সরকারের পদত্যাগ দাবি করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের লক্ষ্যে সংলাপের নামে নতুন নাটক শুরু হয়েছে। এ সরকারের অধীনে কোনো ইসি নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারবে না। তাই সংলাপের নাটক নয়, সংলাপের আগে পদত্যাগ করুন।’
পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল শুক্রবার বিকেলে গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী শহীদ বরকত স্টেডিয়ামে আয়োজিত বিএনপির সমাবেশে দলের মহাসচিব এসব কথা বলেন।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর দাবিতে গাজীপুরসহ আরও চারটি জেলায় সমাবেশ করেছে দলটি। অন্য তিন জেলা হলো জয়পুরহাট, জামালপুর ও গাইবান্ধা। গত বুধবার থেকে বিএনপি পাঁচ জেলায় সমাবেশ করে। দলটি পর্যায়ক্রমে ৩৪ জেলায় সমাবেশ করবে।
আমাদের গাজীপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গাজীপুর জেলা ও মহানগর বিএনপির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত সমাবেশে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘এখন চলছে সংলাপ। রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন দলের নেতাদের দাওয়াত দিচ্ছেন, দাওয়াত দিয়ে বঙ্গভবনে খাওয়দাওয়া করাচ্ছেন। তারা ইসি গঠন করে, কিন্তু নির্বাচন কমিশন কাজ করতে পারে না।’
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সমালোচনা করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘সিইসি কে এম নুরুল হুদাকে অনেকে বলেÑবেহুদা। কারণ সব নির্বাচনের পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ হয়েছে।’
মির্জা ফখরুল বলেন, সরকারের সময় শেষ হয়ে গেছে। তাদের বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে। আমেরিকা র্যাবের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। কয়েক দিন আগে আমেরিকায় গণতন্ত্র সম্মেলন হয়ে গেল। আমেরিকা ভারত, পাকিস্তান, মালদ্বীপসহ শতাধিক রাষ্ট্রকে আমন্ত্রণ জানালেও বাংলাদেশ সরকারকে আমন্ত্রণ জানায়নি। এ সময় তিনি প্রশ্ন করে বলেন, কেন? কারণ বাংলাদেশ এখন আর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়, এটি এখন একনায়কতন্ত্রের দেশ। এক নেতার এক দেশ। এখানে শেখ হাসিনা ছাড়া আর কিছু নেই।
সরকারি চাকরিজীবীদের উদ্দেশে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আপনারা কখনো আইন এবং সংবিধান লঙ্ঘন করবেন না। আপনারা জনগণের কথা বোঝেন, জনগণের পাশে দাঁড়ান। জনগণ আজ মুক্তি চায়, জনগণ আজ খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা চায়।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আজকে মানুষ কোথাও নিরাপদ নয়। আমাদের এক বোন স্বামী সন্তান নিয়ে গিয়েছিলেন কক্সবাজারে। সেখানে তিনি ধর্ষিত হয়েছেন। এই সরকার যতদিন ক্ষমতায় থাকবে, ততদিন এদেশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।’
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন গাজীপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফজলুল হক মিলন।
পাড়া মহল্লায় সংগঠিত হোন গয়েশ্বর : জয়পুরহাট জেলা বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় পাড়ায়-মহল্লায় নেতাকর্মীদের সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
জয়পুরহাট প্রতিনিধি জানান, গয়েশ্বর দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘খুব শিগগির আমাদের নেতা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আন্দোলনের ডাক দেবেন। সেই আন্দোলনকে সফল করতে আপনারা প্রস্তুতি নিন।’
সমাবেশে আসার সময় নেতাকর্মীদের পথে পথে বাধা দেওয়া হয়েছে স্থানীয় নেতাদের এমন অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘বাধা আসলে পাল্টা বাধা দিতে হবে।’
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শামছুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ওবায়দুর রহমান চন্দন, যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু প্রমুখ।
সার্চ কমিটির নামে রসিকতা করা হচ্ছে নজরুল ইসলাম খান : জামালপুরের ফুলবাড়িয়া ঈদগাহ মাঠে জেলা বিএনপি আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, ‘আইনের দোহাই দিয়ে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে সুচিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘ইসি করার জন্য সার্চ কমিটির নামে রসিকতা করা হচ্ছে। যে পর্যন্ত নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার না হবে, যাকে নিয়ে ইসির দায়িত্ব দেওয়া হোক না কেন তাতে কোনো লাভ হবে না।’
জামালপুর প্রতিনিধি জানান, জেলা বিএনপির সভাপতি ফরিদুল কবির তালুকদার শামীমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স প্রমুখ।
নতুন বছরে নতুন সরকার আসবে শামসুজ্জামান দুদু : গাইবান্ধা জেলা বিএনপির সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেছেন, ‘নতুন বছরে খালেদা জিয়ার সরকার আসবে, তারেক জিয়ার সরকার আসবে। সর্বোপরি বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসবে।’
গাইবান্ধ প্রতিনিধি জানান, জেলা বিএনপির সভাপতি ডা. মইনুল হাসান সাদিকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য দেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হারুন অর রশিদ এমপি, বিএনপির রংপুর বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলু প্রমুখ।
লঞ্চে অগ্নিকান্ডে হতাহতের ঘটনা দুঃশাসনেরই এক নিকৃষ্ট নমুনা
সুগন্ধা নদীতে লঞ্চে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় মানুষ পুড়ে মরা ঘটনাকে করুণ ও মর্মস্পর্শী বলে মন্তব্য করেছে বিএনপি। দলটি নেতারা বলেছেন, দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের অভাবে সর্বত্র দুর্বৃত্তদের দাপট চলছে। কোথাও নিয়মকানুনের কোনো বালাই নেই। আর সে কারণেই জীবন দিতে হচ্ছে নিরীহ যাত্রীদের। এই অগ্নিকান্ডে হতাহতের হৃদয়স্পর্শী ঘটনা দুঃশাসনেরই এক নিকৃষ্ট নমুনা।
গতকাল শুক্রবার বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক মুনীর হোসেন স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এসব কথা বলেন।
বিবৃতিতে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার রাতে এমভি অভিযান-১০ লঞ্চের অগ্নিকান্ডে হতাহতের ঘটনা করুণ ও মর্মস্পর্শী। ঢাকা থেকে লঞ্চটি ৪০০ যাত্রী নিয়ে বরগুনার উদ্দেশে রওনা দেয়। অগ্নিকা-ের সময় লঞ্চটিতে হাজারের মতো যাত্রী ছিল। পোড়া ওই লঞ্চ থেকে এ পর্যন্ত ৩৬ জনের লাশ উদ্ধার করেছেন উদ্ধারকর্মীরা। ৯০ জনকে দগ্ধ ও আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় পুরো জাতির ন্যায় আমিও বিমর্ষ বেদনায় শোকাহত। এই শোক সহজে সহ্য করার মতো নয়।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারের আমলে সারা দেশে শোকের কালো মেঘ সবসময় আচ্ছন্ন থাকে। অখন্ড কর্তৃত্বের অধিকারী ক্ষমতাসীনদের বেপরোয়া কর্মকা-ে দেশব্যাপী যেন অনিয়মেরই রাজত্ব চলছে। জনগণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতাকে আটকে ফেলা হয়েছে। জনগণের প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে দেশ পরিচালনার জন্যই দেশব্যাপী হত্যা, গুম, খুন, অপহরণের পাশাপাশি সড়ক, রেল ও নৌপথে দুর্ঘটনার সংখ্যা অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। জনগণের কাছে জবাবদিহিহীন সরকারের খামখেয়ালিপনায় সড়ক, রেল ও নৌপথে নৈরাজ্য যেন স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। দলবাজি ও দুর্বৃত্তপনার জন্যই বিভিন্ন সেক্টরে এখন মাফিয়াদের রাজত্ব কায়েম হয়েছে।’
বিবৃতিতে লঞ্চে অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করেন মির্জা ফখরুল। পাশাপাশি অগ্নিদগ্ধ হয়ে গুরুতর আহতদের আশু সুস্থতা কামনা করেন তিনি।
নৌপরিবহন খাতে দুর্বৃত্তদের দাপট চলছে, অভিযোগ রিজভীর : লঞ্চে অগ্নিকা-ের ঘটনায় গতকাল নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করে বলেছেন, ‘নৌপরিবহন খাতে দুর্বৃত্তদের দাপটের কারণেই একের পর দুর্ঘটনা ঘটছে, আর প্রাণ দিতে হচ্ছে নিরীহ মানুষদের।’
তিনি বলেন, ‘বিনা ভোটে জবাবদিহিহীন সরকারের কারণেই সারা দেশে সর্বত্র অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা রাজত্ব করছে। জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয় না বলেই সড়ক, নৌপথসহ সব জনপথেই নৈরাজ্য বিরাজ করছে। ৪০০ যাত্রীর লঞ্চে হাজারখানেক যাত্রী অবস্থান করছিল, এটি কীভাবে সম্ভব?’
