মৌলভীবাজারের জুড়িতে সংরক্ষিত পাথারিয়া বনের লাটি টিলা অংশে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গাছ ও বাঁশঝাড় কেটে বিদেশি দ্রুত বর্ধনশীল আকাশমণি গাছ লাগিয়ে কত্রিম বনায়ন করছে বন বিভাগ। সেখানে ইতিমধ্যে ৭৫ হেক্টর (প্রতি হেক্টর=২.৪৭১০৫ একর) জমির প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো কয়েক হাজার গাছ এবং বাঁশঝাড়ের কয়েক লাখ বাঁশ কেটে আকাশমণিসহ বিদেশি দ্রুত বর্ধনশীল বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগিয়েছে বন বিভাগ। একইভাবে আগামী অর্থবছরেও কয়েকটি প্রকল্পের অধীনে সংরক্ষিত এই বনে বন বিভাগ কৃত্রিম বনায়নের পরিকল্পনা করছে বলে জানতে পেরেছে দেশ রূপান্তর। যদিও বিধি অনুযায়ী সংরক্ষিত বনের শ্রেণি পরিবর্তন করার কথা নয়।
এলাকাবাসী জানিয়েছে, যেসব জায়গায় কৃত্রিম বনায়ন করা হয়েছে তার বেশিরভাগই আগে থেকেই ছিল ঘন বন। সেখানকার গাছ কাটার পাশাপাশি বাঁশঝাড় ও লতাপাতা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলার পর লাগানো হয়েছে গাছের চারা। যদিও বন আইন অনুযায়ী কোনো সংরক্ষিত বনে ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানো দণ্ডনীয় অপরাধ। সংরক্ষিত ওই বনের কেটে ফেলা ফলের গাছ, বাঁশ ও বিভিন্ন লতাপাতা সেখানকার আনুমানিক ২০০ প্রজাতির প্রাণীর খাবারের উৎস ছিল। আর এখন যেসব গাছ লাগানো হয়েছে তাতে পাখিরা বসে না, অন্য প্রাণীরাও আসে না। তবে এলাকাবাসীর কাছ থেকে পাওয়া এসব তথ্যের বিপরীতে বন বিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তারা সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান দিতে পারেননি বা দিতে চাননি।
পরিবেশবিদদের মতে, প্রাকৃতিক বন এভাবে ধ্বংস করে কৃত্রিম বনায়ন করা হলে পরিবেশ তার ভারসাম্য হারাবে। বন্যপ্রাণীর খাবার জোগান দেওয়া প্রাকৃতিক গাছপালা উজাড় করে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কৃত্রিম বনায়ন কার্যক্রমকে লুটপাটের অংশ বলেও মনে করছেন পরিবেশবাদীরা।
জুড়ির সংরক্ষিত পাথারিয়া বনে ২০০ প্রজাতির প্রাণীর বসবাস বলে ধারণা করা হয়। এটি সিলেট বিভাগের একমাত্র বন, যে বনে হাতির দেখা মেলে। মৌলভীবাজারের শহর থেকে ৬০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে এর অবস্থান। পাথারিয়া বনের মধ্যে লাটি টিলার আয়তন ২০ বর্গকিলোমিটার।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় সংরক্ষিত পাথারিয়া বনের প্রাণকেন্দ্র লাঠি টিলা অংশের বেলবাড়ী এলাকায় ৪৫ হেক্টর জায়গায় গাছের চারা লাগায় বন বিভাগ। যার বেশিরভাগই আকাশমণি। এছাড়া একই বিটের সমনভাগ এলাকার বেকি হান্ডরে প্রায় ১৫ হেক্টর জায়গায় ‘জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব নিরসনে সিলেট বিভাগের পুনঃবনায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-উডলট বনায়ন’ নামে একটি প্রকল্পের আওতায় ১৫ হেক্টর জায়গাতে ৩৭ হাজার ৫০০টি গাছের চারা লাগিয়েছে বন বিভাগ। একই বিটে টেকসই বন ও জীবিকা বা সাসটেইনেবল ফরেস্ট অ্যান্ড লাইভলিহুড (সুফল) প্রকল্পের অধীনে আরও ১৫ হেক্টর জায়গায় ৪৫ হাজার ৭৫০টি গাছের চারা লাগিয়েছে বন বিভাগ। যার বেশিরভাগই আকাশমণি। এসব প্রকল্পের অধীনে চিকরাশি, আকাশমণি, গামারি, কালোজাম, কদম ও শিল কড়ইসহ বিভিন্ন গাছের চারা লাগানোর কথা থাকলেও অধিকাংশই লাগানো হয়েছে আকাশমণির চারা। আর এই বনায়নের জন্য প্রাকৃতিকভাবে বনে থাকা নানা জাতের উদ্ভিদ, বনের আদি গাছ ও মুলি বাঁশ কাটা হয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, সংরক্ষিত বনে গাছের চারা লাগানোর জন্য কেটে ফেলা হয়েছে আগে থেকে থাকা প্রাকৃতিক লতাপাতা, উদ্ভিদ এবং বন্যপ্রাণীর খাবার জোগান দেয় এমন সব ফলের গাছ ও বাঁশ। সেখানে বাঁশ কেটে প্রথমে আগুন দিয়ে পোড়ানো হয়েছে। এরপর লাগানো হয় গাছের চারা। সবচেয়ে বেশি বাঁশ কাটা হয়েছে সুরমা ও হলম্পা বাঁশমহালে। এখানে এত ঘন বাঁশঝাড় ছিল যে ভেতরে ঢোকা যেত না। কিন্তু কেটে পুড়িয়ে ছাইয়ের স্তূপ বানানোর পরে সেখানে গাছের চারা লাগানো হয়।
বনায়নের এই প্রক্রিয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জামালি গ্রামের বাসিন্দা জামাল মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখানে বনের গাছ বাঁশ কেটে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। তবে গাছগুলো ছোট ছোট, এইগুলো প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নিয়েছিল। এত বাঁশ কাটা হয়েছে যে তা কয়েক লাখ হবে।’
লাটি টিলার হায়াছড়া গ্রামের বাসিন্দা নরুল ইসলাম বলেন, ‘আগে এই বনে প্রচুর পাখি এসে বসত। এখন আকাশমণি গাছ লাগানোর কারণে পাখি আর আসে না।’
সংরক্ষিত বনে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গাছ নষ্ট করে বনায়নের উদ্যোগকে ভালো চোখে দেখছেন না খোদ বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের অনেক কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা খুবই খারাপ কাজ হয়েছে। আকাশমণি লাগাতে আপত্তি নেই, তবে মৌখিকভাবে বলে দেওয়া হয় যেন তা ২০ শতাংশের বেশি না হয়। আকাশমণি লাগালে পাখিরা এসব গাছে বসে না। অন্য প্রাণীরাও আসে না। একটি সমৃদ্ধ বনের গাছ কেটে এভাবে বনায়ন করার কারণে বন্যপ্রাণীদের ক্ষতি হলো। এখানে যেসব বন্যপ্রাণী থাকত তারা অন্যত্র চলে যাবে।’
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক মুনতাসির আকাশ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এভাবে বনের আদি গাছ বাঁশ কেটে বনায়ন করলে প্রাণীদের আবাসস্থল নষ্ট হয়। বিশেষ করে বাঁশ-ভল্লুক ও মার্টিনসহ বেশ কিছু প্রাণী আছে এই এলাকায়, যারা বিপন্নের কাছাকাছি। আর শুধু এরা না, আরও অনেক প্রজাতির সরীসৃপের বাসস্থান থাকতে পারে। সংরক্ষিত বনে যদি তাদের আবাস ঠিক না থাকে তাহলে আর কোথাও থাকার কথা নয়।’
প্রাকৃতিক বন উজাড় করে কৃত্রিম বনায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে বন বিভাগের জুড়ি রেঞ্জের রেঞ্জার মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘২০২০-২১ অর্থবছরে এই বনায়ন করা হয়েছে। এখানে সুফলসহ বিভিন্ন প্রজেক্টের অধীনে বনায়ন করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরেও কিছু বনায়ন করা হবে।’ শুধু আকাশমণি গাছের চারা লাগানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শুধু আকাশমণি নয়, সব ধরনের গাছ লাগানো হয়েছে।’
বনায়নের নামে সংরক্ষিত বনের প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গাছপালা ধ্বংসের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এই বন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা বাঁশ বা গাছ তেমন কাটিনি। শুধু কিছু ঝোপঝাড় কেটেছি। স্থানীয়রা এ বিষয়ে বাড়িয়ে বলছে।’
সংরক্ষিত বনে কৃত্রিম বনায়ন তো দূরে থাকা, একটি লতাও কাটা যাবে না বলে মনে করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য ও সিলেট শাখার সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম কিম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘বন বিভাগের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত বেশিরভাগ কর্মচারী কর্মকর্তা বনবিরোধী কাজ করে যাচ্ছেন। লাটি টিলা একটি সমৃদ্ধ ও সংরক্ষিত বন। এই বনের প্রাকৃতিক গাছ বাঁশ কেটে বনায়ন করার কী প্রয়োজন? প্রয়োজন লুটপাটের জন্য। সুফলসহ বিভিন্ন প্রজেক্ট নিয়ে বন বিভাগ যত আগ্রহী তার ১ শতাংশ যদি বন রক্ষার প্রতি থাকত তবুও কিছুটা সান্ত¡না মিলত। আমরা কার কাছে প্রতিবাদ করব? এই বন তো পরিবেশমন্ত্রীর নিজের নির্বাচনী এলাকা। তার নিজের এলাকায় যদি বন ধ্বংস করা হয়, তাহলে এই মন্ত্রণালয়ের কাছে আমরা কী আশা করতে পারি?’
এদিকে কতটুকু জায়গায় কৃত্রিম বনায়ন হচ্ছে এবং কতটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন সেই হিসাব দিতে পারেননি বা দিতে চাননি স্থানীয় বন কর্মকর্তারা। তারা বন উজাড়ের দায়ও নিতে চাইছেন না। এ প্রসঙ্গে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (সিলেট) মো. তৌফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি এখানে নতুন যোগদান করেছি, তাই বিস্তারিত জানি না। তবে এভাবে বন ধ্বংস করে বনায়ন করার যুক্তি নেই। আমি খোঁজ নিয়ে এখানে বনবিরোধী কিছু হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেব।’
আর মৌলভীবাজারে প্রাকৃতিক বন উজাড় করে কৃত্রিম বনায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারের বন বিভাগের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী গত শুক্রবার মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওই এলাকা থেকে অনেক রকম খবরই পাচ্ছি। আমি নিজেই জায়গাটা অচিরেই ভিজিট (পরিদর্শন) করতে যাব।’
সংরক্ষিত বনের গাছ ও বাঁশ কেটে কৃত্রিম বনায়ন এবং আগুন দিয়ে বাঁশঝাড় পোড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যেহেতু আমি নিজেই কয়েক দিন পর সরেজমিন গিয়ে দেখব, তাই এ বিষয়ে এখন মন্তব্য করতে চাইছি না।’
