক রাজনীতির সবচেয়ে বেশি বলি হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে আটজন ছাত্র নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় একটিরও বিচার হয়নি। ২০১০ সালে সন্ত্রাসী হামলায় মহিউদ্দিন মাসুম এবং একই বছরের মার্চে চৌধুরীহাট স্টেশনের কাছে হারুন-অর-রশিদ কায়সার খুন হন। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মারা যান ছাত্রশিবিরের মাসউদ বিন হাবিব ও মোজাহিদুল ইসলাম। ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘর্ষে ছাত্রশিবিরের শাহ আমানত আবাসিক হলের সাধারণ সম্পাদক মামুন হোসেন খুন হন।
একই বছর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষ চলাকালে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন তাপস সরকার। এ ঘটনায় ছাত্রলীগের ২৯ জনকে আসামি করা হয়। যাদের ১৫ জন জামিনে রয়েছেন। বাকিদের পলাতক বলছে পুলিশ। দেশ রূপান্তরকে অনেকে জানিয়েছেন তাপস হত্যা মামলার আসামিদের অনেকে এখনো প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও থাকেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বশেষ ২০১৬ সালে হত্যাকাণ্ডের শিকার ছাত্রলীগ নেতা দিয়াজ ইরফান চৌধুরী। তার মৃত্যু প্রথমে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা হয়। কিন্তু দিয়াজের পরিবার আদালতে ১০ জনকে আসামি করে মামলা করে। তার পরিবার ও ছাত্রলীগের একটি পক্ষ দাবি করে আসছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন নির্মাণকাজের দরপত্র নিয়ে কোন্দলের সূত্র ধরে এটি পরিকল্পিত হত্যা।
বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে চট্টগ্রাম সিআইডি। এ বিষয়ে নিহত দিয়াজের বড় বোন জুবাঈদা ছরওয়ার চৌধুরী নিপা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কয়েক দিন আগে একজন বিয়ে করেছে, একজন নির্বাচনের জন্য প্রচারণা চালাচ্ছে আর পুলিশ বলছে তারা পলাতক। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। এই স্বাধীন দেশে আমরা বিএনপি-জামায়াতের হাতে নির্যাতিত হইনি। নিজ দলের হাতে আমার ভাইটি প্রাণ দিয়েছে। আবরারের বিচার প্রসঙ্গে জুবাঈদা চৌধুরী আরও বলেন, আমরা মনে করি এটি একটি আইওয়াশ। এর চেয়ে আরও বড় বড় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড আছে কিন্তু বিচার পাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী চেয়েছেন বলে আবরারের রায় দ্রুত হয়েছে। উনি না চাইলে বাকিগুলোও হবে না।
রাবিতে ৬ হত্যাকাণ্ড
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ-শিবির এবং ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে গত ১২ বছরে নিহত হয়েছেন ৬ শিক্ষার্থী। যার কোনোটির বিচার হয়নি এখনো।
২০০৯ সালে ছাত্রলীগ-শিবির সংঘর্ষে নিহত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবিরের সাধারণ সম্পাদক শরিফুজ্জামান নোমানী, ২০১০ সালে হল দখলকে কেন্দ্র করে শিবির-ছাত্রলীগ সংঘর্ষে নিহত হন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ কর্মী ও গণিত বিভাগের ফারুক হোসেন, একই বছর ১৫ আগস্ট শোক দিবসের টোকেন ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগ কর্মী নাসরুল্লাহ নাসিম হত্যা, ২০১২ সালে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রলীগ কর্মী আবদুল্লাহ আল হাসান ওরফে সোহেল হত্যা, ২০১৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সোহরাওয়ার্দী হল শাখা ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রুস্তম আলী আকন্দ হত্যা ও ২০১৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মোতালেব হোসেন লিপু হত্যা উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া ২০১২ সালে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবদুল আজিজ খান সজীব, একই বছর দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ সহসভাপতি ফাহিম মাহফুজ বিপুল, ২০১৩ সালে ময়মনসিংহ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের গোলাগুলিতে ১০ বছরের শিশু রাব্বি, ছাত্রলীগের নেতৃত্বের কোন্দলে ২০১৪ সালে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আশরাফুল হক, হল শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সায়াদ ইবনে মমাজ, একই বছর ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাইমুল ইসলাম রিয়াদ, শাহজালাল বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ছাত্রলীগ কর্মী সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী সুমন চন্দ্র দাস, ২০১৫ সালে দিনাজপুরের হাবিপ্রবি শিক্ষার্থী জাকারিয়া ও মাহমুদুল হাসান মিল্টন, ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের কোন্দলে ২০১৬ সালে সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী কাজী হাবিবুর রহমান ও ২০১৭ সালে লিডিং ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ছাত্রলীগ কর্মী ওমর মিয়াদ প্রাণ হারান। এসব মামলার কোনোটিরই বিচার পায়নি ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন, দেশ রূপান্তরের চবি প্রতিনিধি ফজলে রাব্বী, জাবি প্রতিনিধি ফারুক হোসেন, হাবিপ্রবি প্রতিনিধি সোয়াদুজ্জামান সোয়াদ এবং মাভাবিপ্রবি প্রতিনিধি তনিমা ইসলাম।
