সরকারের বার্ষিক বাজেটে মোট বরাদ্দের অর্ধেকের চেয়েও বেশি খরচ করা হয় উন্নয়ন খাতে। সেই উন্নয়ন খাতে মালামাল কেনাকাটা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সরকারের একেক সংস্থা একই ধরনের পণ্য কেনে নিজেদের ইচ্ছামাফিক দরে। দাম কমবেশি হওয়ার কারণে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় হয়। এর মূল কারণ হিসেবে বলা হয়ে থাকে, সংস্থাগুলোর মালামাল কেনাকাটার জন্য যে দর তফসিল (রেট শিডিউল) তা নিজেরাই তৈরি করে। আবার শত শত কোটি টাকা খরচের দর তফসিল অনুমোদনও সংস্থার প্রধান করে থাকেন। সেই দর তফসিলে প্রায় ১ হাজার ৮০০ উপকরণের মধ্যে পাঁচ শতাধিকই এক ধরনের পণ্য। এসব পণ্য সংস্থাগুলো বছরের পর বছর ধরে ভিন্ন দামে কিনছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এবার সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে দর তফসিলের অস্পষ্টতার নামে অর্থ অপচয় রোধে শক্ত অবস্থান নেওয়া হয়েছে। উপকরণ কেনার ক্ষেত্রে সংস্থাগুলো দর তফসিল তৈরি করে অর্থ বিভাগে পাঠাবে। এই তফসিল চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে অর্থ বিভাগ। এই অনুমোদন প্রক্রিয়ায় বাজারদর যাচাই করে সব সংস্থাকে অভিন্ন পণ্য কেনার জন্য একই দর বেঁধে দেওয়া হবে। এর মধ্য দিয়ে সরকারি ক্রয়পদ্ধতি ও আর্থিক ক্ষমতা ব্যবস্থাপনায় অনেকটাই শৃঙ্খলা ফিরে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও অর্থ বিভাগ থেকে পাওয়া দাপ্তরিক কাগজপত্রে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
অর্থ বিভাগে সিনিয়র সহকারী সচিব চৌধুরী আশরাফুল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশে সব দপ্তরের রেট শিডিউল এক করার উদ্যোগ বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। একই উপকরণ দেখা যাচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন দামে কেনা হচ্ছে। এখন আর সেই সুযোগ থাকছে না। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ের রেট শিডিউল অর্থ বিভাগ থেকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বাকি সংস্থাগুলোও এ প্রক্রিয়ার আওতায় আসবে।’
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে সংস্থাগুলো রেট শিডিউল নিজেরা তৈরি করত। এখন সরকার যেহেতু সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে চূড়ান্ত অনুমোদন নিতে হবে; আমরা তাই করব। আমাদের (গণপূর্ত অধিদপ্তর) সিভিল, ইএম ও স্যানিটারি আইটেম বাড়বে। শিডিউল তৈরির কাজ দ্রুত শেষ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে চিঠি দেওয়া হবে।’
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলছেন, গত বছর এক সভায় সরকার প্রধান রেট শিডিউল তৈরিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নিজের কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন। সেখানে তিনি অর্থ বিভাগ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে বেশ কিছু দিকনির্দেশনা দিয়ে কাজ শুরু করতে বলেন। যেখানে প্রকল্পে অর্থ ব্যয়, ভেরিয়েশন (ব্যয় বৃদ্ধি), নিজ উদ্যোগে অর্থ ব্যয় করে ভূতাপেক্ষা অনুমোদন, প্রকল্পের প্রত্যয়ন দেওয়া, সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিজেদের অভিজ্ঞতার বাইরে গিয়ে কাজ করা, প্রকল্পে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগসহ অনেক বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেন। এরপরই নড়েচড়ে বসে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর। এরই অংশ হিসেবে আগে যেখানে দপ্তরগুলো নিজ নিজ রেট শিডিউল তৈরি ও অনুমোদন করত; এবার তা অর্থ বিভাগ থেকে করা হচ্ছে।
গত ১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ রেলওয়ের দর তফসিল-২০২১ অনুমোদন দেয় অর্থ বিভাগ। সেখানে বলা হয়েছে, ‘প্রাক্কলন প্রণয়নের সময় আইটেমসমূহের বাঙ্ক (পাইকারি) ও রিটেল (খুচরা) মূল্যের মধ্যে পাঁচ কোটি টাকার কম মূল্যমানের প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে খুচরা মূল্য প্রযোজ্য হবে। আইটেমগুলোর স্পেসিফিকেশনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) দেশে প্রচলিত অন্যান্য কোড অনুসরণ করতে হবে। তিন বছরমেয়াদি এ দর তফসিলে প্রাক্কলন প্রণয়ন ও অন্যান্য কাজ সম্পাদনে জেনারেল ফাইন্যান্সিয়াল রুলস (জিএফআর) পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন-২০০৬, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস-২০০৮ প্রতিপালন করতে হবে।’
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কন্সট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রি (বিএসিআই) সভাপতি শফিকুল হক তালুকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কেন্দ্রীয়ভাবে নির্মাণ উপকরণের দাম নির্ধারণ করা হলে এটি হবে একটি মাইলফলক। আমরা চাই সরকারের যেকোনো একটি কর্তৃপক্ষ সব দপ্তরের উপকরণের মূল্য নির্ধারণ করে দিক। এক দেশে একেক দপ্তরের উপকরণের মূল্য ভিন্ন হবে কেন। সরকার চাইলে পণ্যের মূল্য প্রতি বছর হালনাগাদ করতে পারে। যখন বাড়বে তখন বাড়াবে আর যখন কমবে তখন কমাবে। কিন্তু এক অবস্থায় কয়েক বছর রেখে দিলে কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাজ নিয়ে পরে ফেলে রেখে দেয়। এতে সরকারেরও যথাসময়ে কাজ শেষ করতে বিঘ্ন ঘটে। আমরা চাই কাজ চলমান থাকা অবস্থায়ও মূল্য সমন্বয় করার বিষয়টি কর্তৃপক্ষ যেন আমলে নেয়।’
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য উন্নয়ন প্রকল্পের সঠিক ও সময়োচিত বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে চলমান বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বিশেষ করে পূর্তসংক্রান্ত কাজে দীর্ঘসূত্রতা এবং ব্যয় দফায় দফায় ব্যয় বাড়ছে। এতে আর্থিক লোকসান ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হচ্ছে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে পিপিআর অনুযায়ী অর্পিত ক্রয় ও সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি এবং আর্থিক বিধিবিধান সঠিকভাবে মানা হচ্ছে না। এতে প্রকল্প গ্রহণের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে না এবং সরকারি অর্থ অপচয় হচ্ছে। চলতি মাস থেকে সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে কাজ করে যাচ্ছে। বাকি স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, গণপূর্ত অধিদপ্তর, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, সেতু বিভাগ, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তর, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, বিআইডব্লিউটিএ, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ অনেক প্রতিষ্ঠান আগের তৈরি করা দর তফসিল দিয়ে চলছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মশিউর রহমান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন সাপেক্ষে রেট শিডিউল ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের মাঠপর্যায়ে যে কাজগুলো চলমান আছে তা আগের শিডিউল দিয়েই করতে হচ্ছে। আমরা হয়তো নতুন শিডিউল তৈরি করে অর্থ বিভাগ থেকে অনুমোদন নেব।’
