১৯৭৩-এর সেপ্টেম্বর মাসে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেছি। বাসা খুঁজতে গিয়ে আবাসন শাখার পরিচালক মিসেস মরিসনের মুখোমুখি হলাম। টেলিফোনে বাসা খোঁজা শুরু হলো। বাসা পেলাম। মিসেস মরিসন বলেছিলেন, বাংলাদেশ থেকে আসা এক তরুণ দম্পতির জন্য বাসার প্রয়োজন। ওপ্রান্তে বাসার মালিক বয়স্ক ভদ্রমহিলা প্রশ্ন করেছিলেন, বাংলাদেশ কী? মিসেস মরিসনকে বলতে শিখিয়ে দিলাম, এটা শেখ মুজিবের বাংলাদেশ। ওপ্রান্তের মহিলা তখন বাংলাদেশ চিনলেন, বললেন, মহান নেতার মহান দেশ। ভাবলাম, দেশ অজানা, কিন্তু দেশের জনক জানা। অন্যরকম অনভূতি সত্ত্বেও সেদিন বুক গর্বে ফুলে উঠেছিল- গর্বিত দেশের আত্মগর্বী নাগরিক। বুঝলাম, বাংলাদেশ নামের মাহাত্ম্য। বাংলাদেশ আমাকে আত্মপরিচয় দিয়েছে, পেয়েছি লাল-সবুজ পতাকা ও সবুজ পাসপোর্ট। বিশ্ব ঢুঁড়ে আমি বলতে পারি, আমি শৃঙ্খলমুক্ত, স্বাধীন, সার্বভৌম। আমার অন্তরে সতত গুঞ্জরণ, বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ।
এখন প্রশ্ন হলো: বাংলাদেশ পেয়ে আমাদের যা করার ছিল, তা কি করতে পেরেছি? ১৯৭২-এর ১২ অক্টোবর, বঙ্গবন্ধু গণপরিষদে বলেছিলেন, স্বাধীনতা মানে দায়িত্বশীলতা। আমি আশ্চর্য হয়ে যাই, একই কথা বলেছিলেন নন্দিত মার্কিন ইতিহাসবিদ হানাহ আরেন্ডট তার ‘ফ্রিডম’ প্রবন্ধে, ‘ফ্রিডম মিন্স রেসপনসিবিলিটি।’ বঙ্গবন্ধু কি প্রবন্ধটি পড়েছিলেন? কোনো প্রমাণ নেই। তার বিস্তর পাঠ ছিল; পড়তেও পারেন, না-ও পারেন। তবে স্বীকার্য, দুজনের চিন্তায় অভিন্নতা ছিল। মহান মানুষরা এমনই হন। এখন প্রশ্ন : আমাদের দায়িত্ব কতটুকু পালন করেছি পঞ্চাশ বছরে?
দায়িত্বের পরিসীমা ও প্রকৃতি বুঝতে হলে আগে জানা দরকার, স্বাধীনতার কাছে আমাদের প্রত্যাশা কী ছিল? জানা কথা, ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার আগে মুক্তির কথা বলেছিলেন; মুক্তির কথা একাধিকবার বলা হয়েছিল। বোধগম্য, স্বাধীনতার দূরলক্ষ্য ছিল সার্বিক মুক্তি, যা আমার বিবেচনায় আজও অধরা। মুজিবনগর সরকার ১০ এপ্রিল ১৯৭১, প্রচার করেছিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, তাতে স্বাধীনতার কাছে তিনটি প্রত্যাশা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার, যার কোনো একটিও পঞ্চাশ বছরে অর্জন করতে পেরেছি বলে মনে হয় না। জানি, লক্ষ্য তিনটি কম সময়ে অর্জিত হওয়ার নয়, কিন্তু লক্ষাভিসারীও নই তো আমরা। স্বাধীনতা ঘিরে যে কোনো মানুষের যে স্বপ্ন-নির্মাণ হয়, তা তো কিউবার লড়াকু সৈনিক-কবি হোসে মার্তি বলেছেন
আমরা মুক্ত, শয়তান হওয়ার জন্য তো নয়
আমরা মুক্ত, মানুষের দুর্ভোগে নির্লিপ্ত থাকার জন্যও নয়
নয় মানুষের শ্রমে নিজের আখের গোছানোর জন্য
নয় চুপচাপ স্থির চোখে তাকিয়ে দাসত্ব দেখার জন্য
আমাদের বলতেই হবে ‘না’ আবার।
হোসে মার্তি স্বাধীনতা মানে শোষণ-বঞ্চনাহীন এক মানবিক জগতের স্বপ্ন ধারণ করেছিলেন। এমন স্বপ্ন বাংলাদেশ ঘিরে বঙ্গবন্ধুসহ আমাদেরও ছিল। কিন্তু সেই বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩-এ কবিতা (তার ভাষায় ‘গবিতা’) লিখে বললেন,
আমার কবিতা নীরবে নিভৃতে কাঁদে
বাংলার ভদ্রলোকেরা চুরি করে
আর মানুষ ঠকায় ফেলে ফাঁদে।
আমি লাল ঘোড়া দৌড়াতে চাই
বুকে পাই ব্যথা
দেশটাকে লুটেপুটে খাওয়ার
জন্য এনেছি কি স্বাধীনতা?
স্বাধীনতা আমাদের স্বপ্নতাড়িত করেছিল, কিন্তু স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় দীর্ণ হতে সময় লাগেনি; বঙ্গবন্ধুর কবিতাই তার প্রমাণ। কিন্তু স্বপ্নের শেষ নেই, স্বপ্ন আজও ধরা আছে, থাকবেও। মানুষ আমৃত্যু স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নের ভেতর না বাঁচলে জীবন পানসে হয়ে যায়। বিগত পঞ্চাশ বছরে আমাদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি বঙ্গবন্ধুকে স্বজন-পরিজনসহ হারানো। এ ক্ষতি অপূরণীয়। কিন্তু তবু আমরা স্বপ্ন দেখি, আমরা যেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সমান হতে পারি।
গত অর্ধ শতকে বাংলাদেশ বদলে গেছে। এগিয়েছেও অনেক। পেছনে ফেলেছে ভারত ও পাকিস্তানকে; এবং তা প্রবৃদ্ধি ও আর্থ-সামাজিক সূচকে। মাথাপিছু আয়ে আমরা আড়াই হাজার ডলারের ঘরে, যা ভারত-পাকিস্তানের নেই। কিসিঞ্জারের ভাষায় যে দেশটি তলাবিহীন ঝুড়ি হওয়ার কথা, তার ঝুড়ি তো এখন উপচে পড়ছে। আমরা শিগ্গির স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হতে যাচ্ছি। আমাদের অর্জন আমাদের আত্মগর্বী করে। কিন্তু তবুও কোথাও যেন কিছু কিন্তু আছে।
প্রথম কিন্তু মাথাপিছু আয়ের হিসাব। এ যেন এক বিরাট শুভঙ্করের ফাঁক। আমাদের মধ্যবিত্তের/নিম্নবিত্তের মাথাপিছু আয় কি আড়াই হাজার ডলার? অর্থনীতির এমন পদ্ধতি পুঁজিবাদের তৈরি, যা দিয়ে বিত্তবানকে বোঝা যায়; নিম্নবিত্ত বা বিত্তহীনকে নয়। দেশে তো নগ্ন পুঁজিবাদ চলমান। বঙ্গবন্ধু সমাজতন্ত্র করতে চেয়েছিলেন; করতে দেওয়া হলো না, তাকে হত্যা করা হলো, সমাজতন্ত্রকেও। সংবিধানে অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি সমাজতন্ত্র আছে; কিন্তু তা তো কাজির গরু, খাতায় আছে, গোয়ালে নেই। দ্বিতীয় কিন্তু বৈষম্য; যা ছিল এবং যা বাড়ছে, করোনার ছোবলে বৈষম্য আরও বেড়েছে। সরকার প্রণোদনা দিয়েছে, কিন্তু প্রান্তিক মানুষ কিছুই পায়নি। সরকার এক্ষেত্রে এত উদার যে, প্রণোদনার তালিকায় কওমি মাদ্রাসাও বাদ যায়নি। অথচ জানা আছে কওমি মাদ্রাসা সম্পূর্ণ মুক্তিযুদ্ধবিরোধী। যারা বাংলাদেশে অবিশ্বাসী, তারা প্রণোদনা পায় কী করে? যাহোক, তাজউদ্দীনের বাজেটে দরিদ্র কমানোর উদ্যোগ ছিল। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত বাজেট আমলাতান্ত্রিক আয়-ব্যয়ের হিসাব মাত্র, যাতে দারিদ্র্য কমানোর কোনো দিকনির্দেশনা নেই। উপরন্তু মনে রাখতে হবে তাজউদ্দীন নিজে ছিলেন সমাজতন্ত্রী, এবং অর্থনীতির মেধাবী মানুষ।
তৃতীয় কিন্তুটি দ্বিতীয় কিন্তুর সঙ্গে সম্পৃক্ত। বৈষম্য বজায় রেখে কখনো উন্নয়ন হয় না। উন্নয়ন মানে সমতাভিত্তিক প্রবৃদ্ধি। সুতরাং বাংলাদেশ যা অর্জন করেছে, তা প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন নয়। তবে প্রবৃদ্ধি উন্নয়নের পূর্বশর্ত, যা অর্জনে বাংলাদেশের কৃতিত্ব স্বীকৃত ও নন্দিত। সুতরাং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চালচিত্র সম্পর্কে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বয়ানের বিপরীতে অবস্থান গ্রহণ করতে হচ্ছে বলে দুঃখিত।
যত কিন্তুই থাক, আমাদের অর্থনীতি এগিয়েছে। বিপরীতে কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, রাজনীতি পিছিয়েছে, প্রতিদিনই পিছিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ রাজনীতিহীন দেশ। গণতন্ত্রও প্রশ্নাতীত নয়। গণতন্ত্র চলে দুই চাকার সাইকেলে- তার দুই চাকা সরকার ও বিরোধী দল। বর্তমানে সংসদীয় বিরোধী দল বিরোধী দল হিসেবে বিবেচ্য নয়। অন্যদিকে বিএনপি ও জাতীয় পার্টি বৈধতার প্রেক্ষাপটে প্রশ্নবিদ্ধ; কারণ সেনা ছাউনিতে তাদের জন্ম। সেনা ছাউনিতে কোনো রাজনৈতিক দলের জন্ম হতে পারে না। সুতরাং রাজনীতি ও অর্থনীতির মধ্যে এক বৈপরীত্য দৃশ্যমান; যা নিরসন না হলে অদূর ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হুমকির মুখে পড়বে।
বাংলাদেশের বৈষয়িক প্রবৃদ্ধি চোখ ধাঁধানো; কিন্তু বিপরীতে যাদের জন্য এত প্রবৃদ্ধি সেই মানুষ অনুন্নত হয়েছে ক্রমাগতভাবে। সাম্প্রতিক বাংলাদেশ মনুষ্যত্বহীনতার দেশ। অপরাধচিত্র তাই বলে। ইমাম গাজ্জালির বিবেচনায় কোনো দেশের শিক্ষক ও চিকিৎসক অপকর্ম করলে বুঝতে হবে দেশটি রসাতলে গেছে। আমরাও কি রসাতলে যাইনি? রবীন্দ্রনাথ তো অনেকদিন আগে, যখন বাঙালি সাত কোটি ছিল, তখন বিধাতার কাছে অনুযোগ করেছিলেন, “রেখেছ বাঙালী করে, মানুষ করোনি।” আমাদের প্রধান কবি শামসুর রাহমান ২০০৪ এ আক্ষেপ করেছিল
“কে আমাকে বলে দেবে কতদূর গেলে খাঁটি কোনও
মানুষের দেখা পাব? এখন আমার
আশেপাশে খল, ভন্ড আর ষোলোআনা স্বার্থপর লোক আসা-যাওয়া করে।” (এ কেমন কালবেলা)
কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতায় আছে চাঁচাছোলা পঙ্ক্তি
“মুখের চাইতে মুখোশই এখন
বাঁশের চাইতে কঞ্চির মতো বড়।”
(সৎশাসকের খোঁজে বাংলাদেশ)
বঙ্গবন্ধুর “সোনার মানুষ” তো এখন অঙ্গুলিমেয়, সমাজে/রাষ্ট্রে যাদের কোনো ভূমিকা নেই। কাজেই রবীন্দ্রনাথের মতো বিধাতার কাছে আমাদেরও আকুল আবেদন
পুণ্যে পাপে, দুঃখে সুখে, পতনে উত্থানে
মানুষ হইতে দাও তোমার সন্তানে।”
গত পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশ থেকে যা পেলাম, তা কম কীসে? যা পেলাম না তার জন্য উচাটন থাকবে, থাকবে দুর্মর আকাক্সক্ষাও এবং তা তাদের জন্য, যাদের যাপিত জীবন ছিল মুক্তিযুদ্ধলগ্ন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রূপায়নের দলিল ছিল সংবিধান, যা এখন ক্ষতবিক্ষত; মূল চেতনায় থিতু নেই। এটা মানতেই হবে, বাংলাদেশ এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। বাংলাদেশের এমন আদর্শিক চ্যুতি, বাস্তববাদী রাজনীতির শাক দিয়ে মাছ ঢাকলেও, তা আসলে বেদনা জাগানিয়া। বেশি কথা না বলে শুধু রাষ্ট্রধর্মের কথা বলি। আমার সীমিত বোধ-বুদ্ধি বলে, রাষ্ট্রধর্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে যায় না। যায় না ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গেও (যা অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে বিদ্যমান)। তেলে-জলে তো মেলে না। রাষ্ট্রধর্ম ইসলামবিরোধী (দ্রষ্টব্য পবিত্র কোরআন ও মদিনা সনদ)। রাষ্ট্রধর্ম বঙ্গবন্ধুবিরোধী (দ্রষ্টব্য ১০ জানুয়ারি ১৯৭২-এর রেসকোর্স ভাষণ)।
তবুও আমার বাংলাদেশ নিয়ে বিশ্বাস হারাতে চাই না। কারণ রবীন্দ্রনাথ আমাকে শিখিয়েছেন, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।’
লেখক : বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনাল্স (বিইউপি)
