বিধি ভেঙে শিক্ষক নিয়োগে তোড়জোড়

আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০২১, ০১:৫৫ এএম

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) বিধি ভেঙে শিক্ষক নিয়োগের তোড়জোড় চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নতুন শর্ত কিংবা শর্ত শিথিল করে শিক্ষক নিয়োগের আগে সেটি অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেট সভায় অনুমোদিত হতে হয়। নিয়োগ নীতিমালা সংশোধনের ক্ষেত্রেও কমিটি গঠন এবং সেই কমিটির সুপারিশ অ্যাকাডেমিক ও সিন্ডিকেটে অনুমোদন নিতে হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ২৩ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তর আটটি বিভাগে ১২টি পদে শিক্ষক নিয়োগের যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে, তাতে নিয়োগ বিধিতে নেই এমন সব শর্ত উল্লেখ রয়েছে। মূলত প্রশাসন নিজের পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতেই এটি করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইতিমধ্যে বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী প্রার্থীদের আবেদনের দিন শেষ হয়েছে গত ১৩ ডিসেম্বর।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গণিত বিভাগে একজন অধ্যাপক (স্থায়ী) ও একজন সহকারী অধ্যাপক (স্থায়ী), ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগে দুজন সহযোগী অধ্যাপক (স্থায়ী) এবং একজন সহকারী অধ্যাপক (স্থায়ী), ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে (ইইই) একজন সহযোগী অধ্যাপক (স্থায়ী), দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগে একজন সহযোগী অধ্যাপক (স্থায়ী), পরিসংখ্যান বিভাগে একজন সহকারী অধ্যাপক (স্থায়ী), লোক প্রশাসন বিভাগে সহযোগী অধ্যাপকের বিপরীতে একজন প্রভাষক (অস্থায়ী) ও শিক্ষা ছুটির বিপরীতে একজন প্রভাষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে একজন প্রভাষক (স্থায়ী) এবং ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগে শিক্ষা ছুটির বিপরীতে একজন প্রভাষক নিয়োগ দেওয়া হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে গণিত বিভাগে সহকারী অধ্যাপক (স্থায়ী) পদের ঠিক নিচে ব্র্যাকেটে ‘কনসিকোয়েন্সি ভেকান্সি উইথ ফিলাপ’- এর মাধ্যমে ‘শূন্য পদ’ লেখা হয়েছে। আবেদনের শর্তে প্রতিটি স্তরে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ প্রার্থীর ক্ষেত্রে শর্ত শিথিল করা যেতে পারে। তবে একজন প্রার্থীর ক্ষেত্রে কয়টি বিষয় বা কী কী বিষয়ে শর্ত শিথিল হবে তা উল্লেখ করা হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, নতুন করে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিতে ‘কনসিকোয়েন্সি ভেকান্সি উইথ ফিলাপ’ নামে যে পদ্ধতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তা রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষক নিয়োগের বিধানে নেই। তাছাড়া আটটি বিভাগের অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক পদের বিপরীতে যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগ পদে এখন কেউ না কেউ কর্মরত। অনেক শিক্ষককে অর্জিত ছুটি দিয়ে সেগুলো শূন্যপদ দেখানো হয়েছে, যা স্পষ্ট নিয়োগবিধির লঙ্ঘন। কারণ একজন শিক্ষক অর্জিত ছুটি নিলে ওই পদ শূন্য হয় এমন কোনো বিধি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ নীতিমালায় নেই।

জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে অধ্যাপক পদে শিক্ষক না থাকায় ওই পদের বিপরীতে ২০১৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর মোছা. আইরিন আকতারকে প্রভাষক (অস্থায়ী) নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি বর্তমানে কর্মরত। আইরিন আকতার গত ৫ অক্টোবর থেকে তিন মাসের অর্জিত ছুটির আবেদন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ গত ২২ নভেম্বর থেকে আগামী বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তার ছুটি মঞ্জুর করেছে।

বর্তমানে আইরিন আকতারকে যে পদে স্থায়ী করার কথা, সেই অধ্যাপক পদে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। তার ছুটির সময়ে অধ্যাপক পদে নতুন করে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই বিভাগে সহকারী অধ্যাপকের স্থায়ী পদে কমলেশ চন্দ্র রায় কর্মরত আছেন। তিনি পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে সহযোগী অধ্যাপক হয়েছেন। অথচ তার সহকারী অধ্যাপকের বিপরীতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। ফলে গণিত বিভাগে সহকারী অধ্যাপক পদে নতুন নিয়োগ দেওয়া হলে কমলেশ চন্দ্র কোন পদে চাকরি করেন বা করবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ বিভাগে সহকারী অধ্যাপকের পদ একটিই।

এ বিষয়ে কমলেশ চন্দ্র বলেন, ‘উপাচার্য আমাদের ডেকে যেভাবে বিজ্ঞপ্তি দিতে নির্দেশনা দিয়েছেন, সেভাবেই দেওয়া হয়েছে।’ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে প্রশাসনই ভালো বলতে পারবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা’ অনুযায়ী প্রভাষক থেকে অধ্যাপক পদ পর্যন্ত নিয়োগের বিষয়ে কোথাও শর্ত শিথিলের কোনো বিষয় উল্লেখ নেই। ‘কনসিকোয়েন্সি ভেকান্সি উইথ ফিলাপ’ পদ্ধতিও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধির কোথাও উল্লেখ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে শর্ত শিথিল বা সংস্কারে কমিটি গঠন, কমিটির সুপারিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেট সভায় অনুমোদিত হওয়ার যে নিয়ম রয়েছে, গত ২৩ নভেম্বরের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার আগে কোনো কিছুই মানা হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কোনো প্রার্থীকে নিয়োগের ক্ষেত্রে যেকোনো একটি বিষয়ে শর্ত শিথিল হতে পারে। যেমন, কখনো কারও বয়স ৩৫-এর বেশি হলে অথবা পরীক্ষার ফলাফল বা প্রকাশনা বিষয়ে কোনো ঘাটতি থাকলে সেটি বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করতে হয়। কিন্তু এ বিজ্ঞপ্তিতে এসব বিষয়ে কিছুই স্পষ্ট করা হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক এবং চাকরিপ্রত্যাশী জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি লোক দেখানো। যেভাবে ছক কষে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে স্পষ্ট নিজেদের পছন্দের প্রার্থী আগেই চূড়ান্ত করে রাখা হয়েছে। নামমাত্র পরীক্ষাসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সারা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের সব আইন মেনে চলা প্রয়োজন বলে মত দেন তারা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের সংগঠন অধিকার সুরক্ষা পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. মতিউর রহমান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ প্রার্থীর ক্ষেত্রে কিছু বিষয় শিথিল সব সময় হয়। তবে কোন কোন বিষয় শিথিল করা হবে, তা বিজ্ঞপ্তিতে আগেই উল্লেখ থাকলে ভালো হতো।’

কনসিকোয়েন্সি ভেকান্সি উইথ ফিলাপ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে ডিপার্টমেন্টের প্লানিং কমিটি সুপারিশ করতে পারে। কিন্তু বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ কীভাবে নেবে, সেটা তাদের বিষয়।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হাসিবুর রশিদ বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন কনসিকোয়েন্সি ভেকান্সি উইথ ফিলাপ পদ্ধতি ব্যবহার হচ্ছে। আরেকটি বিজ্ঞাপন দিতে যে সময় ও খরচ, তা কমানোর জন্যই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের কোথাও নেই। কিন্তু শিক্ষকদের ভালোর জন্যই করা হয়েছে। আর শিক্ষা ছুটির ক্ষেত্রে যেভাবে ফাঁকা পদে নিয়োগ দেওয়া হয়, অর্জিত ছুটির ক্ষেত্রেও সেটি অনুসরণ করা হবে। কারণ এখানেও তো পদ খালি করেই ছুটিতে যান সংশ্লিষ্ট শিক্ষক।’

শর্ত শিথিলের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা সমাধানের জন্যই এগুলো করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় আইনে নেই কিংবা সিন্ডিকেটের অনুমোদনও নেওয়া হয়নি। এটি এমন কোনো বিষয় নয় যে সিন্ডিকেটে তুলে আইন পাস করতে হবে। অনানুষ্ঠানিকভাবে আমি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। অভ্যন্তরীণদের অগ্রাধিকার দেওয়া কোনো অপরাধ নয়। আমি আছিই তো সমস্যা সমাধানের জন্য। যারা সমস্যায় আছেন, তাদের সুবিধার জন্যই এসব করা হয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত