নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সংলাপ শুরু হচ্ছে আগামীকাল সোমবার থেকে। সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) সঙ্গে এ দিন বিকেল ৪টায় বৈঠকের মধ্য দিয়ে এ সংলাপ শুরু হবে। এরপর আগামী বুধবার জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ-ইনু) সঙ্গে আলোচনা হবে। আজ-কালের মধ্যে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী এবং সংসদের বাইরে দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপিকে সংলাপের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হবে বলে বঙ্গভবন সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এদিকে গতকালও বিএনপির মহাসচিবসহ কয়েকজন নেতা ইসি গঠনে রাষ্ট্রপতির সংলাপের সমালোচনা করেছেন। পাশাপাশি দলটির শীর্ষ নেতারা রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণ পেলেও সংলাপে যাবেন না, এমন জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন। তবে বিএনপি ছাড়া এখনো অন্য কোনো রাজনৈতিক দল সংলাপে আমন্ত্রণ পেলে যাবে না এমন মন্তব্য করেনি; বরং সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দল এবং অন্য রাজনৈতিক দলের নেতারা বলছেন, তারা সংলাপে আমন্ত্রণের অপেক্ষা করছেন। আমন্ত্রণ পেলে নিজেদের প্রস্তাবগুলো তুলে ধরবেন।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘আগে তো আমন্ত্রণ পাই। আমন্ত্রণ পেলে সিদ্ধান্ত জানাব।’
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘আমরা আগেও বলেছি নির্বাচন কমিশন গঠনে সংবিধানে যে আইনের কথা বলা হয়েছে তা যেন করা হয়। আর রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণ পেলে আমরা আমাদের প্রস্তাব তুলে ধরব। এখনো আমন্ত্রণ পাইনি।’
রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. জয়নাল আবেদীন গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘প্রথমে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করার কথা রয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে নিবন্ধিত দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা হবে।’ তিনি জানান, গতকাল পর্যন্ত দুটি দল জাপা ও জাসদকে (ইনু) আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছে। সংলাপ আয়োজনের জন্য বঙ্গভবন প্রস্তুত।
সার্চ কমিটির মাধ্যমে ইসি গঠন নিয়ে বিএনপির সমালোচনা এবং সংলাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়ে জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘আজ-কালের মধ্যে বিএনপির কাছে সংলাপের জন্য রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণ পাঠানো হবে।’
কয়টি রাজনৈতিক দলকে আমন্ত্রণ জানানো হবে এবং কত দিন সংলাপ চলবে—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গতবার ইসি গঠনের সময় ৩১টি দলের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবারও এই ৩১ দল তো রয়েছেই। তবে শেষ পর্যন্ত কতটি দল হবে তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। চূড়ান্ত হয়ে গেলে আমন্ত্রিত দলগুলোকে দাওয়াত কার্ড পাঠাব। জাতীয় পার্টি যেহেতু বিরোধী দল, তাই তাদের দিয়েই এ সংলাপ শুরু হবে। নিবন্ধিত দল ৩৯টি হলেও অনেক ছোট ছোট দলের আগ্রহ না থাকায় গতবার তাদের সঙ্গে সংলাপ হয়নি।
এ প্রসঙ্গে জাপা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু দেশ রূপান্তরকে বলেন, তারা সংলাপের আমন্ত্রণ পেয়েছেন। রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণ জাপা গ্রহণ করেছে। তিনি আরও বলেন, ‘আজ বা আগামীকাল দলীয়ভাবে আমরা বৈঠক করব, আলোচনার বিষয় এবং প্রস্তাবনাগুলো ঠিক করব। আমরা রাষ্ট্রপতির এই আমন্ত্রণকে ইতিবাচকভাবেই দেখছি।’
রাষ্ট্রপতির এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু। তিনি গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সংলাপে অংশ নেব। দলের পক্ষ থেকে ৭ সদস্যের প্রতিনিধিদলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সংলাপে দলের প্রস্তবনাগুলো তুলে ধরা হবে।’
বঙ্গভবন সূত্রে জানা গেছে, নতুন ইসি গঠনে নিবন্ধিত দলগুলোর সঙ্গেই রাষ্ট্রপতি আলোচনা করবেন। আলোচনা শেষে আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে সার্চ কমিটি গঠন করবেন রাষ্ট্রপতি। এতে হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি, মহাহিসাব নিরীক্ষক, নিয়ন্ত্রকসহ (সিএজি) দু-তিনজন বিশিষ্ট নাগরিক থাকবেন।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান ইসির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ১৪ ফেব্রুয়ারি। বর্তমান কমিশনের মেয়াদ শেষে নতুন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটি গঠন হবে আগামী বছরের জানুয়ারি মাসে। সার্চ কমিটির বাছাই করা তালিকা থেকেই নতুন ইসি গঠন হবে। নতুন ইসির অধীনেই হবে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন। তবে গতবারের মতো এবারও আইন করে নতুন ইসি গঠনের দাবিতে সোচ্চার ছিল বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। বিএনপি ইসি গঠনে বরাবরই বলে আসছে, তারা এভাবে গঠিত কমিশনের অধীনে নির্বাচন করবে না।
সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে বলা আছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে নিয়ে একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং এ বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধান সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগ দেবেন।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করে ২০১২ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান একটি সার্চ কমিটি গঠন করেন। তাদের মনোনীত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেন নির্বাচন কমিশন। এরপর ২০১৭ সালে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদও একই পদ্ধতি অনুসরণ করেন। তবে ২০১২ সালে চার সদস্যের পরিবর্তে ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করা হয়।
২০১২ সালে নতুন ইসি গঠনের আগে রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেন। ২২ জানুয়ারি গঠন করা হয় সার্চ কমিটি। সে সময় সার্চ কমিটির আহ্বানে আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি দল নতুন কমিশনের জন্য তাদের পছন্দের ব্যক্তির নামের তালিকা দিলেও বিএনপি দেয়নি। ২২ জানুয়ারি গঠনের পর ৭ ফেব্রুয়ারি ১০ জনের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে দিয়েছিল সার্চ কমিটি। তাদের মধ্য থেকে পাঁচজনকে ৮ ফেব্রুয়ারি নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। কমিটি রাষ্ট্রপতির কাছে যে সুপারিশ জমা দেয়, তাতে সিইসি ও চার কমিশনার নিয়ে পাঁচটি পদের জন্য ১০টি নাম আসে। তার মধ্য থেকেই পাঁচজনকে বেছে নেন রাষ্ট্রপতি।
কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন ইসি গঠনের আগে ২০১৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর সংসদের বাইরে থাকা বিএনপির সঙ্গে কমিশন গঠন নিয়ে সংলাপ শুরু করেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। এক মাস ধরে ৩১টি দলের সঙ্গে চলা ওই সংলাপ ২০১৭ সালের ১৮ জানুয়ারি শেষ হয়। সার্চ কমিটি গঠন করার পর সে বিষয়ে প্রজ্ঞাপন দেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ওই কমিটির কাজের সাচিবিক দায়িত্বও থাকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের হাতে। সিইসি কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন এ কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেন মাহবুব তালুকদার, রফিকুল ইসলাম, কবিতা খানম ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী। আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি তাদের মেয়াদ পাঁচ বছর পূর্ণ হবে।
সংবিধান অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির হাতে। গেল এক দশকে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান ২০১২ সালে এবং বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ২০১৭ সালে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করে সার্চ কমিটির মাধ্যমে সর্বশেষ দুই নির্বাচন কমিশন নিয়োগ দিয়েছিলেন।
