দেশে করোনা টিকার বুস্টার ডোজ বা তৃতীয় ডোজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ মাসের শেষের দিকে বা আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে এই টিকা দেওয়া শুরু হতে পারে। প্রাথমিকভাবে তিন শ্রেণির মানুষকে বুস্টার ডোজ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এরা হলেন ৫৫ বা ৬০ ঊর্ধ্ব বয়সী মানুষ, একাধিক রোগ রয়েছে এমন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী এবং সম্মুখসারির কর্মী। সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার ছয় মাস হয়েছে এসব মানুষই বুস্টার ডোজ পাবেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বুস্টার ডোজ দেওয়ার পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত করে এনেছে। আগামী দু’একদিনের মধ্যেই এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবে অধিদপ্তর। আজ এ সংক্রান্ত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক রয়েছে। সেখানেই টিকার তারিখ ও পরিকল্পনা চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও করোনা টিকা বিতরণ ও ব্যবস্থাপনা টাস্কফোর্স কমিটির সদস্যরা এসব তথ্য জানান। এসব কর্মকর্তা বলেন, বুস্টার ডোজের জন্য সুরক্ষা অ্যাপে ডাটা এন্ট্রির কাজ চলছে। দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন এমন জনগোষ্ঠীর জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে বয়স যাচাই-বাছাই চলছে। দু’একদিনের মধ্যেই বুস্টার ডোজের জন্য সুরক্ষা অ্যাপ প্রস্তুত হয়ে যাবে।
গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টিকার বুস্টার ডোজ বা তৃতীয় ডোজ দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ওনাদের (বৈঠকে উপস্থিত জাতীয় পরামর্শক কমিটি ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী) সঙ্গে বুস্টার ডোজ নিয়ে আলোচনা হয়েছে, নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যাতে প্রস্তুত থাকেন। বুস্টার ডোজ কি ফ্রিতে, নাকি অনপেমেন্টে দেবে এই জিনিসগুলো ওনারা আলোচনা করে একটা নীতিমালা করবেন।
মন্ত্রিসভা বৈঠক শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকও বুস্টার ডোজ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, করোনা টিকার বুস্টার ডোজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন যারা ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি, সম্মুখসারির (ফ্রন্টলাইনার), তাদের দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সুরক্ষা অ্যাপসে কিছু আপডেট করতে হবে। আশা করা হচ্ছে, এ মাসেই এই কাজ শুরু করা যাবে।
একইভাবে কভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটিও বুস্টার ডোজ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। পরামর্শক কমিটি বলেছে, নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত টিকা নিশ্চিত করে ষাটোর্ধ্ব ও ফ্রন্টলাইনার, যাদের দুই ডোজ টিকা অন্তত ছয় মাস আগে দেওয়া হয়েছে, এমন জনগোষ্ঠীকে কভিডের বুস্টার ডোজ দেওয়া যেতে পারে।
গণহারে বুস্টার ডোজ নয় : বুস্টার ডোজের ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ ধরনের টিকার ক্ষেত্রে অবশ্যই বয়সের বাধ্যবাধকতা থাকবে। বুস্টার ডোজ গণহারে দেওয়া যাবে না। ৫৫ বা ৬০ বছর ঊর্ধ্ব বয়সী মানুষ এবং যাদের একাধিক রোগ রয়েছে, এমন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকেই বুস্টার ডোজ দেওয়া হবে। সম্মুখসারির কর্মীরাও পাবেন। দু’একদিনের মধ্যেই এ ব্যাপারে ঘোষণা দেওয়া হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, বুস্টার ডোজের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। শিগগির দিনক্ষণ ঠিক হবে। আজ এ সংক্রান্ত একটি বৈঠক রয়েছে। সেখানে তারিখের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হতে পারে।
এই কর্মকর্তা বলেন, কারা বুস্টার ডোজ পাবেন, সে তালিকা বা সংখ্যা চূড়ান্ত হয়নি। যারা দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন, তাদের সবার জাতীয় পরিচয়পত্র আছে। সেটা দেখে ঠিক করব কারা পাবেন।
বুস্টার ডোজ ও জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ জাতীয় কমিটির : দেশে বুস্টার ডোজ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে কভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি। পরামর্শক কমিটির ৪৯তম সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে গতকাল সোমবার কমিটির প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লা স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। সেখানে বলা হয়, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক কভিডের টিকার বুস্টার ডোজ দেওয়ার বিষয়ে জাতীয় কমিটির কাছে মতামত চেয়েছিলেন। সে অনুযায়ী কমিটি বৈঠক করে তাদের সুপারিশ জানিয়েছে। কমিটি দুটি পরামর্শ দিয়েছে- একটি বুস্টার ডোজ নিয়ে, অন্যটি ওমিক্রন প্রতিরোধ সংক্রান্ত।
কমিটি বলেছে ‘কভিডের নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত টিকা নিশ্চিত করে ষাটোর্ধ্ব ও ফ্রন্টলাইনার, যাদের দুই ডোজ টিকা অন্তত ছয় মাস আগে দেওয়া হয়েছে, এমন জনগোষ্ঠীকে কভিডের বুস্টার ডোজ দেওয়া যেতে পারে।’
কমিটি করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন ঠেকাতে জনসমাগম নিয়ন্ত্রণেরও পরামর্শ দিয়েছে। দেশে ওমিক্রন শনাক্ত হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে কমিটি ওমিক্রনের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সব ধরনের সভা-সমাবেশ বা জনসমাগম সীমিতকরণ এবং অতীব প্রয়োজন ছাড়া অফলাইন সভা পরিহার করে অনলাইনে সভা আয়োজনের সুপারিশ করেছে। এ ছাড়া সব পয়েন্ট অব এন্ট্রিতে স্ক্রিনিং, কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশন আরও জোরদার করার সুপারিশ করেছে।
দুই ডোজ টিকা পেয়েছেন ৩২ শতাংশ মানুষ : দেশে সরকার মোট জনগোষ্ঠীর ৮০ শতাংশকে করোনার টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। সরকারি হিসাবে দেশে বর্তমানে মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯১ লাখ ১০ হাজার। তাদের ৮০ শতাংশ অর্থাৎ ১৩ কোটি ৫২ লাখ ৮৮ হাজার মানুষ করোনার টিকা পাবেন। গতকাল সোমবার পর্যন্ত দেশে দুই ডোজ বা সম্পূর্ণ টিকা পেয়েছেন ৪ কোটি ৩৫ লাখ ৯৫ হাজার ৪৪৯ জন মানুষ, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার জনগোষ্ঠীর ৩২ দশমিক ২২ শতাংশ। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত প্রথম ডোজ টিকা পেয়েছেন ৬ কোটি ৭১ লাখ ৩১ হাজার ৪৯০ জন, যা লক্ষ্যমাত্রার জনগোষ্ঠীর ৪৯ দশমিক ৬২ শতাংশ।
গতকাল স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ মিলে গতকাল পর্যন্ত ১১ কোটি ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। এ মাসে আরও দেড় থেকে দুই কোটি টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। হাতে প্রায় চার কোটি টিকা আছে। গতকাল রাতের মধ্যেই যুক্তরাজ্য থেকে আরও ৪০ লাখ ডোজ টিকা এসে পৌঁছানের কথা রয়েছে। টিকার কোনো অসুবিধা নেই।
ওমিক্রনের কারণে জোর পাচ্ছে বুস্টার ডোজ : কিছুদিন আগেও দেশের গবেষক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অন্তত ৮০ শতাংশ মানুষ দুই ডোজ টিকা পাওয়ার আগে তৃতীয় ডোজের পক্ষে ছিলেন না। কিন্তু গত ২৩ নভেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম ওমিক্রন শনাক্ত হওয়ার পর এবং খুব দ্রুত বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬০টিরও বেশি দেশে ধরনটি শনাক্ত হওয়ায় এখন দেশে বুস্টার ডোজ দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। গত শনিবার বাংলাদেশেও দুজনের মধ্যে ওমিক্রন শনাক্তের তথ্য জানায় সরকার। গবেষকরা বলছেন, দুই ডোজ টিকা ওমিক্রনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে পারে না, সেজন্যই বুস্টার প্রয়োজন।
