জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কমিটি সর্বশেষ হয়েছিল পাঁচ বছরের বেশি সময় আগে। সংগঠনটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এই কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল তার এক বছর পরই। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এখনো বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ছাত্রলীগের নতুন কোনো কমিটি হয়নি। এমনকি মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিটি পূর্ণাঙ্গ হয়নি দীর্ঘ সময়ে। ওই কমিটিতে যারা আছেন তাদের বেশিরভাগই যথেচ্ছার আচরণ করেন ক্যাম্পাসে। তবে যথেচ্ছারে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. রাকিবুল হাসান রাকিব। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ শিক্ষক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের হয়রানির অভিযোগ নিত্যকার ঘটনা। সর্বশেষ বিজয় দিবস উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে বিশেষ খাবার নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়েছেন তিনি। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র সমালোচনায় পড়েছে ছাত্রলীগ। গুঞ্জন উঠেছে, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি বাতিলেরও।
তবে বিভিন্ন সময়ে শাখা ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে যে সমালোচনা হয় তা পাত্তা দিতে নারাজ রাকিবুল হাসান রাকিব। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কাজ করতে গেলে এরকম হতেই পারে। তা নিয়ে সমালোচনার কিছু নেই।’ রাকিব বলেন, ‘ছাত্র রাজনীতি করি। আলোচনা-সমালোচনা হবেই। আর আমি আমার কাজ করেই যাব যতদিন দায়িত্বে আছি। কে কী বলল তা শুনলে কিছুই হবে না।’
একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে সাধারণ সম্পাদকসর্বস্ব বলতেও নারাজ রাকিব। তিনি বলেন, ‘আমি কাজ করি তাই এমন মন্তব্য। আমার কাজ দিয়েই আমার অবস্থান। যারা আমায় পছন্দ করে আর যারা করে না তাদের মতে বিভিন্ন কিছুই হতে পারে। তবে আমি শুধু দায়িত্বটাই বুঝি।’
তবে নতুন কমিটি কেন হচ্ছে না সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি রাকিব। উল্টো দাবি করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের ১৫ দিনের মধ্যে অগ্নিবীণা ছাত্র হলের কমিটি এবং দুই মাসের মধ্যে দোলনচাঁপা ছাত্রী হলের কমিটি করে দিয়েছিলেন তিনি ও সভাপতি নজরুল ইসলাম বাবু। সে সময় কলা অনুষদ সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, বিজ্ঞান অনুষদ ও ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের কমিটিও গঠন করে দেন তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওইসব কমিটির অনেকেরই এখন ছাত্রত্ব নেই। কিন্তু ছাত্রলীগের কমিটিতে তারা এখনো নেতা! এদের মধ্যে একজন কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ইসমত জাহান হিমি। ২০১৯ সালে শেষ হয় তার স্নাতকোত্তর শ্রেণির পড়াশোনা। হিমি বলেন, ‘সংগঠন গতিশীল রাখতে নির্ধারিত সময়ে ছাত্রলীগের সম্মেলন করা জরুরি। এতে করে কর্মীরা সক্রিয় থাকে। আমাদের ছাত্রলীগও ভালো থাকে। নতুবা পরিচয় না পাওয়ায় রাজনীতি থেকে সরে যেতে চায় অনেকেই। আবার অনেকে দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকায় স্বেচ্ছাচারী হয়। রেগুলার কমিটি হলে নতুন নেতৃত্ব আসবে, সংগঠন সমৃদ্ধ হবে।’
অন্যদিকে কমিটির আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাজমুস সাকিবের পড়াশোনা শেষ করার পরও এখনো রয়েছেন দায়িত্বে। চাকরিতে থাকা সুদর্শন আইচও রয়েছেন এই কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। এর মধ্যে অবশ্য সহসভাপতি তানভীর আহমেদ পাপ্পু কমিটি থেকে আগেই পদত্যাগ করেছেন। তার পদত্যাগে ক্যাম্পাসে নতুন কমিটির দাবি উঠেছে নতুন করে। আর সবশেষ রাকিবের ফিস্টকাণ্ড সেই দাবিকে জোরালো করেছে।
রাকিবের ফিস্টকাণ্ডে হল প্রভোস্টসহ পাঁচ শিক্ষক পদত্যাগ করেছেন। গত বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বরাবর পদত্যাগ করেন হাউজ টিউটর আফরোজা আক্তার লিপি, ফারজানা খানম, আরিফুর রহমান, রাশেদুর রহমান এবং হল প্রভোস্ট সিরাজাম মনিরা।
শিক্ষকরা জানান, বিজয় দিবসে দুপুরের খাবার খাওয়ানোর ব্যবস্থার অর্থের পরিমাণ নিয়ে সোমবার তর্কাতর্কি হয় ছাত্রী হলের হল প্রভোস্ট এবং শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে। বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে হলের সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য শুধু দুপুরের খাবারের আয়োজন করার ব্যবস্থা করেছিল ছাত্রী হলের প্রশাসন। তবে এতে আপত্তি জানিয়ে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাকিব বলেন, দুই হলের সমন্বয় করে যারা আয়োজনে থাকবে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। সেটি তিনি বাস্তবায়ন করবেন। সে সময় তিনি হল প্রভোস্টকে দেখে নেওয়ার হুমকিও দেন। এর প্রতিবাদেই শিক্ষকরা হলের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন। জরুরি সভা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি। সমিতির এক সদস্য বলেন, শিক্ষকদের ওপর এক প্রকার খবরদারি করা রাকিবের যেন রুটিন ওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। দেয়ালে আমাদের পিঠ ঠেকে গেছে। এর সমাধান না হলে শিক্ষকরা আর চুপ থাকবেন না।
পরে গত বৃহস্পতিবার হুমকির ঘটনার তদেন্ত পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমেদুল বারীকে আহ্বায়ক করে এবং আইন ও বিচার বিভাগের প্রধানকে সদস্য সচিব করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মহির উদ্দিন, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছাত্রী হলের প্রভোস্ট নুসরাত শারমিন তানিয়া এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. সাহাবউদ্দিন।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি নিয়ে কেন্দ্রীয় সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় এবং সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে একাধিকবার বার্তা প্রেরণ ও কল দিলেও কোনো সাড়া মেলেনি।
