এই সংলাপ একটি বড় নাটকের অংশবিশেষ ছাড়া কিছু নয়

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২১, ১১:৩১ পিএম

রুহুল কবির রিজভী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব। ২০১৬ সালের মার্চে বিএনপির ষষ্ঠ সম্মেলনে তিনি জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে নির্বাচিত হন। এছাড়াও তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দপ্তর সম্পাদক ও মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাষ্ট্রপতির সংলাপ, নির্বাচন কমিশন গঠন এবং সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে তিনি কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তর সম্পাদকীয় বিভাগের এহ্্সান মাহমুদ

দেশ রূপান্তর : রাষ্ট্রপতি এখন নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে সংলাপ শুরু করেছেন। এই সংলাপকে কীভাবে দেখছেন?

রুহুল কবির রিজভী : আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সরকার কে এম নূরুল হুদার মতো প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) খুঁজছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। সরকারের মন্ত্রীদের কথা শুনলে বোঝা যায়, তারা আবারও বিনা ভোটের ও রাতের ভোটের নির্বাচন করতে সিইসি নূরুল হুদার মতো আজ্ঞাবহ লোক খুঁজছে। এই সংলাপ তাই একটি বড় নাটকের অংশবিশেষ ছাড়া আর কিছু নয়। 

দেশ রূপান্তর : রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণ পেলে বিএনপি এই সংলাপে অংশ নেবে কি?

রুহুল কবির রিজভী : নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের লক্ষ্যে সার্চ কমিটি করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রপতির যে সংলাপ, তাতে অংশ নেওয়ার বিষয়ে এখনো দলীয় ফোরামে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত অটুট আছে। এই সংলাপ যেহেতু বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতায় রেখেই নির্বাচন আয়োজনের অংশ তাই রাষ্ট্রপতির আহ্বানে সংলাপে অংশ নেওয়ার কোনো মানে হয় না। আমি মনে করি, নির্বাচন কমিশনারসহ সব কমিশনার বিএনপির পরামর্শে নিয়োগ দিলেও ভালো নির্বাচন হবে না। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেখা গেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসন মিলেমিশে দিনের ভোট আগের রাতে করেছে। আগামীতেও তাই হবে। এ কারণে নির্বাচন কমিশনার কে থাকল, আর না থাকল তাতে কিছু যায় আসে না।

এখন রাষ্ট্রপতির সংলাপের আমন্ত্রণ পাওয়ার পর তা স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা হবে। পাশাপাশি সমমনা রাজনৈতিক দল ও বিশিষ্টজনের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে। নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতির সংলাপ লোক দেখানো। তবে আমি মনে করি, এভাবে সংলাপে অংশ নেওয়ার কোনো মানে হয় না। তা ছাড়া সবার মতামত নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাতেই গঠিত হবে নতুন নির্বাচন কমিশন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকলে তার সরকারের অধীনে আগামীতে বিএনপি কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না। নির্বাচনকালে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার হলেই কেবল নির্বাচনে যাব আমরা।

দেশ রূপান্তর :  নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের যে দাবি সেটি আদায় হবে কীভাবে? নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার কেন জরুরি বলে মনে করেন?

রুহুল কবির রিজভী : শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি এবং হবেও না। স্থানীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচন কোথাও সুষ্ঠু হয়নি। তাই তার অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বিএনপি যে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে, সেটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হতে হবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনে যত ভোট হয়েছে, সব ভোট হয়েছে সন্ত্রাসমুখর। একটি নির্বাচনও উৎসবমুখর হয়নি। ভোট ডাকাতি হয়েছে, জনগণকে ভোট দিতে দেওয়া হয়নি। জনগণের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, কেবল বিএনপি নয়, দেশের জনগণের মনে বড় ধরনের সংশয় হচ্ছে, শেখ হাসিনা নির্বাচনই করবেন না। কারণ সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হলে তাদের ভরাডুবি হবে। এই কারণেই তিনি একতরফা নির্বাচনের জোগাড় করছেন। নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে নানা ধরনের নীলনকশা আঁটছেন। নিজের পছন্দের কমিশন বানাতে সংলাপের নাটক করছেন। আগামীতে নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া দেশে কোনো নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না।

দেশ রূপান্তর :  সম্প্রতি আমরা দেখতে পেলাম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাত কর্তাব্যক্তির ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এই বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন? কেন এটি হলো বলে মনে করেন?

রুহুল কবির রিজভী : যুক্তরাষ্ট্রে একটি গণতন্ত্র সম্মেলন হয়ে গেল, অথচ বাংলাদেশকে ডাকা হলো না। এরপর বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাত কর্মকর্তার যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। লেখাপড়ার জন্য তাদের সন্তানদের নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, মার্কিন অর্থ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে এসব কর্মকর্তার অর্থ থাকলে সেসব বাজেয়াপ্ত হবে। কেন যুক্তরাষ্ট্র নিষিদ্ধ করেছে? তারা তো চোখ বন্ধ করে নেই। বাংলাদেশে কী হচ্ছে তারা সবই দেখছে।

দেশ রূপান্তর : খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার দাবিতে আপনার দলের আন্দোলনের খবর বলুন... 

রুহুল কবির রিজভী : আমাদের চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। খালেদা জিয়া মিথ্যা মামলায় তিন বছর ধরে বন্দি রয়েছেন। এরপর তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। আমরা আগেও বলেছি, তাকে তিলে তিলে নিঃশেষ করতেই বন্দি করা হয়েছে। এর প্রমাণ হলো তিনি এখন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। আমরা বারবার বলেছি, উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হোক। কিন্তু সরকার নানা অজুহাত দেখিয়ে তার মুক্তির বিষয়টি বিলম্বিত করছে। অথচ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে যখন বন্দি ছিলেন, তখন তিনি বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এমন অনেক দৃষ্টান্ত দেশে রয়েছে। খালেদা জিয়া গণতন্ত্রকে অন্ধকার গুহা থেকে মুক্ত করেছেন। অথচ তাকে ধীরে ধীরে ভয়ংকর পরিণতির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে তার উন্নত চিকিৎসাকেই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছি আমরা। তাই যত দিন না সরকার খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করছে, তত দিন বিরতিহীনভাবে কর্মসূচি চলবে।

খালেদা জিয়াকে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রেখে তার উন্নত চিকিৎসার প্রশ্নে সরকার যে অমানবিক অবস্থান নিয়েছে, সেখান থেকে নাড়াতে যত দূর যাওয়া দরকার, বিএনপি তত দূর পর্যন্ত যাবে। কারণ, বেগম খালেদা জিয়া কেবল বিএনপির চেয়ারপারসনই নন, তিনি এই মুহূর্তে দেশের রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদী শক্তির মূল নিয়ামক এবং ঐক্যের প্রতীক। তাই খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের আন্দোলন এক ও অভিন্ন। আমরা মনে করি, এই আন্দোলন ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন’। আমরা নিয়মতান্ত্রিক এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সরকারের ওপর একটা চাপ সৃষ্টি করছি, যাতে খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার ব্যাপারে সরকার সব বাধা-প্রতিবন্ধকতা দূর করে। আমি আশা করি, এর মধ্যেই সরকার কর্ণপাত করবে। না হয় আমরা আরও কঠোর আন্দোলন ও কর্মসূচির দিকে যাব।

দেশ রূপান্তর : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

রুহুল কবির রিজভী : আপনাকেও ধন্যবাদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত