দেশে আজ মঙ্গলবার থেকেই করোনা টিকার তৃতীয় ডোজ বা বুস্টার ডোজ দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রথম দিকে সীমিত আকারে শুধু ঢাকায় এ টিকা দেওয়া হবে। পরে ঢাকাসহ সারা দেশে টিকা পাবে মানুষ। এর জন্য গতকাল সোমবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ঢাকার ২৬টি হাসপাতাল কেন্দ্রে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। তবে গতকাল রাত পর্যন্ত ঢাকার বড় কেন্দ্রগুলো এ নির্দেশনা পায়নি। তারা জানিয়েছে, নির্দেশনা পেলে নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষকে খুদেবার্তা পাঠাবে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। পরে আগামীকাল বুধবার থেকে নিজ নিজ কেন্দ্রে গিয়ে টিকা নেওয়া যাবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা এবং করোনা টিকাদান ব্যবস্থাপনা টাস্কফোর্স কমিটির সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া গেছে। তারা বলেছেন, সুরক্ষা অ্যাপ হালনাগাদ করার কাজ এখনো শেষ হয়নি। এজন্য প্রথম কয়েক দিন সীমিতসংখ্যক মানুষকে টিকা দেওয়া হবে। পরে ধীরে ধীরে সংখ্যা বাড়বে এবং ঢাকাসহ সারা দেশে দেওয়া শুরু হবে।
এর আগে গতকাল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. লোকমান হোসেন মিয়ার এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বুস্টার ডোজ দেওয়া নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, কাল (আজ মঙ্গলবার) থেকে ষাটোর্ধ্ব এবং সম্মুখসারির যোদ্ধারা সবাই বুস্টার ডোজ পাবেন। একই অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীরও জানান, গতকাল থেকেই বুস্টার ডোজের টেক্সট মেসেজ পাঠানো হবে। এর আগে গত ১৯ ডিসেম্বর পরীক্ষামূলকভাবে বুস্টার ডোজের উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। সেদিন তিনি বলেছিলেন, পুরোদমে এ কার্যক্রম শুরু করতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে। বুস্টার ডোজের জন্য সরকারের সুরক্ষা ওয়েবসাইটে আরও কিছু কাজ করতে হবে। সেটা এখনো শেষ হয়নি। আইসিটি বিভাগ জানিয়েছে, সুরক্ষা ওয়েবসাইট আপগ্রেড করতে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লাগবে। এর মধ্যে বুস্টার ডোজের প্রস্তুতি শেষ হয়ে যাবে। এরপর সারা দেশে শুরু হবে।
পরে গতকাল বুস্টার ডোজের ব্যাপারে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেল, আজ মঙ্গলবার থেকে কিছু কেন্দ্র বুস্টার ডোজ শুরু করতে পারে। তবে আগামীকাল থেকে সব কেন্দ্রেই টিকাদান শুরু হবে। অবশ্য স্বাস্থ্য সচিবের বক্তব্যের ব্যাপারে মহাপরিচালক বলেন, বুস্টার ডোজের জন্য সুরক্ষা অ্যাপ উন্মুক্ত করা হয়েছে। আগামীকাল থেকে অ্যাপসে বুস্টার ডোজের তথ্য সংযুক্ত করা যাবে। সচিব মহোদয় সেটাই বলেছেন। আগে সুরক্ষা অ্যাপে কোনো সুযোগ ছিল না। তবে কেন্দ্রগুলো বুস্টার ডোজের নির্দেশনা পেয়েছে কি না, সেটা কেন্দ্র কর্র্তৃপক্ষ ভালো বলতে পারবে।
এ কর্মকর্তা আরও বলেন, দুই সপ্তাহ আগে থেকেই বুস্টার ডোজ শুরু হয়েছে। এখনো বুস্টার ডোজ চলছে। এর মাঝে অনেক মানুষ বুস্টার ডোজ নিয়েছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকার তথ্য থেকে জানা গেছে, গতকাল পর্যন্ত মাত্র ৫৪ জন বুস্টার ডোজ পেয়েছেন।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর ও করোনা টিকা বিতরণ ও ব্যবস্থাপনা টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য সচিব ডা. শামসুল হক গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বুস্টার ডোজ দেওয়ার জন্য মাঠ পর্যায়ে কেন্দ্রগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কাল (আজ) দেওয়া শুরু করবে কোনো কোনো কেন্দ্র। কোনো কেন্দ্র পরশু দিন (আগামীকাল) থেকে দেবে। আমরা মোটামুটি মাঠকে নির্দেশনা দিয়েছি। কিন্তু টিকার এসএমএস গেল কি না, সেটা তো আমি দেখতে পারব না। যারা টিকা পাবেন, তারা বলতে পারবেন।’
অবশ্য গতকাল রাত পর্যন্ত ঢাকার কেন্দ্রগুলোতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এ নির্দেশনা পৌঁছেনি বলে জানা গেছে। কয়েকটি বড় হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছে। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা আসেনি।
এ ব্যাপারে করোনা টিকা বিতরণ ও ব্যবস্থাপনা টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য সচিব এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর ডা. শামসুল হক গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গতকাল বিকেলে নির্দেশনা গেছে। সেজন্য হয়তো পায়নি। আজ পেয়ে যাবে। পেলে তারা দু-চারজনকে যদি এসএমএস পাঠাতে পারে তারা আজ নেবে। এরপর আগামীকাল ২০-৫০ জন, তার পরদিন ২০০ জন, এভাবে দেওয়া হবে। এভাবে দিনক্ষণ মেপে সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের তো অনেক চ্যালেঞ্জ। শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশকে বুস্টার ডোজ দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যে যেভাবে পারে, করবে।’
কাল পর্যন্ত নির্দেশনা পায়নি ঢাকার কেন্দ্রগুলো : স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে গতকাল বিকেলে মাঠ পর্যায়ে বুস্টার ডোজ দেওয়ার নির্দেশনা পাঠানো হলেও গতকাল রাত পর্যন্ত ঢাকার বড় কোনো হাসপাতালেই এ নির্দেশনা পৌঁছেনি বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। এ ব্যাপারে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. খলিলুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বলা হয়েছে ২৮ ডিসেম্বরের পর থেকে বুস্টার ডোজ দেওয়া হবে। এর আগে যাদের দেওয়া হবে, তাদের নাম পাঠাবে। আমরা সে অনুযায়ী খুদেবার্তা পাঠাব। এখনো এ ব্যাপারে লিখিত কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। গত পরশু এক অনলাইন প্রশিক্ষণের সময় এ কথা বলা হয়েছে। সেদিন আরও জানানো হয়েছে, ষাটোর্ধ্ব ও ফ্রন্টলাইনার যারা তাদের বুস্টার ডোজ দেওয়া হবে। প্রতিদিন কতজনকে করে দেবে, সে ব্যাপারেও কিছু বলা হয়নি। আপাতত বলা হচ্ছে, যারা অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকা নিয়েছে, তাদের ফাইজার টিকা দেওয়া হবে। অন্যদের কী টিকা দেওয়া হবে, তা এখনো জানানো হয়নি।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা টিকার দায়িত্বে থাকা এক চিকিৎসক জানান, বুস্টার ডোজ দেওয়ার ব্যাপারে কোনো অফিশিয়াল নির্দেশ এখনো আসেনি। কীভাবে হবে, সেটাও বলতে পারছেন না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় যা বলা থাকবে, সেভাবেই তারা টিকা দেবেন। তবে যারা বয়স্ক মানুষ ও ফ্রন্টলাইনার, তারা আগে পাবেন এটুকু বলা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের অতিরিক্ত পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল করিম বলেন, ‘এখনো বুস্টার ডোজের ব্যাপারে কিছু চূড়ান্ত হয়নি। তবে আশা করছি ২৯ ডিসেম্বর থেকে শুরু হবে। যাদের বয়স ৬০ বছরের বেশি ও ফ্রন্টলাইনার যারা, তাদের দেব। কয়েকজন বিচারপতি আসবেন, তারা নেবেন। চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মী যারা আছেন, তারাও নেবেন। নির্দেশনা না আসলে বুঝতে পারছি না কীভাবে দেওয়া হবে। তবে রুটিন টিকা শেষ করে দুপুরের পর থেকেই বুস্টার ডোজ দেব।’
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চিঠি পেয়েছি। সীমিত আকারে হলেও আগামীকাল (আজ) থেকে শুরু করব।’
যারা টিকা পাবেন, যেভাবে দেওয়া হবে : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আপাতত সারা দেশ নয়, শুধু ঢাকায় সীমিতসংখ্যক মানুষকে বুস্টার ডোজ দেওয়া হবে। ঢাকার ২৬টি কেন্দ্রে এ টিকাদান কর্মসূচি চলবে। যারা টিকা পাবেন, তাদের মোবাইলে খুদেবার্তা পাঠানো হবে। খুদেবার্তা ছাড়া কেউ এলে টিকা পাবেন না। সুরক্ষা অ্যাপ আপডেট করা হচ্ছে। সেটা হলে সবাইকে বুস্টার ডোজ দেওয়া হবে।’
এ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘যারা দুই ডোজ টিকা নিয়েছেন, এমন ষাটোর্ধ্ব ও করোনার সম্মুখসারির সীমিতসংখ্যক মানুষ টিকা পাবেন। সুরক্ষা অ্যাপে বুস্টার ডোজের অপশন চালু করা হয়েছে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় যা আছে : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রতিটি কেন্দ্রে পাঁচটি নিয়মিত টিকার বিপরীতে একটি করে বুস্টার ডোজ দিতে হবে। বুস্টার ডোজ দেওয়ার জন্য পৃথক বুথ করা যেতে পারে। যারা দ্বিতীয় ডোজ অ্যাস্ট্রাজেনেকা, মডার্না, ফাইজার, সিনোফার্ম ও সিনোভ্যাক নিয়েছেন তারা ফাইজার, মডার্না বা অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকার মিশ্র বুস্টার ডোজ পাবেন। প্রথম কয়েক দিন সীমিত আকারে স্বল্পসংখ্যক মানুষকে টিকা দেওয়া হবে। আপাতত দুই শ্রেণির মানুষ এ টিকা নিতে পারবেন। তারা হলেন ৬০ বছর থেকে তদূর্ধ্ব বয়সী এবং চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, গণমাধ্যমকর্মীসহ করোনার সম্মুখসারির মানুষ। এজন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে নামের তালিকা পাঠানো হবে এবং তাদের মোবাইলে দিন ও কেন্দ্র উল্লেখ করে খুদেবার্তা পাঠাবে কেন্দ্র কর্র্তৃপক্ষ।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ইতিমধ্যেই যাদের দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার ছয় মাস অতিবাহিত হয়েছে, তারা এ টিকা পাবেন। আপাতত বুস্টার ডোজ হিসেবে ফাইজারের টিকা দেওয়া হবে। তৃতীয় ডোজের তথ্য সংরক্ষণের জন্য সুরক্ষা অ্যাপ প্রস্তুত করা হয়েছে। টিকা কার্ডের পাশে তৃতীয় ডোজের জন্য আরেকটি ঘর সংরক্ষিত রয়েছে। টিকা নেওয়া হয়ে গেলে ওই ঘরে টিকাগ্রহীতার তৃতীয় ডোজের তথ্য সংযুক্ত হবে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, বুস্টার ডোজের জন্য আলাদা করে নিবন্ধন করতে হবে না। যারা যে টিকা কেন্দ্র থেকে টিকা নিয়েছেন, তারা সেই কেন্দ্র থেকে বুস্টার ডোজ পাবেন। এই ডোজের জন্য এসএমএস দেওয়া হবে। বুস্টার ডোজ নেওয়ার জন্য নতুন করে টিকা কার্ড ডাউনলোড করে সঙ্গে নিতে হবে। এ ডোজ দেওয়ার জন্য সুরক্ষা সাইট ও অ্যাপ প্রস্তুত। এখন স্বাস্থ্য বিভাগ তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী টিকা দেবে।
