দেশের বীমা ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারির জন্ম দিয়েছে বেসরকারি ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। বীমা কোম্পানিটির উদ্যোক্তা-পরিচালকরা ব্যবস্থাপনা
কর্তৃপক্ষকে হাত করে নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে অভাবিত মূল্যে জমি কিনে এবং ব্যাংকে গচ্ছিত কোম্পানির আমানত বন্ধক রেখে ২ হাজার ১২৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে একটি তদন্তে উঠে এসেছে।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসির তদন্তে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানটি অভিযুক্ত হলেও বিস্ময়ের বিষয় হলো, বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ এ নিয়ে আশ্চর্যজনকভাবে নীরব। ফারইস্ট লাইফের সাবেক কর্মকর্তা আইডিআরএর বর্তমান চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন এ নিয়ে কথা বলতেও রাজি নন।
প্রায় এক দশক ধরে লুটপাট চললেও জাল প্রতিবেদন দিয়ে এসব আড়াল করেছে একাধিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক এসইসি এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ^াস দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট নথি ও দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধান বলছে, উদ্যোক্তা-পরিচালকদের বড় অংশ এই লুটপাট ও অর্থ পাচারে জড়িত থাকলেও সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী হচ্ছেন ফারইস্ট লাইফের অপসারিত চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ও উদ্যোক্তা-পরিচালক এমএ খালেক। নিকটাত্মীয় ও ব্যবসায়িক অংশীদারদের মাধ্যমে অস্বাভাবিক দরে জমি কিনে ফারইস্ট লাইফের ৮৫৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন নজরুল ইসলাম। এছাড়া প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি ও প্রাইম এশিয়া ফাউন্ডেশনের নামে ফারইস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্স থেকে বেআইনি বিনিয়োগ করে ১০৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন নজরুল ইসলাম। তিনি ওই দুটি প্রতিষ্ঠানের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান। এর বাইরে কর্মচারীদের স্বাক্ষরে জাল ব্যাংক হিসাব খুলে ভুয়া কমিশন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে নজরুলের বিরুদ্ধে।
বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা কোম্পানির আমানতের বিপরীতে অবৈধ ঋণ সুবিধা নিয়ে ৪২১ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন উদ্যোক্তা পরিচালক এমএ খালেক। অভিযোগ, এর বাইরে স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানে অবৈধ বিনিয়োগ ও ঋণের মাধ্যমে কোম্পানির ৬৫৯ কোটি টাকা পাচার করেছেন নজরুল, এমএ খালেক ও অন্যান্য পরিচালক। কোম্পানির কর্মচারীদের নামে দুটি সমবায় সমিতি বানিয়ে আরও ১৯১ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন তারা। সব মিলিয়ে ২ হাজার ১২৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের প্রমাণ পেয়েছে এসইসি। তবে আত্মসাতের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা আমানতের ১ হাজার ৬৮২ কোটি টাকার কোনো হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি।
২০০০ সালে প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মধ্যেই দেশের শীর্ষস্থানীয় জীবন বীমা কোম্পানিতে পরিণত হয় ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। এক সময়ের দেশের শীর্ষস্থানীয় এ প্রতিষ্ঠানটি লুটপাটের কারণে এখন বীমাকারীর দাবি মেটাতে পারছে না। বীমা দাবি নিষ্পত্তি না করায় আইডিআরএতে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে শত শত অভিযোগ জমা পড়েছে। কোম্পানিটি ২০০৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়।
১০ বছর ধরে লুটপাট চললেও এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। সংস্থাটির বর্তমান চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন একসময় ফারইস্ট লাইফে উচ্চপদে চাকরি করেছেন। পরবর্তীকালে এমএ খালেকের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও চাকরি করেছেন; ফারইস্ট লাইফে পরিচালক পদেও ছিলেন। ফারইস্ট লাইফ ও এর কয়েকজন উদ্যোক্তা-পরিচালকের মাধ্যমে সুবিধাভোগী হওয়ায় কোম্পানিটির অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি আমলে নেননি বলে আইডিআরএর চেয়ারম্যান মোশাররফের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। অবশ্য ফারইস্ট লাইফের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন তিনি। কিন্তু তদন্ত কমিটি ফারইস্ট লাইফের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে। এসব কারণে ফারইস্ট লাইফের অর্থ আত্মসাতের দায় আইডিআরএ চেয়ারম্যান মোশাররফের ওপরও বর্তায় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইডিআরএ’র তদন্তের পর আরেকটি অভিযোগের ভিত্তিতে এই বছর ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ঘটনায় তদন্ত চালায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। যেখানে নজরুল ইসলাম, এমএ খালেকসহ অন্যদের বিরুদ্ধে ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি লুটপাটের বিষয়টি বেরিয়ে আসে। এসইসির ওই প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখ্য সচিব, অর্থ মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইইউতে পাঠানো হয়েছে।
জমি কেনার নামে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচার : ফারইস্ট লাইফ, এসইসির তদন্ত প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরে জমি ও ভবন কেনাকাটায়ও বড় ধরনের দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন কোম্পানির অপসারিত চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম। স্বার্থসংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যে অন্তত ১২টি জমি ও ভবন কেনার ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম পাওয়া গেছে, যেখানে কোম্পানির ৮৫৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ। কোম্পানির অর্থ আত্মসাৎ ও ব্যক্তিস্বার্থে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে স্বার্থসংশ্লিষ্ট লেনদেনের (রিলেটেড পার্টি ট্রানজেকশন) অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যে কেনা হয়েছে। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হেমায়েত উল্লাহসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় পরিচালকরা অর্থ আত্মসাতের এই নীল নকশা বাস্তবায়ন করেন।
২০১৫ সালের ৩১ মার্চ ফারইস্ট লাইফের পর্ষদ কাকরাইলে পুরনো ভবনসহ ৩২ শতাংশ জমি ১৯৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। এর মধ্যে ২৮ শতাংশ জমি ১৭২ কোটি টাকায় কেনা হয় মফিজুল ইসলাম ও সেলিম মাহমুদের কাছ থেকে, যারা চেয়ারম্যান নজরুলের শ্বশুর ও শ্যালক। জমিটি ২০১৪ সালের ৮ জুলাই আবুল কাশেম মোহাম্মদ সিদ্দিকী ও অন্য ১৪ জনের কাছ থেকে কেনেন মফিজুল ইসলাম ও সেলিম মাহমুদ। সাবকবলা দলিল অনুযায়ী, মফিজুল ইসলাম ২১ শতাংশ ও সেলিম মাহমুদ অবশিষ্ট ৭ শতাংশ জমি কেনেন মোট ১৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকায়। তারা দুজনই নগদ প্রদানের শর্তে ১৭২ কোটি টাকায় ২৮ শতাংশ জমি বিক্রয় করেন ফারইস্ট লাইফের কাছে। মাত্র ১০ মাসে কৃত্রিমভাবে জমির মূল্য বাড়ানো হয়েছে ১৫২ কোটি ৪২ লাখ টাকা। কাকরাইলের জমিটির অবশিষ্ট ৪ শতাংশ ২০১৫ সালে তিনটি ভিন্ন দলিলের মাধ্যমে ৯ কোটি ২৫ লাখ টাকায় ক্রয় করে ফারইস্ট লাইফ। কোনোরকম ভূমি উন্নয়ন না করেই জমিটির উন্নয়ন বাবদ আরও ৪৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়। সব মিলিয়ে কোম্পানি তৎকালীন চেয়ারম্যান নজরুলের শ^শুর ও শ্যালককে কাকরাইলের ৩২ শতাংশ জমি ও পুরনো ভবনের জন্য মোট ২২৭ কোটি টাকা প্রদান করে।
নজরুল ইসলামের স্ত্রী ও কোম্পানির সাবেক পরিচালক তাসলিমা ইসলামের ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেওয়া আয়কর রিটার্নে দেখা যায়, বাবা মফিজুল ইসলাম ও ভাই সেলিম মাহমুদের কাছ থেকে তাসলিমা ইসলাম ১১৫ কোটি টাকা উপহার হিসেবে পেয়েছেন। যেখান থেকে তিনি তার স্বামী নজরুল ইসলামকে ৫০ কোটি টাকা উপহার হিসেবে প্রদান করেন। এই লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলে সম্পন্ন হয়েছে। নজরুল ইসলাম ও ফারইস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মধ্যে এটি একটি স্বার্থসংশ্লিষ্ট বেআইনি লেনদেন, যার মাধ্যমে নজরুল ইসলাম ও তার পরিবার ব্যক্তিস্বার্থে কোম্পানির ১৯৮ কোটি ২০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে পাচার করেছেন বলে লেখা হয়েছে এসইসির প্রতিবেদনে।
একই কায়দায় রাজধানীর তোপখানা রোডের ৩৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ জমি ক্রয়ের মাধ্যমেও বিপুল পরিমাণের অর্থ হাতিয়ে নেন নজরুল। ২০১৪ সালের মার্চে তোপখানা রোডের ওই জমিটি মো. আজহার খান ও মো. সোহেল খানের কাছ থেকে ২০৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকায় কেনার সিদ্ধান্ত নেয় কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ, যারা নজরুলের ব্যবসায়িক অংশীদার। ক্রয়ের সময় জমিটির ১৫ দশমিক ৩০ শতাংশের মালিকানা আজহার খানের নামে দেখানো হয়, যা তিনি মোস্তাফিজুর রহমান ও খালেদুর রহমানসহ অন্যদের কাছ থেকে একই বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি ও ১৬ জানুয়ারি ১২ কোটি ৮৫ লাখ টাকায় ক্রয় করেছিলেন। আর মো. সোহেল খান অবশিষ্ট ১৮ দশমিক ২৬ শতাংশ জমি মোস্তাফিজুর রহমান শামীম ও মজিবুর রহমান শাহীনসহ অন্যদের কাছ থেকে ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর ও ২০১৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ৮ কোটি ৭০ লাখ টাকায় কেনেন।
সব মিলিয়ে জমিটি ক্রয়ে মো. আজহার খান ও মো. সোহেল খানের ব্যয় হয় ২১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এছাড়া জমিটি উন্নয়নের জন্য আরও ২২ কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয় দেখায় কোম্পানিটি। ব্যবসায়িক অংশীদারদের কাছে স্বার্থসংশ্লিষ্ট এই লেনদেনের মাধ্যমে ফারইস্ট লাইফের ২০৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা পাচার করা হয়েছে, যেখানে চূড়ান্ত সুবিধাভোগী হচ্ছেন নজরুল ইসলাম।
২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে মিরপুরের গোড়ান চটবাড়ী এলাকায় ৬২৯ শতাংশ জমি ক্রয় করা হয় ৭৭ কোটি ২৯ লাখ টাকায়, যেখানে নিবন্ধন ও ভূমি উন্নয়ন ব্যয় বাবদ আরও ১২১ কোটি টাকা দেখানো হয়। অস্বাভাবিক মূল্যে জমি ক্রয় ছাড়াও ভূমি উন্নয়ন ব্যয়ের নামে বিপুল পরিমাণের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন তারা। সব মিলিয়ে গত এক দশকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ১২টি জমি ও ভবন অস্বাভাবিক মূল্যে ক্রয়ের মাধ্যমে ফারইস্ট লাইফের ৮৫৮ কোটি টাকা পাচার করেছেন নজরুলসহ অন্যান্য পরিচালক ও কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা। এসইসির হিসাবে, আত্মসাৎকৃত ওই অর্থের বর্তমান মূল্যমান হচ্ছে ১ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। এসইসি বলছে, ট্রেজারি বন্ড কেনা হলে ১০ বছরে ওই অর্থ দ্বিগুণের বেশি হতো।
অবৈধ ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ : এসইসির তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় আরও দেখা যায় যে, ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকে ৩৬৯ কোটি ৬০ লাখ টাকার এমটিডিআর (শরিয়াহভিত্তিক আমানত) করে ফারইস্ট লাইফ। ওই এমটিডিআর লিয়েন (বন্ধক) রেখে উদ্যোক্তা-পরিচালক এমএ খালেক ব্যক্তিগতভাবে ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩১২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা ঋণ নেন এবং যথারীতি খেলাপি হয়ে পড়েন। এর ফলে ঋণপ্রদানকারী ব্যাংকগুলো ওইসব এমটিডিআর লিকুইডেট করে। আর ফারইস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্স তাদের হিসাবে ৪১২ কোটি ৭০ লাখ টাকা এমএ খালেকের নামে ঋণ হিসেবে দেখায়।
এমএ খালেক যেসব স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেন, সেগুলো হলো পিএফআই সিকিউরিটিজ, প্রাইম প্রপার্টি হোল্ডিংস, প্রাইম ইসলামী সিকিউরিটিজ, ম্যাকসন অ্যাসোসিয়েটস ও ম্যাকসনস বিডি লিমিটেড। এমএ খালেক এসব প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান অথবা প্রভাবশালী পরিচালক হিসেবে ছিলেন। ২০১৮ সালের ৩ নভেম্বর ৩৬৯ কোটি ৬০ লাখ টাকার দায় স্বীকার করে ফারইস্ট লাইফের সঙ্গে খালেক একটি সমঝোতায় পৌঁছান। কিন্তু কোনো অর্থ পরিশোধ করেননি।
হদিস নেই দেড় হাজার কোটিরও বেশি টাকার : ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত ৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বেশ কয়েকটি এনবিএফআইতে ফারইস্ট লাইফের ১ হাজার ৫৬২ কোটি টাকার এমটিডিআর ছিল। পরবর্তী তিন বছরে আরও ৫২৫ কোটি টাকার ডিপোজিট রাখে প্রতিষ্ঠানটি। এতে করে কোম্পানির এমটিডিআর বাবদ মোট ডিপোজিট থাকার কথা ২ হাজার ৮৭ কোটি টাকা। কিন্তু ২০১৮ সাল শেষে কোম্পানির এমটিডিআরের মোট ব্যালান্স ছিল ৪০৪ কোটি টাকা। এসইসি ধারণা করছে, কোম্পানির শীর্ষ কর্তাদের যোগসাজশে উদ্যোক্তা-পরিচালকরা ব্যক্তিস্বার্থে স্বার্থসংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে কোম্পানির ১ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
সমিতির নাম করে আত্মসাৎ : অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে ফারইস্ট লাইফ ইসলামী ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড (এফআইএলআইসিএল) দুটি সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠা করে। ২০১৩ সালে এফআইএলআইসিএল এমপ্লয়ি কো-অপারেটিভ সোসাইটি এবং ২০১৬ সালে প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড (পিআইএলআইএল) এমপ্লয়ি কো-অপারেটিভ সোসাইটি গঠন করা হয়। এর মধ্যে এফআইএলআইসিএল এমপ্লয়ি কো-অপারেটিভ সোসাইটিকে ১২০ কোটি ৬ লাখ টাকা ও পিআইএলআইএল এমপ্লয়ি কো-অপারেটিভ সোসাইটিকে ৭১ কোটি ১৫ লাখ টাকা অগ্রিম প্রদান করে ফারইস্ট লাইফ কর্তৃপক্ষ। এসইসি কর্তৃক নিয়োগ করা বিশেষ নিরীক্ষক দেখতে পান যে, কোম্পানির বুকস অব অ্যাকাউন্টসে সমবায় সমিতি দুটিতে দেওয়া অর্থ অগ্রিম হিসেবে দেখানো হলেও তা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে দেওয়া হয়নি। এমনকি ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে এফআইএলআইসিএল এমপ্লয়ি কো-অপারেটিভ সোসাইটি গুটিয়ে ফেলা হলেও কোম্পানির হিসাবে অর্থ ফেরত দেওয়া হয়নি। প্রতারণামূলকভাবে কোম্পানির অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে ওই দুই সমবায় সমিতি গঠন করা হয়েছিল বলে বিশেষ নিরীক্ষক মনে করছেন।
নথি জালিয়াতি : স্বার্থসংশ্লিষ্টদের বেআইনিভাবে ঋণ ও বিনিয়োগের মাধ্যমেও ফারইস্ট লাইফের বিপুল পরিমাণের অর্থ লোপাট করেছেন নজরুল, এমএ খালেকসহ অন্য পরিচালকরা। ফারইস্ট লাইফের ২০১৮ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে (ব্যালান্স সিটে) শেয়ার ও বন্ডে কোম্পানির ৬৮৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ দেখানো হয়। তবে কোম্পানির করপোরেট বুকস অব অ্যাকাউন্টস তদন্তে দেখা যায় যে, কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালক ও শীর্ষ কর্মকর্তা এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট ১৩ জনকে ব্যাংক ঋণের সুবিধা দিতে বোর্ড সভার রেজল্যুশন নকল করে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে মুদারাবা টার্ম ডিপোজিট (এমটিডিআর) খোলা হয়। এ ক্ষেত্রে কোম্পানির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, পরিচালক এমএ খালেক, কেএম খালেদ, মিজানুর রহমান, তাসলিমা ইসলাম, এমএ ওয়াহাব, ডা. ইফ্ফাত জাহান, আয়শা হোসনে জাহান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হেমায়েত উল্লাহ ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে মুদারাবা টার্ম ডিপোজিটের বিপরীতে ঋণ সুবিধা দেওয়া হয়। আর এসব ঋণ ও এর সুদ পরিশোধ না করায় ফারইস্টকে প্রায় ৬৫৯ কোটি টাকার এমটিডিআর সমন্বয় করতে হয়।
সংশ্লিষ্ট পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে পিএফআই সিকিউরিটিজ, প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি, প্রাইম ফাউন্ডেশন, পিএফআই প্রপার্টিজ, মিথিলা প্রপার্টিজ, মিথিলা টেক্সটাইল, আজাদ অটোমোবাইলস ও ম্যাকসন অ্যাসোসিয়েটস।
পরিচয় জালিয়াতি করে আত্মসাৎ : কোম্পানির অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে কর্মচারীদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও স্বাক্ষর জাল করে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের তোপখানা শাখায় মোস্তফা জামান হামিদী ও মুহাম্মদ আবদুল মান্নান নামে ঢাকার বাইরের দুজন কর্মকর্তার নামে ব্যাংক হিসাব খোলা হয় ফারইস্ট লাইফের প্রধান শাখা থেকে। বীমার ভুয়া কমিশন সৃষ্টি করে ওই দুই ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ৫ কোটি ২২ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন নজরুল ও হেমায়েত উল্লাহ। এভাবে বিভিন্ন ব্যাংকে কর্মচারীদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও জাল স্বাক্ষর দিয়ে হিসাব খুলে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন তারা। অনুমোদন ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র ও জাল স্বাক্ষর দিয়ে ব্যাংক হিসাব খোলা ও কোটি কোটি টাকা লেনদেন করায় গত ২১ অক্টোবর নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন মুহাম্মদ আবদুল মান্নান।
সহযোগী যারা ছিলেন : তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত কোম্পানির অর্থ আত্মসাৎ, লুটপাট ও পাচারে সক্রিয় পরিকল্পিত ও তা কার্যকর করতে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের বড় অংশ, মনোনীত ও স্বতন্ত্র পরিচালক, এমডিসহ কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা সহায়তা করেছেন। নজরুল ইসলাম ২০১০ থেকে ২০২১ সালে অপসারণের আগপর্যন্ত ফারইস্ট লাইফের চেয়ারম্যান ছিলেন। তার আমলেই ধারাবাহিকভাবে আর্থিক অপরাধ ও অর্থ পাচারের ঘটনাগুলো ঘটেছে। ফারইস্ট লাইফের আরও দুই প্রতিষ্ঠান প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি ও প্রাইম এশিয়া ফাউন্ডেশনেরও চেয়ারম্যান ছিলেন নজরুল, যেখানে ফারইস্ট লাইফ বেআইনিভাবে ১০৪ কোটি ৬০ লাখ ও ২৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে।
অর্থ লুটপাটে সহযোগিতা দেওয়ায় সাবেক এমডি ও সিইও হেমায়েত উল্লাহকে বিভিন্নভাবে পুরস্কৃত করেন নজরুল। এর অংশ হিসেবে মাসে ১২ লাখ সম্মানী দেওয়া হতো তাকে। এককালীন প্রায় ৩ কোটি টাকা কমিশনও দেওয়া হয়েছে হেমায়েতকে।
একটি কোম্পানিতে অডিট কমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও ১০ বছরে যে অর্থ আত্মসাৎ ও লুটের ঘটনা ঘটেছে সে সম্পর্কে ন্যূনতম তদারকিও করেনি ফারইস্ট লাইফের অডিট কমিটি। বরং অডিট কমিটির সদস্যরাও নজরুলসহ অন্যান্য লুটপাটকারীর সঙ্গে যোগসাজশে কোম্পানির অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। অর্থ লুটপাটে কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সহায়ক ভূমিকা পালন করেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হেমায়েত উল্লাহ। তিনি ২০১০-১১ সালে ছিলেন কোম্পানির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ২০১২ থেকে ২০২১ সালে তাকে অপসারণের আগ পর্যন্ত এমডি ও সিইওর দায়িত্ব পালন করেন। কোম্পানির অর্থ আত্মসাতে অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাও একইভাবে সহযোগিতা করেছেন। এমনকি এসইসি তথ্য চাইলেও কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ কর্মকর্তারা তা দেননি।
নিরীক্ষকদের জালিয়াতি : কোম্পানির বিপুল পরিমাণের অর্থ লুটপাটে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে স্বাধীন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও। ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত চারটি স্বাধীন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান কোম্পানির হিসাব নিরীক্ষা করে। এ সময় করপোরেট গভর্ন্যান্স অডিটে আরও তিনটি প্রতিষ্ঠান যুক্ত ছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ও তাদের অংশীদাররা জালিয়াতির প্রতিবেদন দাখিল করেছে, যার কারণে আর্থিক বিবৃতিতে ম্যাটেরিয়াল মিসস্টেটমেন্টে ঝুঁকি চিহ্নিত করতে ও মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া দাবি স্তরে লেনদেনের ধরন, অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স ও ডিসক্লোজার দিতেও ব্যর্থ হয়েছে নিরীক্ষকরা। এমনকি ফারইস্ট লাইফে ব্যাপক জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের ঘটনায় পর্যাপ্ত প্রমাণ সংগ্রহ করতেও ব্যর্থ হয়েছে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। সুস্পষ্ট ব্যর্থতার জন্য নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ও তাদের অংশীদারদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা দরকার বলে মনে করে এসইসির তদন্ত দল। তদন্ত প্রতিবেদনে এসইসি উল্লেখ করেছে যে, ওই অর্থ আত্মসাৎ না করে যদি সরকারি ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা হতো তাহলে লুটকৃত অর্থের বর্তমান মূল্য দাঁড়াত সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
শেষ কোথায়? : লুটপাট ও অর্থ পাচারের ঘটনায় ২০২১ সালের ৯ আগস্ট ফারইস্ট লাইফের নজরুলের নেতৃত্বাধীন বোর্ড ভেঙে দিয়ে স্বতন্ত্র পরিচালকদের দিয়ে ১০ সদস্যের নতুন পর্ষদ গঠন করে। নতুন পর্ষদকে কোম্পানিতে সংগঠিত পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধার, আর্থিক অপরাধ ও অর্থ পাচারে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণসহ বোর্ড কমিটি ও ব্যবস্থাপনায় শীর্ষ পদগুলোতে পুনর্গঠনে নির্দেশনা দেয় এসইসি। এছাড়া মুদ্রা পাচার প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী যৌথ তদন্ত করতে দুর্নীতি দমন কমিশন, সিআইডি ও বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে চিঠি দিয়েছে কমিশন। এর বাইরে আত্মসাতে যুক্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি, তাদের পরিবার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় থাকা ফারইস্ট লাইফ ও অন্যান্য তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারে থাকা বিনিয়োগ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশনাও দিয়েছে এসইসি।
অর্থ লুটপাটে জড়িত নজরুল ইসলাম বর্তমানে দেশের বাইরে থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এমএ খালেক, অপসারিত হওয়া এমডি হেমায়েত উল্লাহ, বর্তমান সিইও মোহাম্মদ আলমগীর কবিরের কাছে বক্তব্য চেয়ে একাধিকবার ফোন ও খুদেবার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া মেলেনি। এমনকি অপসারিত হওয়া সাবেক পরিচালকরাও বক্তব্য দিতে অস্বীকার করেছেন। বক্তব্য চেয়ে ফোন দিলে সাড়া দেননি আইডিআরএর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেনও।
এ বিষয়ে এসইসির চেয়ারম্যান প্রফেসর শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফারইস্ট লাইফের ঘটনা নিয়ে তদন্ত করা হয়েছে, বিশেষ নিরীক্ষাও সম্পন্ন হয়েছে। ইতিমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তদন্ত ও বিশেষ নিরীক্ষার প্রতিবেদন আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে পাঠিয়েছি। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা কাজ করছি।’
