শিক্ষক থেকে কর্মকর্তা সবার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ!

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০২১, ০২:০২ এএম

শিক্ষক থেকে কর্মকর্তা কার বিরুদ্ধে নেই দুর্নীতির অভিযোগ! কোনোটা প্রমাণিত, কোনোটার চলছে তদন্ত আবার কারও দুর্নীতির আলোচনা মুখে মুখে। তদন্ত কমিটি গঠন, অভিযোগ আর চিঠি চালাচালিতেই সময় কাটছে সরকারের শিক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর। অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ে জমছে অভিযোগের পাহাড়। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার মানোন্নয়ন শুধু নীতিমালা আর বক্তৃতা-বিবৃতিতেই সীমাবদ্ধ থাকছে।

সবচেয়ে খারাপ অবস্থা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি)। অবস্থা এমন হয়েছে যে, দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের বিদ্যালয়-কলেজগুলো থেকে প্রতিদিন দুর্নীতির অভিযোগ আসছে প্রতিষ্ঠানটিতে। জেলা-উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, মাউশির আঞ্চলিক ও কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদবির, এমপিও-নিয়োগ-বদলিবাণিজ্য এমনকি পেনশনের টাকা তুলতে দুর্নীতিসহ উঠছে নানা অভিযোগ। সব মিলিয়ে দুর্নীতির অভিযোগে কাবু হয়ে পড়েছে শিক্ষা খাত।

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাউশির এক কর্মচারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষা ভবনের সবাই কমবেশি দুর্নীতি করেন। এসব সবাই জানে। কিন্তু প্রমাণ তো হাতেনাতে থাকে না।’

দেশের শিক্ষা খাতে যে দুর্নীতি বেড়েছে তা উঠে এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক প্রতিবেদনেও। গত বছর প্রকাশিত সংস্থাটির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ভূমি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য দেশের সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত খাত। আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এই তিন খাতে মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। বিশেষ করে প্রান্তিক পর্যায়ে এসব খাতে সেবা নিতে হয়রানির শিকার হন বলে জানান দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। ওই সময় তিনি বলেছিলেন, সরকারের ব্যবস্থাপনার যে পদ্ধতি সেখানে গলদ রয়ে গেছে। তারা এ পদ্ধতির সংস্কারের জন্য তিন বছর ধরে সরকারকে বলে আসছেন। কিন্তু কোনো ফল মিলছে না।

এর আগে দুর্নীতি বন্ধ করতে না পেরে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ শিক্ষা কর্মকর্তাদের সহনীয় মাত্রায় ঘুষ নিতে বলেছিলেন। কিন্তু মন্ত্রীর এ আকুতি তেমন কাজে আসেনি।

শিক্ষা ভবনে যে দুর্নীতি হয় তা স্বীকারও করেছেন খোদ মাউশির মহাপরিচালক সৈয়দ গোলাম ফারুক। তবে দুর্নীতি আগের চেয়ে বেড়েছে মানতে নারাজ তিনি। সৈয়দ গোলাম ফারুক গত শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কমবেশি দুর্নীতি সব প্রতিষ্ঠানেই হচ্ছে। মাউশিতেও হয়। যেগুলো ধরা পড়ছে ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। তবে দুর্নীতি আগের চেয়ে বেড়েছে এটা সঠিক নয়।’

সম্প্রতি ঢাকায় মাউশির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সেবা নিতে এসেছিলেন এমন কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা বলেছেন, মাউশির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের চেয়ে এখন আঞ্চলিক এবং জেলা ও উপজেলা শিক্ষা অফিসে বেশি দুর্নীতি হয়। কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির (মাসে বেতনবাবদ সরকারি টাকা) মূল ব্যবস্থাপনার প্রায় সবই তাদের হাতে চলে গেছে। এ সুযোগে সেখানে দেদার দুর্নীতি করেন কর্মকর্তারা। এমনকি টাকার বিনিময়ে অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত আটকে রাখার ঘটনাও রয়েছে। সম্প্রতি কুষ্টিয়ার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ ও এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে বড় গাফিলতি পাওয়া গেছে। যা নিয়ে দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বিদ্যালয়টির একাধিক শিক্ষক দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, খুলনায় মাউশির আঞ্চলিক কার্যালয়ে ঘুষ দিয়ে তাদের বেশ কয়েকজন সহকর্মী শিক্ষক্ষ এমপিওভুক্ত হয়েছেন। সারা দেশে এরকম ভূরি ভূরি অভিযোগ রয়েছে।

মাধ্যমিক শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে যে ভয়াবহ দুর্নীতি চলছে তা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, মাধ্যমিক শিক্ষার স্তরে স্তরে দুর্নীতির ঘটনা ঘটে। অধ্যক্ষ ও শিক্ষক নিয়োগে ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হয়। এনটিআরসিএ থেকে সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠানে যোগদানের সময় ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ এবং এমপিওভুক্তির জন্য ৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষকে ঘুষ দিতে হয়। এছাড়া পাঠদান অনুমোদন, পরিদর্শন, স্বীকৃতি নবায়ন, বদলিসহ নানা ক্ষেত্রে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের ঘুষ দিতে হয়। এ বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘শিক্ষার মতো সেবা খাতে দুর্নীতি খুবই দুঃখজনক। একদিকে আর্থিক ক্ষতি অন্যদিকে সেবাগ্রহীতা ভুক্তভোগী হচ্ছে। শিক্ষায় দুর্নীতি হলে মেধাভিত্তিক সমাজ গঠন বাধাপ্রাপ্ত হয়। এ দুর্নীতি থামানো না গেলে মধ্যম আয়ের দেশ নির্মাণ ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।’

সম্প্রতি মাউশির একটি নিয়োগে বড় দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (প্রশাসন) শাহেদুল খবির চৌধুরী ও উপপরিচালক বিপুল চন্দ্র বিশ্বাসের বিরুদ্ধে। ইতিমধ্যে তাদের দুর্নীতি তদন্তে কমিটি গঠন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। রাজধানীর আশপাশে ১০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ প্রায় আটকে গেছে দুর্নীতির অভিযোগের কারণে। এ বিষয়ে তদন্ত করতে গিয়ে সরকারের অন্তত দুটি দায়িত্বশীল সংস্থার প্রতিবেদনে মাউশি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ২৩ সদস্যের একটি দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ সিন্ডিকেটটি শিক্ষা খাতে দুর্নীতির সর্বোচ্চ শক্তিশালী সিন্ডিকেট বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

মাউশির মহাপরিচালকের (ডিজি) একজন পিয়ন জালিয়াতির অভিযোগে গত বছর সাময়িক বরখাস্ত হন। জুয়েল নামে ওই কর্মীর বিরুদ্ধে শিক্ষা উপমন্ত্রী মুহিবুল হক চৌধুরী নওফেলের স্বাক্ষর জাল করে দুজন শিক্ষককে বদলির ব্যবস্থা করার অভিযোগ ওঠে। যা নিয়ে সে সময় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন ডিজি সৈয়দ গোলাম ফারুক। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জুয়েলের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। এরপর বলা যাবে।’

এদিকে যারা অফিসে অফিসে ঘুষ দিয়ে বিরক্ত হন, তাদের অনেকেই আবার নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি করেন। ছাত্রদের কাছ থেকে আদায় করেন বাড়তি টাকা, টাকা আদায়ে এমন সব কৌশল আবিষ্কার হয়েছে যা রীতিমতো বিস্ময়কর। স্কুলে ছাত্র ভর্তি, শিক্ষক নিয়োগ, বদলি, পদায়ন, শিক্ষকের এমপিওভুক্তি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি, জাতীয়করণ এমনকি অবসরের পর পেনশনের টাকা তুলতে ঘুষ নেওয়া এখন যেন রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো অভিযোগের তদন্তে কোনো দল গেলে তাদেরও খুশি (উৎকোচ ও উপহার) না করার উপায় থাকে না বলে জানিয়েছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষকদের বিরুদ্ধে সহায়ক বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে টাকার লেনদেনের অভিযোগ অনেক পুরনো। আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বই নির্বাচন করলেই শিক্ষার্থীরা তা কিনবে এটা নিশ্চিত। এ কারণে ঘুষ দিতে পিছপা হয় না প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো। এছাড়াও আছে কোচিংবাণিজ্য, বোর্ড ফির চেয়ে অতিরিক্ত ফি আদায়, রাজধানীর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে জোর করে পদ আঁকড়ে থাকা, বাংলার শিক্ষক হয়ে ইংরেজি কিংবা গণিতের ক্লাস নেওয়া, বিদ্যালয় উন্নয়নের নামে দুর্নীতিসহ আরও বহু অনিয়মের অভিযোগ। শিক্ষামন্ত্রী একাধিকবার কোচিং ব্যবসা বন্ধ করার হুঙ্কার দিলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

রাজধানীর একটি নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, যেকোনো প্রতিষ্ঠানে ঢুকে নাড়া দিলেই ঝরঝর করে দুর্নীতির গল্প বেরিয়ে আসে।’

শুধু কর্মকর্তা নন, শিক্ষকদেরও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে ঢাকার একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষক বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকলেই দেখবেন ভূরি ভূরি অনিয়ম। কেউ নিয়ম মানে না। সম্ভবত শিক্ষকরা অন্যদের চেয়েও এগিয়ে।’

ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, বিদ্যালয় থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পর্যন্ত পাঁচ থেকে ছয়টি ধাপে ১০ হাজার থেকে ক্ষেত্র বিশেষে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হয়। এর প্রমাণও বিভিন্ন সময়ে তদন্তে মিলেছে। কিন্তু ফল আসেনি কোনো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করতে অন্তত ২০টি স্তরে ঘুষের টাকা দিতে হয়। এ নিয়ে তহবিল সংগ্রহের তথ্যও আছে। চাকরি জীবন শেষে পেনশন ও ভবিষ্যৎ তহবিলের টাকা তুলতে গেলে ঘুষ না দিলে দীর্ঘদিন আবেদন আটকে রাখার ঘটনা এখন আর গোপন নয়। সম্প্রতি কুড়িগ্রামের এক শিক্ষকের সঙ্গে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। নাম প্রকাশ প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, পেনশনের টাকা তুলতে তার গলদঘর্ম অবস্থা। টাকা ছাড়া কাজই হবে না।

জানা যায়, স্কুল-কলেজের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও বিষয় অনুমোদনের জন্য চলে ঘুষ লেনদেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে তদন্ত দলের পরিদর্শনের পরই কোনো একটি বিষয় খোলার অনুমোদন দেওয়া হয়। আর এই তদন্ত দল বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে তাদের খুশি করতে হয়। আবার অনুমোদন ছাড়াই অবৈধভাব কোনো বিষয়ে ছাত্র ভর্তির বিষয়ে গণমাধ্যমে অভিযোগ আসে নিয়মিত।

সার্বিক বিষয়ে মন্তব্য জানতে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিক কল করে ও মেসেজ পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ফোন ধরেননি শিক্ষা সচিব মাহবুব হোসেনও।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত