চট্টগ্রাম নগরীর মাঝিরঘাট এলাকার গুলজার খালসংলগ্ন এলাকার একাধিক ভবন হেলে পড়েছে। এতে চরম বেকায়দায় পড়েছে এসব ভবনের শতাধিক বাসিন্দা। তাদের অভিযোগ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ কোনো প্রতিরক্ষা দেয়াল ছাড়াই খাল খননের কাজ শুরু করায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। আগে কেউ তাদের ভবন থেকে সরে যেতে বলেনি, তাই তারা সেখানে বসবাস করছিল। এখন তারা ভবনে থাকা মালামাল উদ্ধার নিয়েও আছেন শঙ্কায়। তবে সিডিএ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, খাল খনন শুরুর অনেক আগেই মালিকদের ভবন ভেঙে ফেলার জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু তারা সেটা আমলে নেননি।
গত সোমবার রাতে মাঝিরঘাট স্ট্যান্ড সড়কে পার্বতী ফকিরপাড়া এলাকায় গুলজার খালসংলগ্ন একটি তিনতলা ভবন হেলে পড়ার খবর পাওয়া যায়। গতকাল মঙ্গলবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান সিডিএর প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ শাহিনুল ইসলাম খান। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আইন অনুযায়ী প্রকল্পের প্রায় ১৫ ফুট দূরত্বে স্থাপনা নির্মাণের জন্য নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু ভবন মালিকরা তা না মেনে সিটি করপোরেশনের ড্রেনের ওয়ালের ওপর ভবন নির্মাণ করেছেন। এমনকি এসব ভবনের নিচে কোনো ফাউন্ডেশনই নেই। তাই ভবনটি হেলে পড়েছে। এখন প্রকল্পের অধীনে গুলজার খাল সংস্কারকাজ চলছে। এখন খালের ১৫ ফুটের মধ্যে থাকা সব স্থাপনা অপসারণ করা হচ্ছে।’
গতকাল সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, স্থানীয় শুভ দাশের মালিকানাধীন তিনতলা ভবনটি হেলে গেছে। দেয়াল থেকে রড ভেঙে বেরিয়ে গেছে। এ ছাড়া তিনতলা ভবনটির পাশে একটি দোতলা মন্দির এবং একটি সেমিপাকা কলোনির দেয়ালের মেঝেতেও ফাটল দেখা গেছে। পাশাপাশি একই সারিতে থাকা আরও অন্তত তিনটি ভবন ও বেশ কয়েকটি কাঁচা ঘর ঝুঁকিতে পড়েছে। স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, কেউ তাদের ভবন থেকে সরে যেতে বলেনি, তাই তারা সেখানে বসবাস করছিলেন।
এ সময় উদ্ধারকাজ চালানো চট্টগ্রামের ফায়ার সার্ভিসের ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর কুতুব উদ্দিন বলেন, ‘আমরা রাতেই তিনতলা ভবনের বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নিয়েছি। গুলজার খালের পাড় ঘেঁষে এসব ভবন গড়ে তোলা হয়েছে। গুলজার খালের খননকাজ করা হচ্ছে। খাল থেকে মাটি তোলায় ভবনের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ায় ভবনগুলো হেলে পড়তে শুরু করেছে।’
হেলেপড়া আরেকটি ভবনের মালিক মনোরঞ্জন দাশ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সোমবার রাত আনুমানিক ১০টার দিকে বাসার এক অংশ প্রচ- আওয়াজের সঙ্গে নড়ে ওঠে। তখন আশপাশের সবাই আতঙ্কিত হয়ে ভবনগুলো থেকে বের হতে থাকেন। পরে আমরাও বের হয়ে দেখি আমাদের পাশের ভবন, আমার ভবন এবং ভবনসংলগ্ন মন্দির খালের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। সকালে দেখি পাশের সেমিপাকা বাসাটির দেয়াল ও মেঝেও ফেটে গেছে। সিডিএ খালের পাশে কোনো রকম রিটার্নিং ওয়াল না দিয়ে খালের মাটি কাটায় আমাদের ভবনের এ ক্ষতিটা হয়েছে।’
আরেক বাড়ির বাসিন্দা রনি দাশ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রথমে মৃদু ভূমিকম্প ভেবে বাসায় ছিলাম। এর কিছুক্ষণ পর বিকট শব্দ হলে আমরা পরিবারের সবাইকে নিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে আসি। আমরা খাল কাটা শুরুর সময় তাদের জানিয়েছিলাম, খাল কাটার আগে ওয়াল দিলে দুর্ঘটনা ঘটবে না, কিন্তু তারা আমাদের কথা শোনেনি। ভবন এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে হেলে পড়েছে, এখন আমাদের মালামালগুলোও বাসা থেকে বের করতে পারব কি না, সন্দেহ আছে।’
তবে সিডিএ জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহ আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ যখন শুরু হয়েছিল, তখনই এসব ভবন মালিকদের বাসিন্দাদের সরিয়ে এসব অবৈধ ভবন অপসারণ করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তারা কথা শোনেনি। এখন খালপাড় ঘেঁষে যে তিনতলা ভবনটি হেলে পড়েছে, এর কিছু অংশ ২০১৯ সালে প্রকল্পের কাজ শুরুর পর উচ্ছেদ করা হয়েছিল। তখনই বলা হয়েছিল, মালিকপক্ষ যেন বাসিন্দাদের সরিয়ে নেয়। তাদের মৌখিকভাবে একাধিকবার বলা হয়েছিল। তাদের বলেছি, গুলজার খাল থেকে মাটি উত্তোলনের কাজ শুরু হলে ভবনটি টিকবে না। কারণ এসব ভবনের ভিত্তি খুব দুর্বল। তারা কথা শোনেনি। এখন খাল খননের কাজ শুরু হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই ভবনটি হেলে পড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘শুধু এই তিনতলা ভবনটি নয়, গুলজার খালসংলগ্ন আরও ৫-৬টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। এসব খালের দেয়াল আর ভবনগুলোর দেয়াল প্রায় লাগানো। এভাবে খাল ঘেঁষে স্থাপনা নির্মাণ পুরোপুরিই অবৈধ। এসব ভবন নির্মাণে সিডিএর কোনো অনুমোদনও নেওয়া হয়নি। তাই এখন সিডিএ এসব ঝুঁকিপূর্ণ ভবন লাল তালিকাভুক্ত করে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অবৈধ সব স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে।’
এসব ভবন মালিকদের সরে যেতে লিখিত কোনো নোটিস দেওয়া হয়েছে কি না, জানতে চাইলে লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহ আলী বলেন, ‘এসব ভবন তো অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। তাদের লিখিতভাবে কেমনে দেব? তাদের মৌখিকভাবে একাধিকবার সরে যেতে বলা হয়েছে।’
