সোনাগাজীতে ‘ফেনী স্টাইল’ আতঙ্কে নৌকার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০২১, ০৭:২৬ পিএম

ফেনীর সোনাগাজীতে রবিবার (২৬ ডিসেম্বর) চতুর্থ ধাপের ইউপি নির্বাচনে নয় ইউনিয়নে ভোটগ্রহণ হবে। তবে প্রার্থীদের অভিযোগ, নৌকার চেয়ারম্যান প্রার্থী ও আওয়ামী লীগ নেতাদের ‘হুমকি-ধমকিতে’ নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে তত তারা ভুগছেন ‘ফেনী স্টাইল’ আতঙ্কে।  

তাদের দাবি, যেভাবে হোক নৌকাকে জয়ী করা হবে আওয়ামী লীগ নেতাদের এমন ঘোষণায় সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সংশয়ে রয়েছে ভোটার ও এলাকাবাসী। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে তারা স্থানীয় নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের নিরপেক্ষ নির্বাচনের আশ্বাস বাণীতে বিশ্বাস রাখতে পারছেন না।

বুধবার রাতে স্থানীয় একটি রেস্টুরেন্টে সংবাদ সম্মেলনে ৯ নম্বর নবাবপুর ইউনিয়নের স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি নেতা, সাবেক চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলাম ‘ফেনী স্টাইল’ আতঙ্কের কথা উল্লেখ করে সুষ্ঠু নির্বচনের জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

তিনি নির্বচনের আগের দিন থেকে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়া পর্যন্ত বহিরাগতদের প্রবেশ নিষেধ ও বৈধ-অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের আহ্বান জানান।

সোনাগাজীর নয় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে ৩০, সংরক্ষিত নারী সদস্য ৮৯ ও সাধারণ সদস্য পদপ্রার্থী ৪৫৩ জন প্রতীক বরাদ্দ পেয়ে নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। দুই ইউনিয়নে নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

ফেনী জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার সূত্রে জান যায়, উপজেলার নয় ইউনিয়নের মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৯১। তার মধ্যে ৫২ অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ও ৩৯ কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

জানা গেছে, সাতটি ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী, বিএনপি নেতা, জাপা ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা। চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মোট ছয়জন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। ১ নম্বর মজলিশপুর ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান এম এ হোসেনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা জহিরুল হক রতন ও জাপা প্রার্থী আবু তাহের। ২ নম্বর বগাদানা ইউপিতে নৌকার প্রার্থী আলা উদ্দিন বাবুল, বিদ্রোহী প্রার্থী সাইফুল ইসলাম শিফন, জাপা প্রার্থী মিজানুর রহমান। ৫ নম্বর চরদরবেশ ইউপিতে নৌকার প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম ভুট্টু, বিদ্রোহী প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি প্রফেসর নাফিজ উদ্দিন, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী ওসমান গনি। ৬ নম্বর চরছান্দিয়া ইউপিতে নৌকার প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন মিলন, বিদ্রোহী প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা দীন মোহাম্মদ, জাপা প্রার্থী সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হাজী আবু সুফিয়ান, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী আব্দুর রহমান ফরহাদ, স্বতন্ত্র মফিজুল হক পাটোয়ারী ও আবু ইউছুপ। ৭ নম্বর সোনাগাজী সদর ইউপিতে নৌকার প্রার্থী উম্মে রুমা, বিদ্রোহী প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান সামছুল আরেফিন, জাপা প্রার্থী সিরাজুল ইসলাম, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী ফখরুদ্দিন, স্বতন্ত্র আব্দুল মমিন খাঁন। ৮ নম্বর আমিরাবাদ ইউপিতে নৌকার প্রার্থী আজিজুল হক হিরন, বিদ্রোহী প্রার্থী ফয়েজুল করিম সেলিম। ৯ নম্বর নবাবপুর ইউপিতে নৌকার প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন, বিদ্রোহী প্রার্থী সাহজাহান মুসা, স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি নেতা সাবেক চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলাম, জাপা প্রার্থী শেখ মাসুদ, স্বতন্ত্র প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন ভুঞা ও জামশেদ আলম।

সরেজমিন বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের বিজয়ে বাধা হতে পারে সরকারদলীয় বিদ্রোহী প্রার্থী, বিএনপি সমর্থক প্রার্থী ও জাপা প্রার্থীরা। দিনের আলোতে দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে কথা বললেও দিন শেষে বিদ্রোহী প্রার্থী ও জাপা প্রার্থীদের উৎসাহ ও সাহস জোগাচ্ছেন আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী। দলের অবমূল্যায়নের ক্ষোভ ও নৌকার প্রার্থীদের বিতর্কিত ভূমিকায় ক্ষুব্ধ হয়ে বহু নেতাকর্মী প্রকাশ্যে বিদ্রোহী ও জাপা প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছে। জেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের নেতৃত্বে নেতাকর্মীদের বশে আনতে দফায় দফায় বৈঠক করে পদ-পদবির লোভ এবং বহিষ্কারের হুমকি দিয়েও তাদের দমানো যাচ্ছে না। এ ছাড়া বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলেও দলের নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগের নৌকার বিজয় ঠেকাতে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন। যা কিনা নৌকার বিজয়ে বাধার কারণ হতে পারে। ছয়টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান প্রার্থীরা বিজয়ী হতে বিদ্রোহী, জাপা ও বিএনপি সমর্থক প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বেন। বিশেষ করে চরছান্দিয়া, সোনাগাজী সদর, চরদরবেশ, বগাদানা, মজলিশপুর ও নবাবপুর ইউনিয়নের নৌকার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণা ও শোডাউনের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। আমিরাবাদ ইউপিতে একমাত্র বিদ্রোহী প্রার্থী ফয়েজুল করিম সেলিম বুধবার রাতে নৌকার প্রার্থী আজিজুল হক হিরনকে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। ফলে নৌকার প্রার্থীর বিজয় সময়ের ব্যাপার মাত্র।

চরছান্দিয়া ইউনিয়নের লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী আবু সুফিয়ান বলেন, ‘ফেনী স্টাইলে’ ভোট কারচুপি করা ছাড়া নৌকার বিজয়ের বিন্দু পরিমাণ সম্ভাবনা নেই। জয় পেতে তারা এখন থেকেই হুমকি-ধমকিসহ বহিরাগত সন্ত্রাসীদের জড়ো করছে।

তিনি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রশাসনের কঠোর ভূমিকার প্রত্যাশা করেন।

সোনাগাজী সদর ইউপিতে আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান চেয়ারম্যান সামছুল আরেফিনের বলেন, বহিরাগত ক্যাডার দিয়ে ফেনী স্টাইলে ভোট ডাকাতি করার ঘোষণা দিয়েছেন একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা।

জনগণের ভোটাধিকার হরণের চেষ্টা করা হলে প্রয়োজনে ‘আত্মহত্যা ‘করে প্রতিবাদের ঘোষণা দেন তিনি।

চরদরবেশ ইউনয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী নাফিজ উদ্দিন বলেন, ভোট ডাকাতি করতে ইতিমধ্যে নৌকার প্রার্থী জলদস্যু ও ডাকাত বাহিনীকে ভাড়া করেছেন। তারা এখন থেকে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এলাকায় মহড়া দিয়ে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে।

তবে তার অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন নৌকার প্রার্থী নুরুল ইসলাম ভুট্টু।

একইভাবে ‘ফেনী স্টাইলে’ ভোট ডাকাতির চেষ্টার আশঙ্কা করেন মজলিশপুর ইউপির বিদ্রোহী প্রার্থী জহিরুল হক রতন, বগাদানার সাইফুল ইসলাম শিফন ও নবাবপুরের বিদ্রোহী সাহজাহান মুসা ও স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি নেতা জহিরুল ইসলাম।

তারা নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে এবং বহিরাগত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করেন।

নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা অবশ্য শতভাগ জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী, তারা গত পাঁচ বছরে সরকারের উন্নয়ন ও ভবিষ্যতে তা অব্যাহত রাখতে জনগণের কাছে ভোট চাইছেন।

রিটার্নিং কর্মকর্তা মাইনুল হক বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বহিরাগত সন্ত্রাসীদের রুখতে প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সোনাগাজী সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মাশকুর রহমান বলেন, নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বরাবরের মতো আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করব।

এ ছাড়া নির্বাহী ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে আমাদের সঙ্গে পর্যাপ্তসংখ্যক র‌্যাব, বিজিবি, আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করবে।

এদিকে সোনাগাজী উপজেলার বগাদানা ইউপি নির্বাচন সহিংসতা মুক্ত ও সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ করতে কাফনের কাপড় মাথায় নিয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ পালিত হয়েছে। 

বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলার বগাদানা ইউনিয়নের তাকিয়া বাজারে আমরা ইউনিয়নবাসীর ব্যানারে  মানববন্ধন ও বিক্ষোভ পালিত হয়। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত