২০২১ সাল আমাদের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর। ১৯৭১ সাল থেকে শুরু করে ২০২১ এই পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশকে নানান ধরনের চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কখনো বন্যা, কখনো সাইক্লোন, আবার কখনো বা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। এতসব সত্ত্বেও এখন আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছি। আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা আগের থেকে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। সবাই বলছে এখন আর কেউ না খেয়ে থাকে না। গ্রামে গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করছে, প্রাথমিক শিক্ষায় ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে পার্থক্য ঘুচেছে। স্বাস্থ্যসেবা একেবারে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই দীর্ঘসময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম ও শহরের পার্থক্য কমেছে বেশ কিছুটা।
বাংলাদেশের এই পরিবর্তন সারা বিশ্বের কাছে এক বিস্ময়কর ঘটনা। অনেক বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশের এই পরিবর্তনকে সফলতার ‘কেইস স্টাডি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আবার এ সময়ে স্বাধীনতার অল্প কিছুদিন পরই বাংলাদেশ রাজনীতির এক মহাদুর্যোগের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে দীর্ঘ দুই দশক। যদিও রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনো হয়নি বলে অনেকেই মনে করেন। তার পরও বাংলাদেশের পরিবর্তন সাম্প্রতিক পৃথিবীর একটি বিশেষ ঘটনা। আর এর পেছনে মূল রহস্যটাই হচ্ছে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও ক্রমাগত এগিয়ে যাওয়া।
আয়তন ও জনসংখ্যার হিসাবে বাংলাদেশ পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে একটি। এখানে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ১২৬৫ জন মানুষ বসবাস করে। পরিসংখ্যানের হিসাবে যা পৃথিবীর দশম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। বাংলাদেশের আগে যে দেশগুলো আছে সেগুলো মূলত নগর বা দ্বীপরাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কোনো কোনোটির আয়তন কয়েকশ হেক্টর বা হাজার বর্গ কিলোমিটারের কিছুটা বেশি, হংকং সর্বোচ্চ ১১০৬ বর্গ কিলোমিটার। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে ভারতের জনঘনত্ব ৪৬৯ জন, শ্রীলঙ্কার ৩৪০ জন ও পাকিস্তানের ২৮০ জন। ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যের ২৮১ জন, জার্মানির ২৪০ জন এবং রাশিয়ার মাত্র ৯ জন। বাংলাদেশের এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে রয়েছে ভেতর ও বাইরের প্রভাব মোকাবিলা করে নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
এতসব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ যে আজকে এ অবস্থায় এসেছে এর পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের মানুষের এগিয়ে যাওয়ার আকাক্সক্ষা, প্রচেষ্টা ও উদ্যম। অবশ্য বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া সারা বিশ্বে প্রশংসা পেলেও সমালোচকরা বলছেন আমাদের দেশের এখনো অনেক কিছু করার আছে। সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন সূচকের আলোকে অগ্রগতি যতটা গুণগত তার থেকে অনেক বেশি সংখ্যাগত, গুণগত মান অর্জনের ক্ষেত্রে আমাদের আপস এখনো চোখে পড়ার মতো। অন্যদিকে শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা ও গোষ্ঠীগত স্বার্থের বাড়বাড়ন্ত সমাজের বিভিন্ন স্তরে অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি ছড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের সমাজব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির এখন প্রচন্ড ঘাটতি আছে, আছে লিঙ্গগত বৈষম্য, বিশ্বাসগত গোঁড়ামি ও সামাজিক কু-সংস্কার এবং আরও রয়েছে যেনতেন উপায়ে সম্পদ অর্জনের প্রবল কামনা ও বাসনা।
২০৭১ সাল বাংলাদেশের জন্য একটি মাহেন্দ্রক্ষণ, স্বাধীনতার ১০০ বছর। তাই সামনের পঞ্চাশ বছর বাংলাদেশের জন্য স্বাধীনতাকে আরও অর্থবহ করার প্রচেষ্টাই হবে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে পরবর্তী পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশ উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছাতে পারে। আমরা আমাদের অতীত নিয়ে রূপকথার গল্পে যে সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামলা বাংলার কথা শুনতে পাই, আগামী পঞ্চাশ বছর হতে পারে সেই বাংলাদেশ অর্জন করার সময়। বিশ্বের সামনে আবার প্রমাণ করার সময় যে আমাদের সমৃদ্ধির গল্প শুধু রূপকথা নয় বরং সমৃদ্ধ ইতিহাস। কিন্তু এটা প্রমাণ করতে হলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ চলার পথ মোটেও সুগম হবে না। অধিকন্তু তা হতে পারে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতায় পরিপূর্ণ, যার অনেকটাই আমাদের নিজেদের ওপর নির্ভরশীল এবং অবশ্যই কিছুটা বাইরের।
অর্থনীতির হিসাবে জিডিপির প্রবৃদ্ধির জোরে আমাদের সম্পদ বাড়ছে এবং একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য, যা বাংলাদেশের মধ্যে একটি নতুন শ্রেণিগত বৈষম্য তৈরি করছে। এই বৈষম্য যদি ধীরে ধীরে বাড়তেই থাকে তাহলে এর প্রভাবে একটি বিশাল গোষ্ঠীর মধ্যে এক ধরনের নৈরাজ্য জেঁকে বসতে পারে এবং সমাজে এর প্রভাব পড়তে পারে নতুন নতুন অস্থিরতা সৃষ্টির মাধ্যমে। তাই নতুন বাংলাদেশ গড়ার একটি মূলমন্ত্র হতে হবে সমতার বাংলাদেশ গড়া, বিভিন্ন গোষ্ঠী ও শ্রেণির মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে আনা। আর এটা শুধু অর্থনৈতিক বিবেচনায় নয় সামাজিক মর্যাদা, সম্পর্ক ও ক্ষমতার ক্ষেত্রেও ভারসাম্য আনা জরুরি।
এজন্য প্রয়োজন শাসনব্যবস্থার প্রকৃত গণতান্ত্রিকায়ন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা। এই গণতন্ত্র শুধু ভোটের গণতন্ত্র না, এর প্রকৃত উদ্দেশ্য হতে হবে সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা, ক্ষমতা ও সবক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। বিভিন্ন পর্যায়ে পরতে পরতে বৈষম্যের কাঠামোগুলোকে চিহ্নিত করে তা দূর করতে উদ্যোগ গ্রহণ করা। বৃহত্তর কল্যাণের জন্য গোষ্ঠীগত স্বার্থকে পরিহার করতে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করতে হবে। অন্তর্দ্বন্দ্ব, বিশ্বাস, শ্রেণি ও পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভেদ পরিহার করার সময় এটাই।
আসছে সময়ে বাংলাদেশকে নতুন পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। এই পৃথিবী হবে প্রযুক্তিনির্ভর এবং এর পরিবর্তনও হবে দ্রুত। তাই এখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে নতুন প্রজন্মকে আরও বেশি প্রযুক্তিবান্ধব হতে হবে এবং এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে উদ্ভাবনী ক্ষমতা। দক্ষতা এবং এর সঙ্গে বুদ্ধি, এই দুইয়ের মিশেলেই সাফল্য ধরা দেবে। এই প্রযুক্তির কল্যাণেই জনগণের মৌলিক অধিকারসহ অন্য অধিকারসমূহ অর্জিত হওয়ার পথ সুগম হবে।
তবে, প্রযুক্তিতে উৎকর্ষ অর্জনের পাশাপাশি এই বাংলাদেশ ও পৃথিবীকে বাসযোগ্য করার প্রয়াসে সামনের সময়ে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পরিবেশ দূষণ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ধ্বংস এখনই বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি সম্পদের স্থায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমাদের দেশকে বাসযোগ্য করে তুলতে হবে। আমরা আমাদের দেশে শিল্পায়ন চাই কিন্তু সেটা পরিবেশ দূষণ ও প্রকৃতি ধ্বংসের বিনিময়ে না। নতুন বাংলাদেশকে হতে হবে শ্যামল বাংলাদেশ, ঠিক সেই রূপকথার গল্পের মতো।
এই বাংলাদেশ বিনির্মাণে এখনই পরিকল্পনা করার শ্রেষ্ঠ সময়, আমাদের প্রত্যেককেই একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখেই আগাতে হবে। মনে রাখতে হবে আমরা জনগণ যত দিন না পর্যন্ত এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত হব, তত দিন পর্যন্ত এই রূপকথার গল্পকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে না। জনগণই হবে এর মূল চালিকাশক্তি।
ভবিষ্যতে যে সরকারই আসুক না কেন, সরকারের জায়গা থেকে দায়িত্ব হচ্ছে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা, প্রয়োজনীয় নীতি কাঠামো তৈরি করা এবং সবাইকে আস্থায় এনে একটি ইতিবাচক পরিবেশ দেওয়া। আর সর্বোপরি এজন্য প্রয়োজন প্রত্যেকটা পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, নতুন নতুন স্বার্থবাদী গোষ্ঠী তৈরি হতে কার্যকর বাধা প্রদান করা ইত্যাদি।
লেখক উন্নয়নকর্মী
