বাংলাদেশের ৫০ বছর উন্নয়নের বৈপরীত্য

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২১, ০২:১৬ এএম

সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম। জাতিবিদ্বেষ ও সামরিক জান্তাবিরোধী লড়াই থেকে এই যুদ্ধে প্রবেশ মানুষের মধ্যে পাকিস্তান থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। তারই প্রকাশ হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণায় নতুন দেশের জন্য লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছিল ‘সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা’। যুদ্ধ শেষে নতুন দেশের সংবিধানে চার মূলনীতির একটি নির্দিষ্ট করা হয়েছিল সমাজতন্ত্র। ৬০ ও ৭০ দশকে বৈশ্বিক-আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষায় সংবিধানে সমাজতন্ত্র অন্যতম নীতিমালা হিসেবে অন্তর্ভুক্তি খুবই স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। এছাড়া পরিত্যক্ত শিল্পকারখানা রাষ্ট্রায়ত্ত করা, ২৫ বিঘা পর্যন্ত কর মওকুফ, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণসহ কিছু কর্মসূচিকে সমাজতান্ত্রিক নীতির বাস্তবায়ন বলেই মনে করা হচ্ছিল। যারা পরিকল্পনা কমিশনে যুক্ত হয়েছিলেন তারা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েই প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা করেছিলেন। সে সময় বাংলাদেশের অর্থনীতির ‘সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠনের’ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যক্তি পুঁজির আদি গঠন শুরু সে সময়ই।

গত কিছুদিন ধরে বাংলাদেশে বর্তমান ‘উন্নয়ন’ নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশে ৭০ দশকের শুরুতে প্রকাশিত একটি বইয়ের কথা টানা হচ্ছে, নামবাংলাদেশ : এ টেস্ট কেস অব ডেভেলপমেন্ট। এর লেখক ছিলেন ১৯৭২-৭৪ সালে ঢাকার বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি জাস্ট ফাল্যান্ড এবং একই সময়ে ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ জে. আর. পারকিনসন। এই গ্রন্থে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ নিয়ে গভীর হতাশা ব্যক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু এরকম হতাশা জনগণের মধ্যে প্রধান ছিল না। মুক্তিযুদ্ধকালে ও স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে হতাশার বদলে ছিল বিপুল প্রত্যাশা। কিন্তু প্রায় প্রথম থেকেই রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হয় এই প্রত্যাশার বিপরীত দিকে। আকাক্সক্ষা ও বাস্তবতার এই বৈপরীত্য নিয়ে সে সময়ের অন্য আরও কিছু বই আছে যেগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তৎকালীন পরিকল্পনা কমিশনের প্রধান নূরুল ইসলাম এবং সদস্য রেহমান সোবহান ও আনিসুর রহমানের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা বইসমূহ।

স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো, জনবলের সংকট, অর্থনীতি গুছিয়ে তোলার জটিলতার পাশাপাশি তেল সংকট বাংলাদেশকে খুবই অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছিল। অর্থনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংকট যেমন ভূমিকা রেখেছে, ভেতরের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, ভুলনীতিও যে যথেষ্ট কারণ ছিল তা তৎকালীন বিভিন্ন দলিলপত্র থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনায় দলীয় বিবেচনায় এমন লোকজনকে নিয়োগ দেওয়া হয় যাদের দুর্নীতি, অনিয়ম, অযোগ্যতায় এসব প্রতিষ্ঠান দ্রুত লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। শুরুতে এসব রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, লাইসেন্স-পারমিটই ব্যক্তি পুঁজি গঠনের প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে। ১৯৭৪ সালের বন্যা নৈরাজ্যিক পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটায় এবং দেশজুড়ে দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ। খাদ্য উৎপাদন সে বছর ভালো হলেও দুর্ভিক্ষে মানুষের মৃত্যু ১৯৪৩-এর পর প্রথম সর্বব্যাপী হাহাকার তৈরি করে। তখনো দেশে রেশনিং ব্যবস্থা ছিল, না থাকলে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারত। এই ১৯৭৪ সালেই বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সমিতির প্রকাশনায় (১৯৭৪) বলা হয়েছে,  ‘ততদিনে দেশের অর্থনীতির গন্তব্য নির্ধারণে অর্থনীতিবিদ এবং তাদের বিশ্লেষণ পদ্ধতির ভূমিকার ওপর আস্থা নষ্ট হয়ে গেছে’ এবং সময়টা তখন ‘জাতীয় প্রত্যাশাভঙ্গ এবং হতাশার’। ঐ সম্মেলনে সমিতির সভাপতি ডক্টর মাজহারুল হক তার ভাষণে সমাজতন্ত্রের কথা বলে বাস্তবে তার উল্টোদিকে যাত্রা করা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ‘সমাজতন্ত্রের দিকে দেশকে নিয়ে যাওয়ার কোনো সক্ষমতা শাসক দলের নেই, উপরন্তু তার জন্য ন্যূনতম আন্তরিকতাও তাদের নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই সময়ের প্রধান প্রবণতা হলো লুটপাট, বিলাসী ভোগ, জাঁকজমক অনুষ্ঠান ও অপচয়।’ মাজহারুল হক সেইসঙ্গে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনারও সমালোচনা করে বলেন, ‘এটি পাকিস্তানের চতুর্থ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ধরনেই দাঁড় করানো হয়েছে। সমাজতন্ত্রের বাগাড়ম্বর থাকলেও সেটা মোটেই সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনা ছিল না।’    

পুঁজিপন্থি যাত্রা

স্বাধীনতার কিছুদিন পর থেকেই বাংলাদেশ অর্থনীতির বাজারমুখী/পুঁজিপন্থি সংস্কারে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবি পাকিস্তানের মতোই পথপ্রদর্শক ও তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকা গ্রহণ করে। ১৯৭৫ সালেই বাংলাদেশ সামরিক শাসনে প্রবেশ করে, এরপর ১৯৮২ সালে দ্বিতীয় দফা সামরিক শাসন জারি হয়, এই দশকে ক্ষমতায় ছিলেন জেনারেল এরশাদ, প্রথমে সামরিক শাসন ও পরে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। এই দশকেই বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় ধরনের পরিবর্তনের ভিত্তি স্থাপিত হয়। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচির যে মূল দিকগুলো তার কিছু কিছু বাস্তবায়ন আমরা ১৯৭৪ সাল থেকেই দেখছিলাম, ১৯৭৫ এর পর সামরিক শাসনামলে তা গতিপ্রাপ্ত হয়, ১৯৮২ এর সামরিক শাসনের পর তা সর্বব্যাপী বিস্তৃত হয়।

বস্তুত ৮০-এর দশকে বাংলাদেশে পুঁজিবাদ বিকাশের যে ভিত্তি তৈরি হয়, তার ওপরই পরবর্তী দশকগুলোতে যাত্রাপথ তৈরি হয়।এই কয় দশকে সরকারের বহুরকম পরিবর্তন হলেও এই গতিমুখে কোনো পরিবর্তন আসেনি, সাধ্যমতো সবাই তাতে যোগ করেছেন। বর্তমান আওয়ামী লীগের শাসনকালে এই গতি অনেক দ্রুত হয়েছে। এই দশকে সমাজ অর্থনীতির যেসব শক্তি সংহত হয়, যে পরিবর্তনগুলোর সূচনা হয় এবং পরে যেগুলো বাংলাদেশের সামাজিক অর্থনৈতিক গতিমুখ নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করে তার কয়েকটি এখানে চিহ্নিত করা দরকার।

প্রথমত, বাংলাদেশে ধনিক শ্রেণির গঠন ও বিকাশে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে ঋণ একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে কাজ করেছে। নানা জাল দলিলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া, তা পরিশোধ না করা, সেই ঋণের টাকার ওপর ভর করে সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ, রাষ্ট্রের সম্পদ ব্যক্তিমালিকানায় দেওয়ার নীতি, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ঋণের টাকা অনাদায়ী রেখে তার একাংশ দিয়ে প্রাইভেট ব্যাংক প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি এমনি এমনি হয় না, সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর সঙ্গে রাষ্ট্রের যোগসাজশ দিয়েই এগুলো হয়।

দ্বিতীয়ত, এইসব সংস্কার নীতিনির্ধারণ, প্রশিক্ষণ, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও পরিচালনা ব্যবস্থা নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা ছিল বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের, তার সঙ্গে এডিবি, ইউএসএইডসহ বিভিন্ন সংস্থা। এগুলো সম্ভব হয়েছে ‘উন্নয়ন সহায়তা’, ‘কারিগরি সহায়তা’ নামের ঋণ এবং অনুদানের মধ্য দিয়ে। এসব ঋণ প্রকল্পের সুবিধাভোগী ছিল- আছে আমলাতন্ত্র, অর্থনীতিবিদসহ বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। এসব প্রকল্পের কারণে দেশের জন্য ঋণের বোঝার চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল দেশের অর্থনীতির গতিমুখ নির্ধারণে নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন।

তৃতীয়ত, তৈরি পোশাক শিল্পের ভিত্তি স্থাপিত হয় এই দশকেই যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় দ্রুত বৃদ্ধি পায়, এবং প্রধান রপ্তানি খাত পাট ও পাটজাত দ্রব্যকে অতিক্রম করে এটা নতুন প্রধান খাত হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই খাতে দ্রুত বিকাশের মধ্য দিয়ে নতুন এক উদ্যোক্তা শ্রেণি সংগঠিত হয়, পুঁজিপতি হিসেবে ভিত্তি প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক সোপান হিসেবে যা অনেকে ব্যবহার করতে সক্ষম হন। রাজনৈতিক নেতা, এমপি, মন্ত্রী, পুলিশ, সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকে গার্মেন্টস মালিক হিসেবে সাফল্য লাভ করে। এরা এখন সংগঠিতভাবে সবচাইতে শক্তিশালী শ্রেণি-ঐক্য গঠন করেছে।

চতুর্থত, বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আদম রপ্তানি এবং তা থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন দেশের অর্থনীতির অন্যতম খাতে পরিণত হতে থাকে। বর্তমানে এই খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ বহুগুণ বেড়েছে। আবাসন খাত, মোবাইল ও ইলেকট্রনিক্স বাজার, এই প্রবাসী আয়ের কারণে অনেকখানি সম্প্রসারিত হয়েছে।

পঞ্চমত, ৮০ দশক থেকেই এনজিও একটি শক্তিশালী ধারায় পরিণত হয়। গ্রামীণ সমাজ ও অর্থনীতিতে এনজিওর বহুবিধ প্রভাব আছে। পুঁজিবাদী শোষণ ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে, রাষ্ট্রের ব্যর্থতার সমাধান হিসেবে, দারিদ্র্য বিমোচন-নারী ক্ষমতায়নের উপায় হিসেবে এগুলোকে উপস্থাপন করা হয়েছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব, পরিকল্পনা হ্রাস এবং ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সমর্পণ করার এই প্রক্রিয়া ক্রমেই জোরদার হয়। ক্রমে এনজিও জগতেও মেরুকরণ, পশ্চাৎপসরণ ও অঙ্গীভবন দেখা দেয়। এনজিও কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বাজার ব্যবস্থার বিকাশ প্রত্যন্ত এলাকা পর্যন্ত সম্ভব হয়।

ষষ্ঠত, আবাসন, সরকারি প্রকল্প, অবকাঠামো নির্মাণে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি, প্রবাসী আয়, বিদেশি ঋণের প্রবাহ নির্মাণ শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটাতে বিশেষভাবে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে যোগাযোগ ও পরিবহন ক্ষেত্রে স্বাধীনতার পর থেকেই রেলওয়ে সরকারি উন্নয়ন অগ্রাধিকারে কখনোই স্থান পায়নি। কিন্তু বরাবরই সড়ক যোগাযোগ নীতিগত ও বরাদ্দগত আনুকূল্য পেয়েছে। সে কারণে স্বাধীনতার পর পর রেললাইনের দৈর্ঘ্য যা ছিল তা সামান্য বেড়েছে আবার বন্ধও হয়েছে, অন্যদিকে সড়ক-মহাসড়কের দৈর্ঘ্য বেড়েছে এর কয়েক হাজার গুণ। এর কারণ হলো সড়ক, সড়ক-সেতু, গাড়ি-বাস-ট্রাক অর্থাৎ সড়ক পরিবহনই আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর কাছে গুরুত্ব পেয়েছে।

সপ্তমত, ৮০ দশকে বিশ্বব্যাংক-এডিবির উদ্যোগে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত নিয়ে যে নীতি কাঠামো তৈরি করা হয় তার পথ ধরে বাংলাদেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোকে ২৩টি ব্লকে ভাগ করা হয় এবং বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার কর্মসূচি শুরু হয়। কানাডীয় কোম্পানি সিমিটারের সঙ্গে চুক্তি ছিল এর সূচনা। এই ধারা পরে জোরদারভাবে শুরু হয় বেসামরিক সরকারগুলোর সময়। প্রথম দফা চুক্তি হয় ১৯৯৩ সালে। দ্বিতীয় দফা ১৯৯৭ সালে। গত ১০ বছরে এই ধারা অনেক বেশি জোরদার হয়েছে, গ্যাস ব্লক দেওয়ার পর দায়মুক্তি আইনের মধ্য দিয়ে সুন্দরবন বিনাশী রামপাল প্রকল্পসহ কয়লা ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ভয়াবহ পথ গ্রহণ করেছে সরকার। এসব নীতিমালায় দেশীয় একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে ব্যবসায়ী, আমলা, কনসালটেন্ট, সাব-কন্ট্রাকটর। জাতীয় বিপর্যয়ের বিনিময়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গোষ্ঠীর জন্য আকর্ষণ তৈরি করেছে উচ্চ মুনাফার এই খাত। 

অষ্টমত, ৯০ দশক থেকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক ব্যক্তিমালিকানায় মুনাফাভিত্তিক তৎপরতা শুরু হয়। এর সুবিধাভোগী হিসেবে শিক্ষক ও চিকিৎসকদের একটি অংশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়। প্রাইভেট স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টার-হাসপাতাল ব্যক্তিপুঁজি গঠনে যেমন ভূমিকা রাখে তেমনি বিদ্বৎসমাজের মুনাফামুখী তৎপরতা বাড়ে। সর্বজনের জন্য শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় বৃদ্ধি পেতে থাকে।

সামাজিক ও পরিবশেগত ব্যয়

পুঁজি সংবর্ধনের বিদ্যমান ধারায় বাংলাদেশে প্রাণ-প্রকৃতির অভূতপূর্ব বিপর্যয় হয়েছে। অতীতে নদী-নালা, খাল-বিল নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করে শত হাজার কোটি টাকার ‘উন্নয়ন’ প্রকল্প করা হয়েছে, এখন দেখছি এর ফল স্থায়ী জলাবদ্ধতা, নদীভাঙন এবং পরিবেশ বিপর্যয়। দ্রুত মুনাফার লক্ষ্যে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ওষুধ, কৃত্রিম রং ব্যবহারের ফলে পানিদূষণ এক মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এর বিষপ্রভাব পড়েছে মৎস্য, বৃক্ষ, তরুলতাসহ জীববৈচিত্র্যের ওপর। উৎপাদন বেড়েছে কিন্তু নিরাপদ পানি ও খাদ্য বড় ঝুঁকির মধ্যে পতিত। নির্মাণকাজে উল্লম্ফন ইটের ভাটারও ভয়াবহ বিস্তার ঘটিয়েছে। আন্তর্জাতিক জরিপ জানিয়েছে ঢাকা মহানগরীর বায়ুদূষণ বিশে^র মধ্যে নিকৃষ্টতম স্তরে। শুধু বায়ুদূষণ নয়, পানিদূষণ, দুর্ঘটনা, আশ্রয়হীন মানুষ, যানজট, যৌন নিপীড়ন, নিরাপত্তাহীনতা সবদিক থেকেই রাজধানী ঢাকা বিশে^র নিকৃষ্ট শহরগুলোর সঙ্গে এখন পাল্লা দিচ্ছে।

গত কয় দশকে শিল্প, কৃষি, নির্মাণ, যোগাযোগ ইত্যাদি ক্ষেত্রে সক্ষমতার বিকাশ ঘটেছে অনেক, বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটেছে। জাতীয় সক্ষমতার আরও বিকাশের সম্ভাবনাও সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু সব ক্ষেত্র মুনাফা বিবেচনার অধীনস্ত হওয়ায় বিপর্যস্ত হচ্ছে জনস্বার্থে এর প্রয়োগের বহু সম্ভাবনা। ঘুষ, কমিশন, নিয়োগ বাণিজ্য, আটক বাণিজ্য সবই বর্ধনশীল, প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই আর্থিক লেনদেনের প্রক্রিয়া খুব শক্তিশালী। বিচার, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা প্রান্তিক অবস্থানে। দখল, লুণ্ঠন অবারিত। একদিকে প্রাণ-প্রকৃতি পরিবেশ বিপর্যয়, অন্যদিকে নজরদারি ব্যবস্থার অভূতপূর্ব বিস্তার; একদিকে নগ্ন মুনাফা আগ্রাসন, অন্যদিকে নাগরিকদের ওপর ডিজিটাল নজরদারি সম্প্রসারণ, গোয়েন্দা সংস্থার খবরদারি, রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার একচেটিয়াতন্ত্র, মিডিয়া-আদালত নিয়ন্ত্রণ এবং হাত মুচড়ানো স্বাধীনতা, বিভিন্ন বাহিনীর অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা বর্তমান উন্নয়ন ধারার বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই ধারায় লুম্পেন কোটিপতিদের সঙ্গে সঙ্গে লুম্পেন রাজনীতিবিদ ও লুম্পেন আমলার বিকাশ ঘটেছে যারা বৃহৎ কমিশন, বড় আকারের ঘুষের মাধ্যমে অর্থবিত্ত অর্জন করে নতুন শ্রেণিতে উত্তরণ লাভ করছেন। আমলাতন্ত্র বস্তুত দেশি-বিদেশি করপোরেট গোষ্ঠীর সম্প্রসারিত হস্ত। এর সঙ্গে যুক্ত আরেক গোষ্ঠীর কথা বলা দরকার, এরা লুম্পেন বিশেষজ্ঞ/কনসালট্যান্ট যারা এসব কাজে বৈধতা দিতে নিজের বিশেষজ্ঞ/বুদ্ধিজীবী পরিচয় বিক্রি করে, ধ্বংসের প্রকল্পকে উপকারী প্রকল্প বলে ঘোষণা দেয়, এর বদলে নিজেরাও দ্রুত অর্থবিত্তের মালিক হয়। গত দুই দশকে এদের আকারও বেড়েছে।

করোনাকালে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার অভাবে দুই কোটিরও বেশি মানুষের দারিদ্র্যসীমার নিচে পতন ঘটেছে। ঠিক একই সময়ে দেশের মাথাপিছু গড় আয় বৃদ্ধি স্পষ্টত দেখায় যে, সংখ্যাগরিষ্ঠের আয় বিপর্যয় ঘটলেও কিছু লোকের হাতে আয় বাড়ছে অনেক উঁচু হারে। ধনিক গোষ্ঠীর সম্পদ প্রবৃদ্ধিতে বিশ্ব রেকর্ড, অর্থনীতিতে চোরাই টাকার অনুপাত বৃদ্ধি, বৈষম্যবৃদ্ধি, স্বাস্থ্যব্যবস্থার করুণ দশা, উন্নয়ন বা পরিবেশ বিপর্যয় থেকে সৃষ্ট উদ্বাস্তুসংখ্যা ও নগর দারিদ্র্য বৃদ্ধি, টেকসই কর্মসংস্থানের হ্রাসপ্রাপ্তি এবং অনিরাপদ-অনিশ্চিত-কম মজুরির কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, যৌনবাণিজ্য ও নিপীড়ন, মাদক সাম্রাজ্যের বিস্তার, শিক্ষা ও চিকিৎসার অধিকতর বাণিজ্যিকীকরণের কারণে ব্যয়বৃদ্ধি, দখল বা সরকারি আয়োজনে বন-নদীসহ সর্বজনের সম্পদের ওপর মুনাফাভিত্তিক ব্যক্তিমালিকানার বিস্তার, সম্পদের অবিরাম পাচার, সর্বজন পরিবহনের দুরবস্থা ও ব্যক্তিগত গাড়ির রাস্তা দখল ইত্যাদি বাংলাদেশের পুঁজিবাদের উচ্চ প্রবৃদ্ধির অন্তর্গত গতিমুখের একেকটি চিহ্ন।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সর্বজনের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হলে এই গতিমুখ বদলাতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়লেখক এবং সর্বজনকথা’র সম্পাদক 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত