করোনা মহামারীতে বিপর্যস্ত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ব্যাংকঋণের কিস্তি আদায়ে আর কোনো ছাড় দেবে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক; অর্থাৎ ডিসেম্বরের সঙ্গেই শেষ হচ্ছে খেলাপির হাত থেকে মুক্ত থাকার এই ছাড়। ফলে আগামী জানুয়ারি থেকে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করতে হবে ঋণগ্রহীতাদের। কিস্তি না দিলেই খেলাপিতে পরিণত হবেন।
গতকাল মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আয়োজিত ব্যাংকার্স সভায় এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। সভা শেষে এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম।
তিনি বলেন, করোনার কারণে ২০২০ সালজুড়ে কোনো টাকা পরিশোধ না করলেও গ্রাহকদের খেলাপি করা যাবে নাÑএমন সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালের কিস্তির ২৫ শতাংশ পরিশোধ করেই খেলাপির বাইরে ছিলেন গ্রাহকরা। বেশিরভাগ গ্রাহক এই টাকা পরিশোধ করেছেন। কিছু গ্রাহক এখনো নতুন সুবিধার আশায় রয়েছেন। কিন্তু এই সুবিধা আর বাড়ছে না।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, ক্ষুদ্র গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রেও বিশেষ সুবিধার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মাত্র ১৫ শতাংশ অর্থের মাধ্যমেই খেলাপি হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাবেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। এখানে বিশেষ সুবিধা হিসেবে আরও রাখা হয়েছে ১ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রভিশনে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ। এই সুবিধা শুধু করোনাকালীন ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য।
কভিড-১৯ মহামারীর কারণে বেকায়দায় পড়া ব্যবসায়ীদের ২০২০ সাল জুড়ে ঋণের কিস্তি না দিয়েও খেলাপিমুক্ত থাকার সুযোগ করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি বছর সুবিধা কিছুটা কমানো হয়। এ বছর ডিসেম্বরের মধ্যে ঋণের ২৫ শতাংশ পরিশোধ করেই খেলাপির বাইরে থাকবে গ্রাহক।
গত ১৫ ডিসেম্বর বিশেষ এ সুবিধা ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত বাড়াতে গভর্নরকে চিঠি দিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। সংগঠনটি বলছে, করোনা মহামারীতে অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায়, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা এখনো ভয়াবহ অবস্থা পার করছেন। এ কারণে ঋণ শ্রেণিকরণ (খেলাপি) সুবিধা আরও ছয় মাস বাড়ানো দরকার।
চিঠিতে শর্ত শিথিলের প্রস্তাবে বলা হয়, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও অন্যান্য শিল্প এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের বকেয়া ঋণের পরিমাণ ১০ কোটি টাকা বা তার কম হলে পরিশোধের ক্ষেত্রে প্রদেয় কিস্তিগুলোর কোনো প্রকার ডাউনপেমেন্ট না দিলেও মেয়াদোত্তীর্ণ হিসাবে খেলাপি না করে ঋণ হিসাবটি পুনঃতফসিলকৃত বলে গণ্য করতে হবে। ১০ কোটি টাকার অধিক কিন্তু ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ২ শতাংশ পরিশোধ করলে এ ঋণ খেলাপি করা যাবে না। ৫০০ কোটি টাকার অধিক ঋণ ১ শতাংশ পরিশোধের শর্ত রেখে কাউকে খেলাপি না করার অনুরোধ করে এফবিসিসিআই।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, মহামারী করোনায় সৃষ্ট অর্থনীতির সংকট মোকাবিলায় খেলাপির ওপর ছাড় দিলেও প্রকৃত অর্থে ঋণগুলো অনাদায়ী রয়ে যাচ্ছে। ফলে কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ বাড়ছে না। খাতার হিসাবে ৮৮ হাজার ৭৩৪ কোটি ৬ লাখ টাকার খেলাপি ঋণ নিয়ে শুরু হয় ২০২১ সাল। এ বছর আগের মতো সুযোগ দেওয়া না হলেও অনেক ক্ষেত্রেই সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৯৯ হাজার ২০৫ কোটি টাকায়। এখন লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে এটি। সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে ব্যাংক খাতের মোট বিতরণ করা ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় ১২ লাখ ৪৫ হাজার ৩৯১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয় ১ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা; যা মোট ঋণের ৮ দশমিক ১২ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে খেলাপি ঋণ বাড়ে ১২ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা।
তবে ব্যবসায়ীদরে দাবি, ঋণগুলো খেলাপি হয়ে পড়লে অর্থনীতির ক্ষতি, ব্যাংকের ক্ষতি। ব্যবসায়ীরাও পথে বসবেন। ব্যাংকেরও টাকা আদায় হবে না। খেলাপি ঋণ আরও বাড়বে। এর জন্য আবার ব্যাংকের বাড়তি প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে।
