অনেক মায়ের প্রসব-পরবর্তী নানা কারণে মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। মানসিক এই সমস্যাকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন:
হরমোনের তারতম্যজনিত জানা ও অজানা কারণ, গর্ভধারণ থেকে প্রসব-পরবর্তী শারীরিক পরিবর্তন এবং মনোসামাজিক কারণ। মানব শরীরে দুই ধরনের প্রজনন হরমোন থাকে; ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরন। গর্ভকালে মায়ের শরীরে এই প্রজনন হরমোন দশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। প্রসব-পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে এই হরমোনের পতন ঘটে, যা মানসিক স্থিতিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় গর্ভধারণ থেকে শুরু করে প্রসব-পরবর্তী সময়ে মায়ের পরিবর্তিত জীবনের অনিদ্রা, ক্লান্তি, শারীরিক পরিবর্তন, মনোসামাজিক চাপ, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ইত্যাদি। সব মিলিয়ে তার মধ্যে দেখা দিতে পারে মানসিক সমস্যা।
বেবি ব্লুজে আক্রান্ত প্রতি পাঁচজন মায়ের মধ্যে একজন পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হন। বাচ্চা প্রসবের দুই সপ্তাহ পর থেকে প্রসব-পরবর্তী বিষণœতা শুরু হয় এবং ৪ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এ সময় বেবি ব্লুজের লক্ষণসহ বিষণœতার অন্যান্য বৈশিষ্ট্য মায়ের মধ্যে দেখা যায়। মায়ের পক্ষে একা একা এ সমস্যা থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়। এই পর্যায়ে রোগীকে অবশ্যই একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং একজন সাইকোথেরাপিস্টের পরামর্শ নিতে হবে। কেননা এই পর্যায়ে মা তীব্র মানসিক সমস্যায় ভোগেন। অনেক ক্ষেত্রে মা বাচ্চাসহ নিজের ক্ষতির চিন্তা করেন।
লক্ষণ
একাকিত্ব বোধ, অকারণে কান্না, দুশ্চিন্তা, বাচ্চার পরিচর্যার ক্ষেত্রে অমনোযোগিতা, আগ্রহের অভাব, আত্মবিশ্বাসের অভাব, হীনম্মন্যতা, অপরাধ বোধে ভোগা , ক্ষুধামান্দ্য বা অতিরিক্ত খাওয়া, অনিদ্রা বা অতিরিক্ত নিদ্রা, সবার থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখা, বিশেষ করে বাচ্চার কাছ থেকে, আত্মহত্যার চিন্তা ইত্যাদি।
প্রতিরোধে করণীয়
মায়ের করণীয় : পার্টনারের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করা, নিজেকে সময় দেওয়া, দিনে কমপক্ষে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমানো, পুষ্টিকর ও সুষম খাবার গ্রহণ, নিজের পরিচর্যা করা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যায়াম, নিজের শখের কাজে স্বল্প সময়ের জন্য হলেও নিজেকে ব্যস্ত রাখা, বাচ্চা ও নিজের প্রয়োজন সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান রাখা, মাঝেমধ্যে কাছাকাছি কোথাও ঘুরতে যাওয়া।
পরিবারের অন্যদের করণীয় : মা যেন একাকিত্বে না ভোগেন, সেজন্য স্বামীকে সার্বিক লক্ষ রাখতে হবে। মাকে পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ করে দেওয়া এবং বাচ্চার সব দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নেওয়া।
চিকিৎসা
যদিও যেকোনো মানসিক রোগে আশপাশের মানুষের আন্তরিকতা, সহমর্মিতা ও রোগটি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান রাখাই সবচেয়ে সহায়ক। তবু পরিস্থিতি উন্নতির দিকে না গেলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। রোগীকে থেরাপি দেওয়া যেতে পারে। থেরাপির ক্ষেত্রে রোগীকে তার সব অনুভূতি খুলে বলতে হয়, সেগুলো দিয়ে থেরাপিস্ট রোগীর অবস্থা বুঝতে পারেন ও মানসিক সমস্যা থেকে কীভাবে নিস্তার পাওয়া যায় তার পরামর্শ দেন। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আপনার সমস্যা বিবেচনা করে ঘুম, ডিপ্রেশন-প্রতিরোধী ওষুধ দিয়ে থাকেন। মনে রাখবেন শরীরের ওষুধের চেয়ে মনের ওষুধের পাশর্^প্রতিক্রিয়া বেশি হয়ে থাকে, যদি না তা ঠিকভাবে গ্রহণ করা হয়। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাওয়া যাবে না।
