পুঁজিবাজারের উন্নয়নে নীতিনির্ধারণী বেশ কিছু বিষয় সংস্কারে বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তি রয়েছে। গত কয়েক মাস ধরেই পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগে কড়াকড়ি আরোপ, বিনিয়োগ ক্রয়মূল্যের পরিবর্তে বাজারমূল্যে হিসাব করা, সাতটি ব্যাংকের বন্ড অনুমোদন না দেওয়া, বন্ডকে ক্যাপিটাল এক্সপোজারের বাইরে রাখাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) সঙ্গে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের। আর এর প্রভাবে পুঁজিবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, লোকসানে পড়ছেন বিনিয়োগকারীরা। ব্যাংক কোম্পানির তিন দশকের পুরনো আইনে সংস্কার না আনায় পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আগের সপ্তাহের ধারাবাহিকতায় চলতি সপ্তাহের শুরু দিনও বড় পতন দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। গতকাল দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) কেনাবেচা হওয়া প্রায় ৬৮ শতাংশ শেয়ারের দরপতনে প্রধান মূল্যসূচক কমেছে ৮৫ পয়েন্ট। বিনিয়োগকারীদের সতর্ক পদক্ষেপে লেনদেনের অঙ্কও হাজার কোটি টাকার নিচে নেমে এসেছে। আগের সপ্তাহের চার কার্যদিবসের মধ্যে তিন দিনই পতন ধারায় ছিল বাজার পরিস্থিতি। দেশের অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) সিএএসপিআই সূচক ৩৩৬ পয়েন্ট কমেছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত ১০ অক্টোবর ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ৭৩৬৭ পয়েন্টে যাওয়ার পর থেকেই অস্থিরতা দেখা দেয়। পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কড়াকড়ি আরোপে দরপতন দেখা দেয়। পুঁজিবাজার পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে এসইসির আলোচনা হলেও কোনো সমাধান না আসায় বিনিয়োগকারীরা হতাশ হয়ে পড়েন। এ সময় বিনিয়োগকারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শেয়ার বিক্রি করে সাইডলাইনে ফিরে যান। ফলে লেনদেনও ধারাবাহিকভাবে কমতে শুরু করে।
গত ১০ অক্টোবরের পর ডিএসইর প্রধান সূচকটি কমেছে প্রায় ৮ শতাংশ। এ সময় বেশিরভাগ শেয়ারের দর কমলেও ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দরবৃদ্ধি সূচকের আরও পতন থেকে রক্ষা করেছে। উল্লিখিত সময়ে উৎপাদনমুখী খাতের দর ব্যাপক হারে কমেছে। গতকালের দরপতনের পর ডিএসইর প্রধান সূচকটি নেমে এসেছে ৬৭৮৩ পয়েন্টে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এসইসি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মতবিরোধ ছাড়াও ব্যাংকের হিসাব বছর শেষ হয়ে আসাও বাজার অস্থিরতার জন্য দায়ী। এ সময় মূলধনী মুনাফা দেখাতে ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে শেয়ারের বিক্রি চাপ রয়েছে। ব্যক্তিশ্রেণির বড় বিনিয়োগকারীদের উল্লেখযোগ্য অংশ সাইডলাইনে থাকায় লেনদেনের পরিমাণও ৬০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হয়েছে ৭৮৬ কোটি টাকা, যেখানে তিন মাস আগেও লেনদেন ছিল দুই হাজার কোটি টাকার বেশি। গত সপ্তাহের চার কার্যদিবসে গড়ে প্রতিদিন ৯৩৩ কোটি টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছিল।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গতকালের দরপতনে প্রধান ভূমিকা ছিল বড় মূলধনী শেয়ারের দরহ্রাস। স্কয়ার ফার্মা, বেক্সিমকো ফার্মা, বেক্সিমকো লিমিটেড, বিএটি বাংলাদেশ, ব্র্যাক ব্যাংক, আইএফআইসি, লাফার্জহোলসিম, ফরচুন সুজ, অলিম্পিক, বিএসআরএম লিমিটেডের শেয়ারের দর কমে যাওয়ায় সূচকে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে। এসব কোম্পানির শেয়ারের দরহ্রাসে ডিএসইর প্রধান সূচকটি কমেছে প্রায় ৪০ পয়েন্ট। এরমধ্যে স্কয়ার ফার্মা একাই ডিএসইর সূচকটি সাড়ে ৭ পয়েন্ট কমিয়েছে।
গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ৩৭৮ সিকিউরিটিজের মধ্যে দর বেড়েছে ৮৭টির, কমেছে ২৬৬টির ও অপরিবর্তিত ছিল ২৫টির দর। খাতওয়ারি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গতকাল সাধারণ বীমা এবং কাগজ ও প্রকাশনা ছাড়া অন্যসব খাতের বাজার মূলধন কমেছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি দর কমেছে ট্যানারি ও পাট খাতের। এ দুই খাতের বাজার মূলধন কমেছে ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ হারে। তবে খাতওয়ারি হিসেবে সূচক কমাতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে ব্যাংক খাত। গতকাল ব্যাংকের বাজার মূলধন কমেছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ। ব্যাংক খাতের তালিকাভুক্ত ৩২ কোম্পানির মধ্যে ২৮টিরই দর কমেছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের ২২ কোম্পানির মধ্যে ২০টিই দর হারিয়েছে। গতকাল একদিনে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
একই চিত্র উৎপাদন ও সেবামুখী খাতেও দেখা গেছে। যেমন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের ২৩ কোম্পানির মধ্যে ২১টির, প্রকৌশল খাতের ৪২ কোম্পানির মধ্যে ৩৩টির, ওষুধ ও রসায়ন খাতের লেনদেন হওয়া ৩০ কোম্পানির মধ্যে ২২টির, বস্ত্র খাতের ৫৮ কোম্পানির মধ্যে ৫০টিই দর হারিয়েছে। বিপরীতে বীমা খাতের ৫২টি শেয়ারের মধ্যে ৪৪টির দর বাড়তে দেখা গেছে।
